ড. ইউনূস এবং রাজনীতির খেলা

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পত্রিকা সম্পাদনা, স্কাউট, অভিনয়, কলাম লেখা, শিক্ষকতা, ব্যবসা ও ব্যাংকার হিসেবে যথেষ্ট অবদান ও বহুমাত্রিক কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ যাবৎ পুরস্কারও পেয়েছেন শতাধিক। সবচেয়ে বড় পুরস্কার পেয়েছেন ‘নোবেল’। একইসঙ্গে এই মানুষটি দেশে-বিদেশে শিক্ষকতা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত।

বিশ্বমহলে সুপরিচিত বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী এই গুণী মানুষটি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় ও যুক্ত হওয়ার একাধিক উদ্যোগ নিয়েছেন অতীতে। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘আমার দল’ নামে রাজনৈতিক দল। সর্বশেষ ২০০৬ সালে নোবেল বিজয়ের ৫ মাসের মধ্যেই ১/১১ এর সময় ‘নাগরিক শক্তি’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। আগামী দিনে অন্য কোনো নামে রাজনৈতিক দল গঠন করবেন কি না, তা তিনিই বলতে পারবেন।

সম্মান, অর্থ, খ্যাতি, পুরস্কার সবই তিনি পেয়েছেন। শুধু রাজনীতিতে সফলতা এখনো অধরা। এ অপূর্ণতা ঘুচাতে দেশের রাজনৈতিক ক্রান্তিলগ্নে ও দুঃসময়ে বারবার উঁকি মেরেছেন। জনগণের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হতে চেয়েছেন, কিন্তু জনগণ তাকে গ্রহণে কার্পণ্য করায় বারবার ফিরে যান। ২০০৭ সালে ১/১১-এর সময়ে সেনা সমর্থিত সরকার, পরাশক্তিধর দেশ ও তার প্রেসক্রিপশন ছিল মাইনাস-টু নীতি, যাতে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে বাইরে রেখে নতুনরা নির্বিঘ্নে রাজনীতি করতে পারেন। উদ্দেশ্য ব্যর্থ হওয়ায়, ‘হাসিনা হটাও নীতিতে’ তখন যাত্রা শুরু হয়।

সুযোগের বসন্তকাল এসেছে মনে করে কভিড-১৯, ইউক্রেন যুদ্ধ, দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈদেশিক বন্ধুদের প্রভাব এসবকে এখন ঢাল হিসেবে নিয়ে চলমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার আরেক নীলনকশা তৈরি করা হয়েছে। বিশ্বের নোবেল বিজয়ী, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সুশীল সমাজের সদস্যদের দ্বারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি পাঠানো হলো একটি বিবৃতি। আহ্বান করা হয়, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে আদালতে চলমান মামলাসমূহের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ রাখতে।

সারা বিশ্বকে বুঝানোর চেষ্টা হলো, বাংলাদেশে বিচার বিভাগ বা সংবিধান বলতে কিছু নেই। আমরা জেনেছি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে ২টি কর ফাঁকি, ১টি মানি লন্ডারিং এবং বাকি মামলাগুলো শ্রমিকদের সঙ্গে ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠানের চুক্তি মতো পাওনা অর্থ আদায়ের জন্য দায়েরকৃত। একাধিক মামলায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস, আইনি যুদ্ধ শেষে করের টাকা পরিশোধ করেছেন। এখনো অনেকগুলো মামলা চলমান। ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, এমন অভিযোগ আদালতে না করে মামলা বন্ধের চিঠি ও বিবৃতি কেন? ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাহেবকে ইনডেমনিটি দিতে যে চিঠি প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে, এ বিষয়ে সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জনাব ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনের ফলাফল পরিবর্তনের অভিযোগে আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা চলছে, রাশিয়ার নোবেলজয়ী সাংবাদিক দিমিত্রি মুরাতভকে বিদেশি এজেন্ট আখ্যায়িত করা হয়েছে যা ফৌজদারি অপরাধ, মিয়ানমারের নোবেলজয়ী অং সান সূচি অসুস্থ ও অমানবিক অবস্থার শিকার হয়ে জেল খাটছেন, মাননীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও নোবেল বিজয়ীরা কি উক্ত ৩ জনের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও চলমান মামলা স্থগিতের জন্য ঐসব দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে অনুরোধ করে বিবৃতি দেবেন? ফিলিপাইনের নোবেলজয়ী সাংবাদিক মারিয়া রেসার বিরুদ্ধে কর ফাঁকির মামলা ছিল, অমর্ত্য সেনের বিরুদ্ধে মামলা ছিল, কোস্টারিকার প্রেসিডেন্টেরও একই অবস্থা ছিল, আলেস বিলিয়াতস্কির (বেলারুশ) জেল হয়েছিল। তাদের বিষয়ে কিছু করণীয় ছিল?

বোদ্ধাদের মতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাহেবের বিরুদ্ধে চলমান মামলার বিষয়, কারণ ও নথিপত্র সম্মানিত স্বাক্ষরদাতারদের সম্মুখে উপস্থাপিত হলে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে কৌশলের মাধ্যমে স্বাক্ষর বা সম্মতি আদায়ের জন্য স্বাক্ষরদাতাদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কেননা এতে তাদের ব্যক্তি ইমেজ ও সম্মান জড়িত। লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অমর্ত্য সেন, পাকিস্তানের মালালা ইউসুফ জাইসহ দক্ষিণ এশিয়ার কেউ কিন্তু ঐ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেননি।

ধারণা করি, চিঠিতে স্বাক্ষরদাতাদের ভুল বুঝানোর ফলে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজের জালে নিজেই আটকা পড়েছেন। বারাক ওবামা বা হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে হুমকি সমেত চিঠি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রেরণ করেছেন, যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে আঘাত করারই শামিল। এর ফলে রাষ্ট্রের অন্যতম অঙ্গ বিচার বিভাগ এবং দেশের ভাবমূর্তিকে বিশ্বের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। এটা ঠিক, ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন জ্ঞানী আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। আমরা তাকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করি। কিন্তু বিচার বিভাগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করার শামিল নয় কি!

সংশ্লিষ্টদের এবং সরকারের উচিত হবে, বিবৃতিদাতা সম্মানিত ব্যক্তিদের ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে অভিযোগের ফিরিস্তি ও তার বিরুদ্ধে চলমান মামলার সব কাগজপত্র প্রেরণ করে, তাদের প্রকৃত ঘটনা জানানো। একইসঙ্গে তাদের কাছ থেকে অভিমত নেওয়া যে, কর ফাঁকি বা শ্রমিকের পাওনা মিটাতে অস্বীকার যিনি করেন তাকে অভিযুক্ত না করা তাদের আইনে আছে কি-না?  তবেই থলের বিড়াল বের হয়ে আসবে। 

ইউনূস সাহেবকে দুটো বিষয় মনে করিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল তার দেশের জনগণ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন রাজনীতির মাঠে। ১৯৫২ সালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গোরিওন এবং জনগণ ‘রাষ্ট্রপতি’ পদে আসীন হওয়ার জন্য পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞানী ‘আলবার্ট আইনস্টাইনকে’ অনুরোধ করেছিলেন। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, I have neither the natural ability nor the experience to deal with human beings. 

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

admozibur@gmail.com