আন্দোলন ও খটকা

যত ঘণ্টা কাজ করেন, তত ঘণ্টার মজুরি পান রেলওয়ে টিএলআর শ্রমিকরা। ১২ বছর ধরে অস্থায়ী ভিত্তিতে রেলওয়ের বিভিন্ন দপ্তরে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। গত বছর বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন দপ্তরে স্থায়ী শূন্যপদের বিপরীতে অস্থায়ী দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কর্মরত প্রায় সাত হাজার টিএলআর শ্রমিককে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর রেলওয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামসহ সারা দেশের টিএলআর শ্রমিকরা কর্মবিরতিসহ নানা আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেন। এরপর দাবি পূরণ না হওয়ার ফলে আবার তারা আন্দোলনে গেছেন। প্রতিবারই রেল যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। গত মাসেই চাকরির স্থায়িত্ব ও আউটসোর্সিংয়ের প্রতিবাদে রাজধানীতে রেলপথ অবরোধ করে অবস্থান নেন শত শত অস্থায়ী রেলকর্মী। স্বাভাবিকভাবেই রাজধানীর সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

এর পরও রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষ তাদের চাকরি স্থায়ী করেনি। উপরন্তু তাদের বাদ দিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নতুন কর্মী নিয়োগের ঘোষণায় তারা ক্ষুব্ধ। সে সময় কমলাপুর থেকে কিশোরগঞ্জগামী এগারসিন্ধুর ট্রেনটি আটকে দেওয়া হয়। এতে ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা রেললাইন ছাড়বেন না বলে হুঁশিয়ারি দেন। দুপুরের দিকে সেখানে পুলিশ উপস্থিত হয়ে তাদের লাঠিপেটা করে ও ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেয়। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

এতদিনে তাদের দাবি পূরণ না হওয়ার ফলে আবার গত রবিবার চাকরি স্থায়ীকরণসহ বিভিন্ন দাবিতে ঢাকায় বাংলাদেশ রেলওয়ের অস্থায়ী (টিএলআর) শ্রমিকদের অবরোধ কর্মসূচির কারণে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা সারা দেশের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকে। এভাবে সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগে ফেলে দাবি আদায়ের পথ বেছে নিয়েছেন তারা। যদিও রেলওয়ে অস্থায়ী শ্রমিকদের এর বাইরে আন্দোলনের কোনো পথ জানা নেই। যে কারণে তারা মনে করছেন ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দিলে জনগণ ক্ষুব্ধ হবে এবং তাদের দাবি মানতে সরকার বাধ্য হবে। বিষয়টা এত সরলভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে দেশ রূপান্তরে গতকাল একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে শ্রমিকদের দাবি, আন্দোলন এবং পরবর্তী কর্মসূচির কথা জানা গেছে।

যত ঘণ্টা কাজ তত ঘণ্টার মজুরির ভিত্তিতেই এসব অস্থায়ী শ্রমিককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের অনেকে প্রায় ১০ বছর ধরে চাকরি করছেন। ২০২০ সালের নিয়োগবিধিতে তাদের বেসরকারিভাবে কাজ করতে বলা হয়। এ নিয়ে শঙ্কায় পড়েন প্রায় সাত হাজার টিএলআর শ্রমিক। গত জুনে তাদের অস্থায়ী নিয়োগ বাতিল হয়ে গেছে। গত ৭ আগস্ট রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত তাদের চাকরি থাকবে বলে আশ্বাস দেন মন্ত্রী। প্রশ্ন হচ্ছে এরপর কী করবেন শ্রমিকরা? যে কারণে আন্দোলনের বিকল্প পথ বের করা জরুরি।

একই সঙ্গে এ কথাও বলা দরকার, যারা দীর্ঘ সময় ধরে রেলওয়েতে মাস্টাররোলে চাকরি করছেন, তাদের বাদ দিয়ে নতুন করে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ উদ্যোগে একটি বিষয় খটকা লেগেছে। এমন কথা ওপেন সিক্রেট যে, সরকারি চাকরি মানেই ঘুষের খেলা। সেটা যদি মাস্টাররোলে হয়, তাতেও সমস্যা নেই। এ কারণেই কি আবার নতুন নিয়োগ! বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে। নাকি যারা ১২ বছর পার করার পরও চাকরি স্থায়ী করতে পারছেন না, তাদের বাদ দিতে পারলে অনেক সুবিধা। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আবার নতুনদের নিয়োগ দেওয়া হলে দুদিকে লাভ হতে পারে। প্রথমত, কিছু নগদ নারায়ণও হলো, আবার চাকরি স্থায়ী করারও কোনো আন্দোলন থাকল না!

বিষয় যাই হোক, সমস্ত খটকা দূর করে এর একটা স্থায়ী সমাধান দরকার। কয়েক দিন পরপর আন্দোলন, বিভিন্ন জেলার সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া, হাজার হাজার যাত্রীকে জিম্মি করাÑ কোনো সভ্য দেশের রাজনৈতিক চিত্র নয়। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে আমাদের প্রত্যাশা সে রকমই।