সদর সাহেব হুজুরখ্যাত মোজাহেদে আজম আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর হাতেগড়া ছাত্র মাওলানা আঃ রউফ। গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসার শায়খুল হাদিস ও নায়েবে মুহতামিম। দক্ষিণবঙ্গে তিনি ‘ঢাকার হুজুর’ নামে পরিচিত। স্বীয় ওস্তাদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসায় সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পুরো জীবন কাটিয়ে দিলেন আলো ঝলমলে শহর থেকে দূরের গ্রামে। প্রাজ্ঞ এই ব্যক্তিত্বকে নিয়ে লিখেছেন মুফতি মাহবুবুর রহমান
ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক একটি পারস্পরিক ব্যাপার। একজন শিক্ষক তার ছাত্রের কাছে দার্শনিকের মতো। কারণ জীবন সম্পর্কে যে দর্শনচিন্তা শিক্ষক তার ছাত্রের মধ্যে ছড়িয়ে দেন, তার ভিত্তিতেই সে জীবনের ব্রত ঠিক করেন। মোজাহেদে আজম আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.) যেভাবে উম্মতের প্রতি থাকা দায়বোধ থেকে নিজেকে মানবিকতার জন্য উৎসর্গ করেছিলেন, শায়খুল হাদিস মাওলানা আঃ রউফ সেই মিশনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
মাওলানা আঃ রউফ মুন্সীগঞ্জের (বিক্রমপুর) সিরাজদিখান উপজেলার বাহেরকুচি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ৩ মার্চ ১৯৩৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আঃ আজিজ, মায়ের নাম জোবায়দা খাতুন। তিনি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা তথা স্কুলে পড়ালেখা করেন। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় সদর সাহেব হুজুর (আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.), মাওলানা মোহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জি হুজুর ও মাওলানা আবদুল ওয়াহাব পীরজী হুজুর (রহ.) মোস্তফাগঞ্জ এলাকায় মাহফিলের সফরে আসেন। তখন সদর সাহেব হুজুর (রহ.)-এর সঙ্গে ঢাকার হুজুর মাওলানা আঃ রউফের পরিচয় হয়। ঢাকার হুজুরের বাবা ছিলেন এলাকার চেয়ারম্যান। আগে থেকেই সদর সাহেব হুজুরের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। সেই সুবাদে তিনি এলাকায় একটি বড় মাহফিলের ব্যবস্থা করেন। ওই মাহফিলে এই তিন বুজুর্গ আলেমকে দাওয়াত দেন ওয়াজ-নসিহতের জন্য। ওই মাহফিলকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ ঘটনা ইতিহাসে স্থান করে নেয়। ঘটনাটি হলো মাহফিল কর্র্তৃপক্ষ তিনজনকে তিনশ টাকা হাদিয়া দেন। কিন্তু তারা কোনোভাবেই সেই হাদিয়া গ্রহণ করতে চান না। তখন বলা হয়, এটা রাহ খরচ (ভাড়া)। উত্তরে তারা বলেন, রাহ খরচ তো বারোআনা, তাহলে এত টাকা দিয়ে কী করব?
এরপর তারা জানতে চান, আচ্ছা! আপনাদের এখানে কি কোনো মাদ্রাসা আছে? উত্তরে বলা হলো, নেই। তখন তারা হাদিয়ার টাকাটা গ্রহণ করে টাকাগুলো একটি মাদ্রাসা করার জন্য দিয়ে আসেন। এরপর স্থানীয় এক আলেম (মাওলানা আঃ আজিজ) উদ্যোগী হয়ে ১৯৪৬ সালে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। সেটাই জামিয়াতুল ইসলামিয়া মোস্তফাগঞ্জ মাদ্রাসা।
