অজানা রোগ অতঃপর মৃত্যু

চার সন্তানের জননী হেলেন সিডেরথ। বড় মেয়ে বাদে বাকি সবাই অজানা রোগে প্রাণ হারায়। শিশু তিনটির মৃত্যুর কারণ আজ পর্যন্ত জানা যায়নি। পশ্চিমের নামী হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাদের রোগ শনাক্তে ব্যর্থ হন। বিশ্বে ৩৫ কোটি মানুষের দেহে এমন সব রোগ বাসা বেঁধেছে, যেগুলোর কোনো নাম নেই। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া

মায়ের মন

‘আপনার এমন মনে হচ্ছে। আসলে তেমন কিছু হয়নি।’ এই কথা চিকিৎসকদের কাছ থেকে ব্রিটিশ নাগরিক হেলেন সিডেরথ কতবার শুনেছেন, তা তিনি গুণে শেষ করতে পারবেন না। তার দ্বিতীয় সন্তান উইলহেম সম্পর্কে চিকিৎসকদের এই বক্তব্য তাকে কখনো সন্তুষ্ট করতে পারেনি। ১৯৮৩ সালে উইলহেমের জন্মের পরপরই হেলেনের মনে হয়েছিল, ছেলের শারীরিক সমস্যা আছে। যদিও শিশুটির লাল গাল দেখে তেমনটা মনে হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। হাসপাতালের সবাই নিশ্চিত ছিলেন, উইলহেম পুরোপুরি সুস্থ; তার কোনো শারীরিক সমস্যা নেই। কিন্তু উইলহেম যখন এক বছরে পা দিল, সে সময় তার মৃগীরোগ ধরা পড়ে। একই সঙ্গে পেটের সমস্যাও দেখা দেয়। এই পেটের সমস্যা একপর্যায়ে দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়। তিন বছর বয়সে আরও শারীরিক জটিলতার সম্মুখীন হয় উইলহেম। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা হেলেনকে জানালেন, তার অ্যাজমা হয়েছে। ছেলের অ্যাজমা শনাক্তের পর স্বস্তিতে ছিলেন না হেলেন। জন্মের এক বছর পর থেকে তার ছেলের এসব রোগ কেন হচ্ছে? রোগগুলো দেহে বাসা বাঁধার পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ কী? রোগগুলো কি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত? এগুলো কি নিরাময়যোগ্য? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে পারলে উইলহেমকে পুরোপুরি সুস্থ করা যাবে বলে মনে হয় হেলেনের। দুঃখের বিষয়, তিনি জানতেন না, উইলহেমকে পুরোপুরি সুস্থ করার পথ কঠিন ছিল। মৃগীরোগ, অ্যাজমা তো শনাক্তযোগ্য ব্যাধি। তার ছেলের দেহে এমন রোগ বাসা বাঁধবে, যা শনাক্তই করা সম্ভব হবে না এটা সে সময় জানতেন না হেলেন।    

আক্রান্ত শিশু

অশনাক্তযোগ্য রোগ তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও বিশ্বজুড়ে ৩৫ কোটি মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময় এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা এ ধরনের রোগে অসামজ্ঞস্যপূর্ণভাবে আক্রান্ত। ৫০ শতাংশ অশনাক্তযোগ্য রোগের শিকার এই বয়সী শিশুরা, যাদের ৩০ শতাংশ পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মারা গেছে। কেবল যুক্তরাজ্যেই প্রতিবছর ছয় হাজার শিশু এমন কিছু উপসর্গ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে যেগুলোর কোনো নাম নেই। শিশুদের দুরারোগ্য রোগ শনাক্ত সহজ নয়, এটা ঠিক। কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করা হলে সংকট আরও বাড়ে বৈ কমে না। লন্ডনের গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হাসপাতালের নার্স আনা জিউইট বলেন, ‘বাচ্চাদের অসুখ ঠিক কী কারণে হয়েছে, অভিভাবকরা যখন তা জানতে পারেন না, তখন তারা অথৈ সাগরে পড়েন। কেয়ারগিভাররা যতই তাদের বলুক, শিশু স্বাভাবিক আছে, তা তাদের স্বস্তি দেয় না। স্বস্তিতে তারা কীভাবে থাকবেন, যেখানে তাদের সন্তানরা ভুগছে এমন অসুখে, যা কোনো পরীক্ষায় ধরা পড়ছে না? এই স্বাভাবিক শব্দ তখন তাদের কাছে অসহনীয় শব্দ হয়ে ওঠে।’

চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি সমস্যা হলো, রোগের উপসর্গ দেখা দেওয়া বেশির ভাগ শিশুরই গুরুতর কোনো অসুখ ধরা পড়ে না। সাধারণত তাদের স্বাস্থ্য নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু থাকে না। ফলে অভিভাবকই এটা নিশ্চিত হতে চান যে, তাদের সন্তানরা ভালো আছে। একের পর এক পরীক্ষা, তারপর চিকিৎসকদের কয়েক সপ্তাহ দীর্ঘ বাড়তি অনুসন্ধান এসবের মধ্য দিয়ে যেতে চান না তারা। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হিউম্যান জিনোম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক উইলিয়াম গাল বলেন, ‘সন্তানদের শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আসা ১০০ জন অভিভাবকের বেশির ভাগই এই নিশ্চয়তা চান যে, তাদের ছেলেমেয়ের কিছু হয়নি।’ অনেকের ক্ষেত্রে গুরুতর কিছু হয় না, এটা যেমন ঠিক, তেমনি কারও কারও শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে, এমন নজিরও কম নেই।

এ ক্ষেত্রে উইলহেমের উদাহরণ টানা যেতে পারে। চিকিৎসকরা তার মা হেলেন ও বাবা মিককে আশ্বস্ত করেছিলেন এই বলে যে, তার শরীরে জটিল কোনো রোগ নেই। কেবল দুঃখজনকভাবে তাকে মৃগীরোগ ও অ্যাজমায় ভুগতে হচ্ছে। চিকিৎসকদের এই আশ্বাসবাণীতে সন্তুষ্ট ছিলেন না হেলেন ও মিক। তারা উইলহেমের আরও স্বাস্থ্য পরীক্ষার ওপর জোর দেন। এর মধ্যে বেশ কিছু সময় পার হয়ে যায়। হেলেন বলেন, ‘বন্ধুদের সঙ্গে স্কুলে দুর্দান্ত সময় কাটছিল উইলহেমের। সে অমায়িক স্বভাবের ছিল। তার স্কুলের শিক্ষকরা বলতেন, বড় হয়ে উইলহেম জাতিসংঘের মহাসচিব হবে। আর দশটা স্বাভাবিক শিশুর মতোই ছিল সে।’ স্বাভাবিক শিশুদের মতোই উইলহেম ও তার বড় বোন জীবাণুর আক্রমণের শিকার হতো। কিন্তু সেরে উঠতে যতটা সময় লাগা উচিত, উইলহেমের তার চেয়ে বেশি সময় লাগত। এ নিয়ে চিকিৎসকদের প্রশ্ন করলে হেলেন বারবার একই উত্তর পেতেন ‘কিছু কিছু বাচ্চাদের সারতে সময় লাগে। এ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।’

একদিন দুপুরবেলা উইলহেম ঘরের বাইরে রাস্পবেরি তুলতে গিয়েছিল। তখন তার বয়স পাঁচ বছর। ঘরে ফেরার পর সে এত কাশতে থাকে যে, তার চোখ লাল হয়ে যায়। মুখ ফুলে যায়। এরপর জ¦রে তার গা পুড়ে যেতে থাকে। এত অল্প সময়ের মধ্যে এত উপসর্গ একটি পাঁচ বছরের শিশুর মধ্যে দেখে চিকিৎসকরা অবাক হয়ে যান। এমনটা তারা আগে কখনো দেখেননি। কিন্তু তারা উইলহেমের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেও কিছুই পাননি। হেলেনকে তারা আশ্বস্ত করেন, উইলহেমের শরীরে উপসর্গের কারণ যাই হোক না কেন, এটি বংশগত বা জিনগত নয়। উইলহেমের যখন আট বছর বয়স, তখন হেলেন-মিক দম্পতির আরেকটি ছেলে হয়। তার নাম হুগো।

অনিশ্চয়তায় বসবাস

হুগোর তিন মাস বয়সে হেলেন একদিন গর্ভে অস্বাভাবিক নড়াচড়া টের পান। মনে হচ্ছিল, হুগো অস্থির হয়ে তাকে লাথি মারছে। ছোট বাচ্চা যাদের মৃগীরোগ আছে, তাদের এমনটা করতে দেখেছেন তিনি। উইলহেম বা তার বড় বোন পেটে থাকার সময় হেলেনের এমন অভিজ্ঞতা হয়নি। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে তাকে জানানো হয়, গর্ভে হুগো হেঁচকি দিয়েছিল। ১৯৯১ সালের ২৭ ডিসেম্বর হুগোর জন্ম হয়। জন্মের ছয় ঘণ্টা পর শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। হেলেনের সন্দেহ সঠিক ছিল। হুগো মৃগীরোগে আক্রান্ত। জীবনের প্রথম ছয় মাস হুগোকে হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। হুগোর চিকিৎসক দল একপর্যায়ে সন্দেহ করে, তার বাবা মিক তাকে ঝাঁকুনি দেন। তাদের এই সন্দেহ জানতে পেরে মুষড়ে পড়ে ওই দম্পতি। হেলেন বলেন, ‘আমার স্বামী আজও চিকিৎসক দলের সন্দেহ মাথা থেকে তাড়াতে পারেন না। হাসপাতালে যেতে ওই সময় আমাদের ভয় লাগত। সন্তানদের কীভাবে লালন-পালন করছি, তা ওই দল পর্যবেক্ষণ করত। তাদের পর্যবেক্ষণে থাকার অভিজ্ঞতা ভয়াবহ ছিল।’ হুগোর যখন ১৮ মাস বয়স, হেলেনকে তখন জানানো হলো শিশুটি কখনো হাঁটতে পারবে না বা নিজে থেকে বসতে পারবে না। ওইদিনই হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর তিনি ও তার স্বামী হুগোকে নিজে নিজে সোফায় উঠতে দেখেন। যারপরনাই অবাক হন তারা। হেলেন বলেন, ‘এরপর সে আট কদম হাঁটে। হুগো কেবল হাঁটছিলই না, দৌড়াচ্ছিলও। এই দৌড়ঝাঁপ করে চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত সে ভুল প্রমাণ করে।’ হুগোর স্বাস্থ্য নিয়ে আশার আলো দেখতে শুরু করেন হেলেন ও মিক। ওই ঘটনার মাসখানেক পর হেলেন ফের গর্ভবতী হন। ১৯৯৪ সালের ২৪ জানুয়ারি মিক-হেলেনের চতুর্থ সন্তান ও দ্বিতীয় কন্যা এমার জন্ম হয়। এমা যখন গর্ভে ছিল, তখন হেলেনকে চিকিৎসকরা বলেছিলেন, উইলহেম ও হুগো ছেলে, তাই তাদের মৃগীরোগ হয়েছে। বড় মেয়ের মৃগীরোগ যেহেতু নেই, ছোট মেয়েরও হবে না। জন্মগ্রহণের আধ ঘণ্টার মাথায় এমার দেহ হঠাৎ কেঁপে ওঠে। সবাই বুঝতে পারে, বড় দুই ভাইয়ের মতো এমাও মৃগীরোগে আক্রান্ত।

