চাকরি কেন যায়?

‘আমি একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে কাজ করতাম। হাতুড়ি চালিয়ে একটি স্থাপনা ভাঙার সময় আমি একটি বিশেষ ছড়া আবৃত্তি করে তার তালে তালে হাতুড়ি চালাবার অপরাধে চাকরিচ্যুত হই।’ সেই ছড়াটির অশালীন বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘শালার কোম্পানির মায়রে বাপ’।

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে’র মন্ত্রিসভার ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড মিনিস্টার মার্ক গার্নিয়ার তার সেক্রেটারির সঙ্গে একটুখানি গরম রসিকতা করতে গিয়ে চাকরি  হারালেন।  তিনি  সেক্রেটারিকে বলেছেন, একা ঘুমোবে কেন? একটা সেক্সটয় কিনে নিয়ে যাও। তিনি ব্র্যান্ডও বলে দিয়েছিলেন। মার্ক গার্নিয়ারের আফসোস উপকারীকে বাঘে খায়।                                        

‘আমার প্রথম চাকরিটা ছিল ডিশওয়াশিং। ১৮ বছর বয়সে বিনা অভিজ্ঞতায় কাজটা আমার ভালোই লাগছিল। কাজের কথাটা মাকে বললাম। কিন্তু এতটুকু ছেলেকে দিয়ে কেন ডিশওয়াশিং করায় মা তা চাকরিদাতাকে ফোনে জিজ্ঞেস করল। পরদিন অফিসে আর ঢুকতেই পারলাম না। গেটকিপার একটা চিঠি ধরিয়ে দিল, অফিসের সিক্রেটস ফাঁস করার দায়ে আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।’

ডেবরালি লরেঞ্জানা সিটিব্যাংকে এনএ-তে চাকরি করতেন। অফিসের নির্দিষ্ট কোনো ড্রেসকোড না থাকায় ডেবরালি তার পছন্দের পোশাক পরেই আসতেন। তার খোলামেলা পোশাক সহকর্মী পুরুষদের ভালো লাগলেও ম্যানেজমেন্ট পছন্দ করল না। ‘আমি একটি প্রতিষ্ঠানে গার্ডের চাকরি করছিলাম। একদিন একজন সিনিয়র এক্সিকিউটিভ আমাকে হাই তুলতে দেখে সেদিনই আমাকে চাকরিচ্যুত করেন। অথচ এর আগে যে তিন রাত ঘুমিয়েই কাটিয়েছি এটা তার চোখে পড়েনি।’

‘আমি একটি রেস্তোরাঁয় ওয়েটার ছিলাম। একদিন একজন সেলিব্রিটি অভিনেতাকে  রেস্তোরাঁয় পেয়ে তার কাছে একটি অটোগ্রাফ চাইতে তিনি তা সানন্দে দিলেন। কিন্তু ম্যানেজার মনে করলেন তাতে রেস্তোরাঁর কর্মীদের পেশাদারত্ব ক্ষুণœ হয়েছে। আমাকে চাকরিচ্যুত করলেন।’ ‘আমার অফিসে কোনো ড্রেসকোড ছিল না। আমার টাই-এ আমার প্রিয় ফুটবল দলের মানচেস্টার ইউনাইটেডের লোগো দেখে বস ক্ষেপে উঠলেন এবং আমার চাকরি খেয়ে দিলেন। আমি অনুমান করলাম, তিনি সম্ভবত লিভারপুল এফসির সাপোর্টার। অনুসন্ধানে জানতে পারলাম তিনিও মানচেস্টার ইউনাইটেডের সমর্থক। তাহলে আমার চাকরি যাবে কেন? কারণ, তিনি মনে করেন এই দলকে সমর্থন করার যোগ্যতা তার ছাড়া আর কারও নেই।’