অষ্টম শ্রেণি শেষ করে ঢাকার হুজুর এই মাদ্রাসায় ভর্তি হন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই ইংরেজিতে চিঠিপত্র লিখতে পারতেন। তিনি স্কুল ছেড়ে মাদ্রাসায় ভর্তি হবেন, এটা শুনে স্কুলের শিক্ষকরা নিষেধ করেন। তা সত্ত্বেও তিনি মাদ্রাসায় ভর্তি হন। মাত্র দুই বছরে পবিত্র কোরআন হেফজ সম্পন্ন করেন। তিনিই মোস্তফাগঞ্জ মাদ্রাসার প্রথম হাফেজ। পরে সেখানে কাফিয়া জামাত পর্যন্ত পড়ালেখা করে জামেয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখানে পড়ালেখার পাশাপাশি হজরত সদর সাহেব হুজুর (রহ.)-এর সান্নিধ্যে যাওয়া শুরু করেন। শরহেজামি থেকে দাওরা হাদিস পর্যন্ত লালবাগ মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেন।
পাকিস্তানের বিখ্যাত আলেম হজরত ইউসুফ বিননূরী (রহ.) একবার আগমন করেন। তিনি হজরত সদর সাহেব হুজুর (রহ.)-এর সঙ্গে বসেছিলেন, তখন ঢাকার হুজুর তাদের সেবাযত্নে নিয়োজিত ছিলেন। ওই সময় হুজুরকে দেখিয়ে সদর সাহেব (রহ.) বিননূরী (রহ.)-কে বললেন, ছেলেটি খুব মেধাবী ও ভদ্র। তাকে আপনার কাছে হাদিস পড়তে পাঠাব। বিননূরী (রহ.) সম্মতি জানালেন।
দাওরায়ে হাদিস শেষ হলে হুজুরের জীবনে ঘটে গুরুত্বপূর্ণ এক ঘটনা। হুজুরের ভাষ্যমতে, ‘আমি এক দিনে তিনটি সুসংবাদ পেলাম। এক. পরীক্ষায় প্রথম হই। দুই. ওইদিনই আমার ও আমার বাবার হজের টিকিট সম্পূর্ণ হয়। তিন. পাঠ্য কিতাব সম্পর্কে পুরোপুরি দক্ষতার বিষয়ে সুসংবাদ দেওয়া হয় উস্তাদদের পক্ষ থেকে।
লালবাগ থেকে উস্তাদ হয়ে মোস্তফাগঞ্জ মাদ্রাসায় আসেন। কিছুদিন পর তিনি বিয়ে করেন একজন গুণবতীকে। তিনি ছিলেন হাফেজে কোরআন। বিয়ে প্রসঙ্গে হুজুর বলেন, বিয়ের জন্য বাড়ি থেকে মেয়েটিকে দেখা হয়। তিনি ছিলেন খুবই মেধাবী, আমারও খুব করে মনে চাচ্ছিল তাকে বিয়ে করার বিষয়ে। কিন্তু আব্বা রাজি ছিলেন না। তখন আমি একটি মানত করি, যদি এই মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়, তাহলে কোনো দিন তাহাজ্জুদ ছাড়ব না। অতঃপর তার সঙ্গেই আমার বিয়ে হয়।
কিছুদিন পর সদর সাহেব (রহ.) বিননূরী (রহ.)-এর কাছে চিঠি লিখে হাদিস বিষয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য হুজুরকে পাকিস্তান পাঠিয়ে দেন। তখন বাংলাদেশের কোথাও উলুমুল হাদিস (উচ্চতর হাদিসশাস্ত্র) বিষয়ে পড়াশোনার ব্যবস্থা ছিল না। আর পাকিস্তানে উলুমুল হাদিসে পড়াশোনার জন্য ভর্তি পরীক্ষা দিতে হলে পাকিস্তান কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার ফলাফলে মেধা তালিকায় এক থেকে পাঁচের মধ্যে থাকতে হয়। এরপর ভর্তি পরীক্ষায় পাস করলে ভর্তি করা হয়। কিন্তু সদর সাহেব হুজুরের চিঠি হজরত বিননূরী (রহ.)-কে দিলে কোনো ধরনের ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই ঢাকার হুজুরকে ভর্তি করে নেওয়া হয়। ঢাকার হুজুরের ভাষ্যমতে, এটা ছিল হজরত সদর সাহেব হুজুর (রহ.)-এর কারামত।
উলুমুল হাদিস পড়া শেষ হলে হজরত বিননূরী (রহ.) সদর সাহেব হুজুর (রহ.)-এর কাছে চিঠি লিখে ঢাকার হুজুরকে পাঠিয়ে দেন। চিঠির ভাষ্য ছিল অনেকটা এমন, ‘এই ছেলের হাদিস পড়ানোর মতো পরিপূর্ণ যোগ্যতা অর্জন হয়েছে, তাকে আপনি হাদিসের কাজে লাগাতে পারেন।’ বাংলাদেশে আসার পর সদর সাহেব হুজুর (রহ.) তাকে গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসার উস্তাদ হিসেবে নিয়োগ দেন।
