যমুনার তীরে বসে নদীর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে অঝরে চোখের জল ফেলছেন ষাটোর্ধ্ব এক নারী। গায়ে তার রংচটা ময়লা শাড়ি। শরীরে বার্ধক্যের ছাপ। বয়সের কারণে একেবারে নুয়ে পড়েছেন তিনি। কানেও কম শোনেন। বার্ধক্য যেন গ্রাস করে ফেলেছে তাকে। চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। দেখে মনে হয়, যেন কতদিন তার চোখে ঘুম আসেনি। রাক্ষসী যমুনার দিকে অপলক দৃষ্টিতে শুধুই তাকিয়ে আছেন তিনি। সবকিছু হারিয়ে তিনি এখন নিঃস্ব।
বলছিলাম জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চিকাজানী ইউনিয়নের বড়খালি মাঝিপাড়া এলাকার মো. তৈবর আলীর স্ত্রী পাঁচ সন্তানের জননী চমক ভান বিবির কথা। ভিটে-মাটি, ফসলি জমি সবই ছিল তার। তাদের পূর্বের বাড়ি ও ফসলি জমি ছিল ওই ইউনিয়নের চরহলকা এলাকায়। বড়খাল মাঝিপাড়া থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিমে। যমুনার ভাঙনে সব শেষ হয়ে আজ তিনি নিঃস্ব। সর্বশেষ আশ্রয়স্থল ছিল রেলওয়ের সরকারি খাস জমি। ১২তম ভাঙনের শিকার হন সেখানে। গত পরশু সেই আশ্রয়স্থলটিও যমুনার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
তিন ছেলে আর দুই মেয়ে সন্তানের জননী তিনি। তার মধ্যে আবার ছোট ছেলেটা শারীরিক প্রতিবন্ধী। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন অনেক আগেই। বড় ছেলেটাকে তেমন পড়া-লেখা করাতে পারেননি চমক ভান দম্পত্তি। অনেক কষ্টে খেয়ে না খেয়ে মেজ ছেলেকে মাস্টার্স অবধি পড়িয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো চাকরির ব্যবস্থা করতে পারেনি সে। বেকার জীবন-যাপন করছে মেজ ছেলেটা। বড় ছেলেটা বাবা-মা, এক বেকার ভাই ও আরেক প্রতিবন্ধী ভাইয়ের ভোরণ-পোষণের বোঝা মাথায় না নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন শ্বশুরালয়ে। বয়স্ক স্বামী, এক বেকার ও আরেক প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটে চমক ভান বিবির। বয়সের কারণে তার স্বামী আজ অক্ষম। তারই মধ্যে শেষ সম্বল ভিটা বাড়িটি রাক্ষসী যমুনার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন অন্যের বাড়িতে ঘরের চালগুলো জমিয়ে রেখেছেন।
আজ তাদের রাত কাটে একজনের ঘরে তো আরেকদিন অন্যজনের ঘরে। কারো ঘরে জায়গা না হলে নদীর তীরেই বসে রাত কাটে তাদের। সত্তর ছুঁই ছুঁই বয়সের স্বামী, বেকার আর এক প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে বড়ই বিপাকে পড়েছেন চমক ভান বিবি। নেই ঘর-বাড়ি। নেই আয়-উপার্জনের কোনো পথ। প্রতিবেশীদের সাহায্য-সহযোগিতায় খেয়ে না খেয়ে কাটছে দিন।
উজানের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জামালপুর জেলায় তৃতীয় দফায় যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে উপজেলার বড়খাল, মাঝিপাড়া, পলাশপুর, আদর্শগ্রাম, খানপাড়া ও গুচ্ছগ্রামসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ অঞ্চলে যমুনা নদীতে প্রায় দুই কিলোমিটারজুড়ে ভাঙন শুরু হয়েছে। এ ভাঙনে গত দুই মাসে আশ্রয়হারা হয়েছেন চমক ভান বিবিসহ প্রায় পাঁচশতাধিক পরিবার। আশ্রয়ের খোঁজে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার (৩১ আগস্ট) ওই এলাকায় এক দিনেই যমুনা গর্ভে বিলীন হয়ে যায় প্রায় ১০ পরিবারের বসতভিটা। ভাঙনকবলিত ওই এলাকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বালুভর্তি জিও ব্যাগের ডাম্পিং স্রোতের তীব্রতায় বিলীন হয়ে যায়। ফলে আবারও পাড়ে ভাঙন দেখা দেয়। এতে আবারও ভিটামাটি হারানোর শঙ্কায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে ওই এলাকার মানুষ।