ক্যাথে পেসিফিক দুনিয়ার নামজাদা এয়ারলাইন্সগুলোর একটি। ক্যাপ্টেন স্কট মনরো ক্যাথে পেসিফিকের সিনিয়র পাইলটদের একজন। ক্যাথের হংকং অফিসের প্রধান নির্বাহী ডেভিড টার্নবিল। মদ্যপানের সময় হঠাৎ স্কট ডেভিডের ওপর বাদাম ছুড়ে মারে। তাতেই সর্বনাশ যা হওয়ার হয়ে গেল। ডেভিড অফিসে ফিরে গিয়ে বাদাম ছোড়ার মতো অসৌজন্যমূলক আচরণের জন্য স্কটের চাকরিটি খেয়ে ফেলল। সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করলে বলল, ওটা বাদাম না হয়ে বোমাও হতে পারত। ক্যাথে পেসিফিকের কোনো স্টুয়ার্ড যদি প্লেনের যাত্রী গায়ে বাদাম ছোড়ে তাহলে তার কি চাকরি থাকবে? এক্ষেত্রেও তাই। তারপরও প্রশ্ন রয়ে গেছে মূল ঘটনাটি কী? দুজনেই কী একই কেবিন ক্রুর প্রেমে পড়েছিলেন? ঘটনাটির গভীরে কী রয়েছে জানা যায়নি, কিন্তু স্কট এখন চাকরিহারা।

ল্যান্স করপোরাল রোবার্ট উইনার্টন, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর নিয়মিত সৈনিক। রোবার্ট সুন্দরীও বটে। ব্রিটেনের বহুল প্রচালিত ট্যাবলয়েড সান-এর প্রতিনিধির সঙ্গে রোবার্টার যোগাযোগ ঘটে গেল। সুন্দরী সৈনিক সম্মানীর বিনিময়ে ফটোসেশনে রাজি হলো। সান-এর তৃতীয় পাতায় ছাপা হলো তার টপলেস ফটোগ্রাফ। তার বক্ষে সৌন্দর্য অনেকের মন কেড়ে নিলেও ঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারল না রোবার্টার বস। তাকে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্তের কাগজ ধরিয়ে দেওয়া হলো। বুকের কাপড় খসিয়ে চাকরি হারানোতে খুব একটা দুঃখ নেই তার। মডেল হওয়ার জন্য ডাক পেতে শুরু করছে। আর্থিক ক্ষতিটা অন্তত পুষিয়ে যাবে।

পর্নোগ্রাফিক ই-মেইল চালাচালি করতে গিয়ে চাকরি খুইয়েছে আটজন ফ্রেঞ্চ টেকনিশিয়ান। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ইন্টারনেট নেভিগেট করে পর্নোছবি ও এই সংক্রান্ত সাহিত্য সংগ্রহ করে এরা পরস্পরের মধ্যে আদান প্রদান করত। এরা সবাই জেনারেল ইলেকট্রনিক (জিই)-এর গ্যাস টারবাইন ফ্যাক্টরির টেকনিশিয়ান। ভুলবশত এদের একজন ভুল ইলেকট্রনিক ঠিকানায় পাঠিয়ে দেয় এ ধরনের একটি সংগ্রহ। যা পৌঁছে যায় এনবিসি টেলিভিশনের একজন কর্মকর্তার হাতে। এদিকে এনবিসির মালিকানা আবার জেনারেল ইলেকট্রনিকের। প্রেরকের ঠিকানা বের করে সেই সূত্র ধরে কম্পিউটারের ই-মেইল ইন-বক্সে অনুসন্ধান চালিয়ে হাতে-নাতে ধরার মতোই ১৮ জনকেই শনাক্ত করা হয়। সবারই চাকরি গেল। পর্নোছবি কিংবা সাহিত্যের জন্য নয়। বরখাস্তপত্রে যে অপরাধগুলো উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো : ১. কোম্পানির সময়ের অপচয়, ২. হার্ড-ডিস্কের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্মৃতিতে অপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দখল এবং ৩. ভাইরাস আমদানির আশঙ্কা। ম্যানেজমেন্ট ঘুণাক্ষরেও যৌনতার প্রশ্নটি তোলেনি। নগ্ন নারীর ছবি ছাপার খেসারত শেষ পর্যন্ত দিতে হলো কায়রোর সংবাদিক হোসাম ওয়াবাল্লাহকে। সাপ্তাহিক আল মুয়াজাহর একটি নিবন্ধের সঙ্গে ছাপা হয়েছে ছবিটি। খুব রসিয়ে রসিয়ে ছবিটি দেখে অশালীন ছবি ছাপার জন্য পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ওয়াহিদ গাজী এবং প্রতিবেদক হোসাম ওয়াবাল্লাহর বিরুদ্ধে মামলা করে কায়রো পুলিশ। পত্রিকার মালিক চাকরিহারা করেছেন দুজনকেই। তবে তারাও তৈরি হচ্ছেন- আদালতকে বলবেন ছবিগুলো ছাপা হয়েছে বৈজ্ঞানিক নিবন্ধের সঙ্গে। সুতরাং ওই নগ্নতায় কিছু আসে-যায় না।

