হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেছেন, ‘ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন ও সংখ্যালঘু কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হলে ধরে নেব আমরা প্রতারিত হয়ে গেছি।’ তিনি আরও বলেছেন, চার মাস সময় থাকা জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ এখন বিশে^র পরাশক্তিগুলোর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এ নিয়ে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় গভীর উদ্বেগে আছে। গতকাল সোমবার সরকারি দলের সংখ্যালঘুবান্ধব নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন দাবিতে ঘোষিত কর্মসূচি নিয়ে প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ঐক্য পরিষদের নেতৃত্বে গঠিত ধর্মীয় জাতিগত সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর ঐক্য মোর্চা।
প্রথমে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান রানা দাশগুপ্ত। তিনি বলেন, আগামী বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের বাকি আর মাত্র চার মাস। কিন্তু এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ আজ পরাশক্তির যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ায় আমরা এ দেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন। আমরা এ ব্যাপারে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ সব দেশপ্রেমিক জনগণের সচেতন দৃষ্টি কামনা করছি। আমরা আশা করি, সব রাজনৈতিক দল দেশ ও জাতির স্বার্থে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।
তিনি আরও বলেন, ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আমরা মহাসমাবেশ করে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় কিছু দাবি জানিয়েছিলাম। আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অনুন্নত সম্প্রদায়’ শীর্ষক ৩.২৯ অনুচ্ছেদে সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি ছাড়া সব দাবি মেনে নেয়। এর পরিকল্পনায় ছিল অর্পিত সম্পত্তি সংশোধনী আইনের মাধ্যমে প্রকৃত স্বত্বাধিকারীদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, সংখ্যালঘু বিশেষ সুরক্ষা আইনপ্রণয়ন, সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জমি, জলাধার ও বন এলাকায় অধিকার সংরক্ষণে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া, সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্যমূলক সব আইন ও অন্যান্য অবসান। আমরা আশা করেছিলাম ২০২১ সালের মধ্যে সরকার এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সংবিধান বলছে, বাংলাদেশের মালিক হচ্ছে জনগণ। তারাই নির্ধারণ করবে নির্বাচন কীভাবে হবে। কিন্তু এই নির্বাচন ঘিরে বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর তাদের মধ্য থেকে যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াগুলো আমরা দেখছি তাতে বাংলাদেশ যেহেতু ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নির্বাচন সামনে রেখে সব পরাশক্তি বাংলাদেশের ওপর চাপ তৈরি করতে একটি “ডিপ্লোমেটিক ওয়ার্ক” শুরু করেছে। এর পরিণতি নির্বাচনের আগে বা পরে কী হবে এটা নিয়েই আমাদের শঙ্কা ও উদ্বেগ।’
এক প্রশ্নের জবাবে রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কেন হচ্ছে না তা যারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারাই বলতে পারবেন। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন কী করবেন না বারবার এমন দোটানায় যারা আছেন তারাই বলতে পারবেন।’ তিনি বলেন, ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন ও সংখ্যালঘু কমিশন গঠনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। যদি সদিচ্ছা থাকে করবেন। আর যদি না করেন তাহলে আমরা ধরে নেব প্রতারিত হয়ে গেছি। এর বাইরে তো কিছু বলার নেই। তবে, আমরা আশা করি প্রধানমন্ত্রী আমাদের আশাহত করবেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘একমাত্র প্রধানমন্ত্রী ছাড়া রাজনৈতিক দলের কোনো নেতার ওপর আমাদের কোনো আস্থা নেই। এর পরও যদি অঙ্গীকার পূরণ না হয় তাহলে তো এটা প্রতিশ্রুতিভঙ্গের শামিল হবে এবং এটা কোনোভাবেই গণতন্ত্র আইনের শাসনের জন্য শুভ হবে বলে মনে করি না।’
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করেন রানা দাশগুপ্ত। তিনি জানান, ৮ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিভাগে, ১৫ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহ বিভাগে, ২২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বিভাগে এবং ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিভাগের সব মহানগর, জেলাপর্যায়ে ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত গণ-অনশন ও গণসমাবেশ কর্মসূচি পালন করা হবে। এ ছাড়া ২২ সেপ্টেম্বর ভোর ৬টা থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর ভোর ৬টা পর্যন্ত ৪৮ ঘণ্টা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গণ-অনশন ও গণ-অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য মিলন কান্তি দত্ত, ভোলানন্দ গিরি আশ্রমের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি মনীন্দ্র কুমার নাথ, জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাবেক ডিআইজি নিবাস চন্দ্র মাঝি, হিন্দু মহাজোটের নির্বাহী মহাসচিব পলাশ কান্তি দে প্রমুখ।