কিতাব বণ্টনের সময় সদর সাহেব হুজুর (রহ.)-এর ইচ্ছা ছিল তাকে মুসলিম শরিফ দেওয়ার। কিন্তু অনেক মুরব্বি ওস্তাদ থাকায় একজন নবীন আলেমকে মুসলিম শরিফ দেওয়াটা অনেকে পছন্দ করল না। ফলে হুজুরকে দেওয়া হয় সিহাহ সিত্তার অন্যতম কিতাব নাসাঈ শরিফ। হুজুর নাসাঈ শরিফ বেশ গুরুত্ব দিয়ে পড়াতেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যে ছাত্ররা আবেদন জানান হুজুরের কাছে মুসলিম শরিফ পড়ার। পরে তাকে সহিহ মুসলিম পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এর কিছুদিন পর হুজুর সহিহ বোখারি শরিফ পড়ানোর দায়িত্ব পান। সেই থেকে এখনো সহিহ বোখারির দরস দিয়ে যাচ্ছেন। মাওলানা আঃ রউফ শায়খুল হাদিস হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসাসহ অর্ধশত মাদ্রাসায় বোখারির দরস দেন। ঢাকার অন্তত বারো-তেরোটি মাদ্রাসায় হুজুর বোখারির দরস দিয়েছেন। এর কটি হলো ঢালকানগর মাদ্রাসা, মিরপুর জামেউল উলুম মাদ্রাসা, ফয়জুল উলুম মাদ্রাসা, সাইনবোর্ড মাদ্রাসা ও মোস্তফাগঞ্জ মাদ্রাসা অন্যতম। পদ্মার এপারে প্রায় সব দাওরায়ে হাদিস মাদ্রাসাতেই হুজুর পড়াতেন। বিশেষ করে শিবচর জামিয়াতুস সুন্নাহ, রায়েরমহল মাদ্রাসা, রাজৈর মাদ্রাসা, গোপালগঞ্জ কোর্ট মসজিদ মাদ্রাসা, গোপালগঞ্জ ভবানীপুর মাদ্রাসা ও মেরী গোপিনাথপুর মাদ্রাসাসহ এ অঞ্চলের প্রায় সব বড় মাদ্রাসায় তিনি বোখারি শরিফ পড়িয়েছেন। বার্ধক্যজনিত কারণে এখন কথা ভালো করে বলতে না পারলেও, নিয়মিত বোখারির দরসে হাজির হন। কিছু সময় পড়ান।
লালবাগে দাওরায়ে হাদিস শেষ করেই তিনি বাবার সঙ্গে প্রথমবার হজে গমন করেন। এরপর থেকে প্রায় প্রতি বছরই তিনি পবিত্র হজ পালন করেছেন। অনুমান করা হয়, তিনি অন্তত পঞ্চাশবারের বেশি পবিত্র হজ পালন করেছেন। হুজুর খুব সাদাসিধে অবস্থায় হজের সফরে যান। সাধারণ পোশাক, পায়ে স্যান্ডেল ও হাতে পলিথিনের ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে যান হজের সফরে। কখনো বাসায় না বলেই চলে যেতেন। মক্কায় গিয়ে সর্বদা ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকতেন, কখনো খাওয়া-দাওয়া বা ঘুমানোর ফিকির করতেন না।
বলা হয়, পিতা-মাতা সন্তান জন্ম দেন, একজন শিক্ষক সে সন্তানকে যোগ্যতর মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন। আর এভাবে একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীর আত্মিক মাতা-পিতা বা অভিভাবকের স্থান গ্রহণ করেন। মাওলানা আঃ রউফের জীবনে এ কথা মিলে যায় অক্ষরে অক্ষরে। রাজধানী ঢাকার বড় বড় মাদ্রাসায় সহিহ বোখারি পড়ানোর প্রস্তাব পাওয়া সত্ত্বেও শুধু সদর সাহেব হুজুর (রহ.)-এর মহব্বত ও ভালোবাসার কারণে পুরো জীবন গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসায় থাকার সিদ্ধান্ত নেন। চার ছেলে ও পাঁচ মেয়ের জনক তিনি। ছেলেরা সবাই দ্বীনের বিভিন্ন খেদমতে নিয়োজিত। মেয়ের জামাইরাও আলেম।
একজন শিক্ষক তার কথাবার্তা, চাল-চলন, যুক্তিপূর্ণ বিচার-বিশ্লেষণ ও নৈতিক গুণাবলির দ্বারা এমন একটি আদর্শ স্থাপন করবেন, যা শিক্ষার্থীদের সামনে অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। শিক্ষার্থীরা বই পড়ে যেমন জ্ঞানার্জন করে, তেমনি একজন আদর্শ শিক্ষকের দিকে তাকিয়ে তারা জীবনের জন্য শিক্ষালাভ করতে পারে। ঢাকার হুজুর মাওলানা আঃ রউফ তেমনি একজন শিক্ষক। তার জীবন থেকে ছাত্রদের শেখার রয়েছে অনেক অনেক বিষয়। তিনি একজন আলোকিত মানুষ, আলোকিত শিক্ষক। দোয়া করি, আল্লাহতায়ালা হুজুরকে সুস্থ জীবন দান করুন।