চাকরি হারিয়েছেন বিচারপতি অলিভার স্পারলক। ৫৬ বছর বয়সী অলিভার শিকাগোর কক কাউন্টি সার্কিট আদালতের বিচারক। বিচারপতিদের কামভাব জাগতে নেই, এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু তা যথাস্থানে হওয়া বাঞ্ছনীয়। বিচারপতি অলিভারের জেগেছে তার খাস কামরায়। বিচারপতি কাউকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে শয্যাসঙ্গী করেননি। সম্মতি নিয়েই খাসকামরায় তারই কোর্টের মহিলা পেশকারকে শয্যাসঙ্গী করেছেন। এ ছাড়াও দু-একজন মহিলা অ্যাটর্নিকে আলিঙ্গন করেছেন। এই অবিচারকসুলভ আচরণের কাহিনি ফাঁস করে দিয়ে গোলমালটা বাঁধিয়েছে তারাই। তবে বিচারপতি অলিভার স্পারলকের বান্ধবী একটি পত্রিকার কোর্ট রিপোর্টার বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে নিজেই আদালতে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং বলেছেন, পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতেই খাসকামরায় তারাও ব্যাপারটা ঘটিয়েছেন। আরও অভিযোগ আছে, তিনি কয়েকজন মহিলা আইনজীবীর কাছে টেলিফোন নম্বর চেয়েছেন, ডেটিং করার প্রস্তাব দিয়েছেন। বিচারপতি অলিভার অভিযুক্ত হিসেবে আদালতকে প্রথমে বললেন, সব মিথ্যা। সব ষড়যন্ত্র। যখন সাক্ষীর ঢল নামল, ঘাবড়ে গেলেন। তখন বললেন, তার দেওয়া রুলিং মহিলা আইনজীবীদের বিরুদ্ধে যাওয়ায় তারা ক্ষেপে এসব আজেবাজে অভিযোগ দায়ের করেছে। কিন্তু কুলাতে পারলেন না অলিভার। ভয়ভীতি দেখিয়ে যৌনসম্ভোগ এবং খাসকামরায় অবিচারকসুলভ আচরণের দায়ে তাকে চাকরিচ্যুত করা হলো। ইলিনয় রাজ্যের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাস এই প্রথম যৌন অসদাচরণের প্রশ্নে একজন বিচারককে অপসারণ করা হলো।

খৈরানি আব্দুল খালিক সিঙ্গাপুরের একজন সুন্দরী মডেল। টাট্টু নামের একটি মাদকের বিক্রি বাড়াবার জন্য একটি বিশেষ শোতে খৈরানি কাপড় ছাড়ছিলেন একে একে। পুলিশও ছিল সেই শোতে, বক্ষদেশ পুরো নির্বাসন হওয়ার পর পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ল। শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ খোলা রাখার মামলা হলো তার বিরুদ্ধে। সংক্ষিপ্ত আদালত এক হাজার সিঙ্গাপুরী ডলার জরিমানা করে বসল। না দিয়ে উপায় নেই। অন্যদিকে শোয়ের জন্য কোম্পানি তাকে দিয়েছে মাত্র ৮০ সিঙ্গাপুরী ডলার। ফলে একদিকে চাকরিচ্যুত, অন্যদিকে ৮০ ডলার কামিয়ে ১ হাজার ডলার জরিমানা। অনুষ্ঠান হচ্ছিল স্থানীয় একটি নৈশক্লাবে। পুলিশ ক্লাব বন্ধ করে দিয়েছে। মালিকও আসামি। তাকে দিতে হবে ১০ হাজার ডলার। বিরোধীদের রাজনৈতিক বক্তব্য বাজেটের ঘাটতি মেটাতেই এই আয়োজন।

