গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র ‘মুজিব ভাই’

টানা দুই সপ্তাহ পরীক্ষার পর গত বৃহস্পতিবার অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র ‘মুজিব ভাই’ দেখার সুযোগ পেলাম। এটিই আমার দেখা প্রথম দেশীয় কোনো অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনীভিত্তিক এই চলচ্চিত্র দেখতে পারাটাও আমার জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যারা নির্মাণ করেছেন এই ছবি বাংলাদেশের সব শিশুর কাছ থেকে তারা ধন্যবাদ পেতে পারেন। কারণ আজকাল শিশুদের কথা অনেকেই ভাবে না। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আমরা কমবেশি জানি। পাঠ্যবইয়ে তাকে পড়েছি। অন্য বইয়েও পড়েছি। বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটা আগে থেকেই বাসায় ছিল। বিভিন্ন দিবসে বঙ্গবন্ধুর ছবি এঁকে পুরস্কার হিসেবে কয়েকটি বইও উপহার পেয়েছি। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি এই বইগুলো পড়েছি। বইগুলো পড়তে বেশ সময় লেগেছে।

তবে এই ফিল্মটার সবচেয়ে বড় সার্থকতা হচ্ছে, মাত্র ৪৮ মিনিটে, মানে এক বসাতেই ছবিটি দেখে ফেলা যায়। ছবি দেখিয়ে গল্প বলার সুবিধা হলো সহজেই মস্তিষ্কের মেমোরিতে দৃশ্যগুলো সংরক্ষণ করা যায়। ‘মুজিব ভাই’ মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র। ছবিতে ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তার সংগ্রামমুখর সময়কালকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে এই ২২ বছর সময়কালের মধ্যে নিহিত আছে বঙ্গবন্ধুর ৫৫ বছরের জীবনের সবচেয়ে উত্তাল কাল। এই ২২ বছর সময়ের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু সম্পূর্ণ জীবন উপস্থাপন করতে পারাটাকে এই ছবির সার্থকতা বলা যায়। আমার বিশ^াস, এই ছবি দেখে বঙ্গবন্ধুকে আত্মস্থ করে একটা প্রজন্ম বড় হবে।

এই ছবির গল্প আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলন দিয়ে শুরু। আর ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান দিয়ে শেষ। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি তখন তরুণ ছাত্রনেতা। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি জেলে যান। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে স্কুলজীবনেও তাকে একবার জেলে যেতে হয়েছিল। মাতৃভাষা বাংলার জন্য বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি যখন রক্তাক্ত হয় ঢাকার রাজপথ তখন বঙ্গবন্ধু ছিলেন কারাগারে বন্দি। জেলে বসেই তিনি শুনতে পান রাজপথে গুলিবর্ষণের শব্দ।

২৭ ফেব্রুয়ারি জেল থেকে ছাড়া পেয়ে একটা রিকশায় করে আওয়ামী লীগ অফিসে আসেন শেখ মুজিবুর রহমান। রিকশাচালক তাকে চিনতে পারেননি। ভাড়া দেওয়ার সময় যখন চিনতে পারলেন তখন তিনি ভাড়া নিতে রাজি হলেন না। চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে শেখ মুজিব সারা দেশ ঘুরে বেড়ান। সাধারণ মানুষের সঙ্গে দেখা করেন। গ্রামের এক দরিদ্র নারী বঙ্গবন্ধুকে ঘরে নিয়ে পানি খেতে দেন। হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন তার জমানো পয়সা। বঙ্গবন্ধু ওই নারীর দোয়া গায়ে মেখে ফিরে আসেন। এই দৃশ্যগুলো জীবন্তভাবে ফুটে উঠেছে এই চলচ্চিত্রে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি মানুষের যে ভক্তি, বিশ্বাস আর ভালোবাসা এই ছবি না দেখলে তা উপলব্ধি করা কঠিন হবে।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু জেলে। ঊনসত্তরে পূর্ববাংলায় গণ-অভ্যুত্থান শুরু হয়ে গেছে। আদালতে চলছে শেখ মুজিবের বিচার। ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কিংবা ফায়ারিং স্কোয়ার্ডে দিয়ে তার মৃত্যুদন্ড কার্যকরের দাবি জানায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। সেই সময় বঙ্গবন্ধুর পতœী বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিব কারাগারে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন। তিনি কয়েকটি খাতা নিয়ে যান। সেই খাতায় বঙ্গবন্ধু লিখতেন প্রতিদিনের রোজনামচা। এই রোজনামচাই অসমাপ্ত আত্মজীবনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে যে আত্মজীবনীর ওপর ভিত্তি করে এই অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর রোজনামচা বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। এ কারণে এই চলচ্চিত্রটিও গুরুত্বপূর্ণ।