প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা

এমা যত বড় হতে থাকে, নানা ধরনের দুষ্টুমি করে মা-বাবাকে হাসাতে থাকে। হুগোর মতো সেও পশু-পাখি ভালোবাসত। চার ছেলেমেয়েকে নিয়ে মিক ও হেলেন মধুর সময় কাটালেও উইলহেম, হুগো ও এমা কেন এত অল্প বয়স থেকে রোগে ভুগতে শুরু করল, এই প্রশ্ন ওই দম্পতিকে পীড়া দিত।  তারা লন্ডনের গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হাসপাতাল ও যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তানদের নিয়ে যান। সেখানকার চিকিৎসকরা বের করতে ব্যর্থ হন, ওই তিন শিশুর আসলে কী হয়েছে। তারা তাদের ওই শারীরিক অবস্থাকে ‘প্রকৃতির নিষ্ঠুর লটারি’ হিসেবে অভিহিত করেন। উইলহেমের বয়স যখন ১২, তখন তার স্বাস্থ্যের অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে থাকে তার। সাইকেল চালাতে ভুলে যায় উইলহেম। স্কুলের হোমওয়ার্ক করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। আগে সে হুগো ও এমার সঙ্গে বড় ভাইয়ের মতো খেলত। হঠাৎ সে তাদের সঙ্গে এমনভাবে খেলতে শুরু করল, যেন হুগো ও এমা তার সমবয়সী। একদিন উইলহেম তার দাদিকে চিনতে পারল না। হেলেন ও মিক অস্ট্রিয়ায় তার চিকিৎসা শুরু করেন। তাদের তিন সন্তান মাইটোকন্ড্রিয়াল রোগে আক্রান্ত কি না, তা জানতে হেলেন ও ওই তিন শিশুর ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করা হয় কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। অবশ্য নব্বই দশকে জিন নিয়ে বিজ্ঞানীদের জানাবোঝা অত উন্নত ছিল না।

১৫ বছর বয়সে স্পষ্ট হয়, উইলহেম কখনো সুস্থ হবে না। ১৯৯৯ সালের ২ সেপ্টেম্বর ১৬ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে তার মৃত্যুর সুস্পষ্ট কারণ উল্লেখ ছিল না। উইলহেমের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার তিন সপ্তাহ পর এমা কোমায় চলে যায়। পরের বছর ২০০০ সালের ২০ ডিসেম্বর এমাও মাত্র ছয় বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করে। এর দুবছর পর ২০০২ সালের ৮ ডিসেম্বর ১১তম জন্মদিনের কয়েকদিন আগে হেলেন ও মিক তাদের তৃতীয় সন্তান হুগোকে হারান। মৃগীরোগের পাশাপাশি তার ফুসফুসে সমস্যা ছিল। দুই বছর আগে এক প্রখ্যাত জিনতত্ত্ববিদ হেলেন ও মিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার বিশ্বাস, উইলহেম, হুগো ও এমার নতুন কোনো রোগ হয়েছিল। হেলেন ও মিক জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের জন্য জেনেটিক নমুনা জমা দিয়েছেন। এটা ঠিক, অনেক দেরি হয়ে গেছে। উইলহেম, হুগো বা এমাকে ফেরানো যাবে না। তবে এখনো সময় আছে। ওই তিন শিশুর কী হয়েছিল তা জানা গেলে অন্য শিশুর জীবন রক্ষা করা সহজ হবে বলে মনে করেন হেলেন।