ডিসেম্বর ক্রিসমাসের মাস। সান্তা ক্লসের মাস। ক্রিসমাস বাজার তখন জমজমাট। ৫৫ বছর বয়স্ক এক জার্মান ক্রিসমাস মার্কেটে সান্তার চাকরি নিয়েছেন। তিনি শিশুদের উপহার দিয়ে বেড়াবেন। এ কাজেই ব্যস্ত ছিলেন সান্তা। একালের শিশুরা সহজে সান্তাকে বিশ্বাস করতে চায় না। তাকেও রক্তমাংসের মানুষই মনে করে। এই জার্মান সান্তাকে সাধারণ মানুষ ভেবে শিশুরা তাকে খোঁচাতে থাকে। দেখতে চায় সান্তা ক্লসের লাল পোশাকের ভেতর কী আছে। এর ভেতরের মানুষটি কী পুরো দিগম্বর, না অন্য পোশাকে ঢাকা। শিশুদের ফাজলামোতে একপর্যায়ে ক্ষেপে যায় সান্তা। চড় মেরে বসে নয় বছরের একটি বালককে। এখানেই শেষ নয়। তাকে একটি অন্ধকার আলমারিতে আটকে রাখে। ছাড়া পাওয়ার পর বালক পুলিশকে জানিয়ে দেয় সান্তার চড় কাহিনি এবং শিশু-বন্দিশালার বিররণ। পুলিশ বিপাকে পড়ে সান্তাকে তখনই গ্রেপ্তার করবে না ক্রিসমাসের পর। মার্কেটের কর্ণধারও ভাবছে এমন নির্মম সান্তাকে দিয়ে শিশুদের উপহার দেওয়ানো ঠিক হবে, না হবে না। সান্তাও দিন গুনছে এই বুঝি চাকরিটা গেল। বড়জোর ক্রিসমাস পর্যন্ত থাকবে। তারপর হাতকড়া, তদন্ত এবং চাকরিচ্যুতি। নিজের চাকরি বিপন্ন করে এই জার্মান সান্তা পৃথিবীর অন্য সান্তাদের জন্য একটি শিক্ষা রেখে গেলেন শিশুদের চটাতে নেই, ওরা চাকরিও খেতে পারে।

সান্তা নেই তো চাকরি নেই এই সংবাদটি দিয়েছে রয়টার ৫ ডিসেম্বর, ২০০২। ক্যানবেরার একটি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক তার ক্লাসের ছয় বছর বয়সী শিশুদের বলেছেন, আরে ধ্যাৎ বাজে কথা! সান্তা ক্লস বলে কিছু নেই। স্কুলটির নাম করওয়া পাবলিক স্কুল। তখনই শিশুদের মন খারাপ হয়ে গেল। ছুটি হতেই শুরু হলো কান্না। কাঁদতে কাঁদতে অভিভাবকদের বলল তাদের দুঃখের কাহিনি, তাহলে কে দেবে উপহার?

অভিভাবকরা নালিশ জানালেন শিক্ষকের বিরুদ্ধে, সবাই মিলে বিক্ষোভ করলেন। পরে স্কুলের হেডমাস্টার আয়ান পিন্টার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে স্কুলে আসতে নিষেধ করে দিলেন। তাতেও অভিভাবকরা সন্তুষ্ট নন। চাকরিই গেল তার।  ঈশ্বরে অবিশ্বাসী হলে অসুবিধে নেই। কিন্তু সান্তায় অবিশ্বাসী হলে কোনো ছাড় নেই। অবশ্য, একবার সরকারি চাকরি হলে বাংলাদেশে সহজে চাকরি যায় না, বড়জোর লঘুদ- হয়, তাও আবার রাষ্ট্রপতি চাইলেই ক্ষমা করে দিতে পারেন।

লেখক: সাহিত্যিক ও অনুবাদক