জানা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ড গত ২০২১ সালের শুরুতেই বড়খাল এলাকায় ভাঙনরোধে যমুনার বাম তীরে ১০০ মিটার বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে। এ মৌসুমের প্রথম দিকে ভাটিতে আরও ১৫০ মিটার বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হয়। সে ডাম্পিং ম্রোতের তোড়ে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় এবং আবারও ভাঙন শুরু হয়। এ ভাঙনের মুখে রয়েছে দেলোয়ার হোসেন উচ্চ বিদ্যালয় ও হলকারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দেলোয়ার হোসেন এবতেদায়ি মাদ্রাসা, বড়খাল জামে মসজিদ, ভেলামারী ও বড়খাল বাজারসহ অন্যান্য স্থাপনা এবং বসতভিটা, ফসলি জমি।
কিছুদিন আগে দেলোয়ার হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ে অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে তিনতলাবিশিষ্ট একটি নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়। যমুনার পাড় থেকে ওই বিদ্যালয় দুটির দূরুত্ব হবে মাত্র ৫০ গজ। ভাঙনরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা না নেওয়া হলে যমুনার গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে প্রতিষ্ঠানগুলো।
সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, যমুনার তীরে মানুষের ভিড়। যারা ভাঙনের শিকার হয়েছেন তারা তাদের ঘর-বাড়ি সরিয়ে নিতে ব্যস্ত। অনেকে এসেছেন ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে বা সহানুভূতি দেখাতে। আবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের কয়েকজন শ্রমিক ভাঙনরোধে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলছেন।
এ সময় বসত-বাড়ি হারিয়েন নিঃস্ব বড়খাল মাঝিপাড়া এলাকার চমক ভান বিবি বলেন, 'বারোবার বাড়ি ভেঙে নিয়েছে নদী। শেষে আশ্রয় হয়েছিল রেলের খাস জমিতে, তাও ভেঙে নিয়ে গেল। এখন আমার আর মাথা গোঁজার ঠাঁই রইল না।'
ভাঙনকবলিত বড়খাল এলাকার আলী হায়দার বাবুল বলেন, 'চার-পাঁচবার ভাঙনের শিকার হয়েছি। এখন অন্যত্র বাড়ি-ঘর করে বসবাস করছি। ভাঙনে বাড়ি-ঘর ফসলি জমি সবই প্রায় শেষ।' এলাকার কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনা রয়েছে। এগুলোকে রক্ষা করতে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করার দাবি জানান তিনি।
একই এলাকার তোতা মিয়া জানান, 'আমার বাড়ি তিনবার নদী ভাঙছে। বাড়ির ভিটা ও আবাদি জমি যায় কিছু ছিল এখন সব শেষ। অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। আমার তো সব শেষ সরকার যদি এখানে একটি বেড়িবাঁধ করে দিতো তাহলে যারা এখনো আছে তারা রক্ষা পেত।'
চিকাজানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল ইসলাম আক্কাস বলেন, 'এলাকার ভাঙনরোধে সিসি ব্লক দিয়ে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হলে এ নদীর ভাঙনরোধ করা সম্ভব হবে। যমুনার নদী বড়খাল, মাঝিপাড়া, খানপাড়াসহ চরডাকাতিয়া হয়ে খোলাবাড়ি পর্যন্ত ভাঙনরোধের স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করেছি।'
জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডে নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম জানান, 'ওই এলাকার ভাঙনরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যে সমীক্ষা চলমান রয়েছে। সমীক্ষার প্রতিবেদন অনুযায়ী ভাঙনরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।'