১২ কিলোমিটার রাস্তার পরামর্শকের বেতনই ৮৭ লাখ!

রায়েরবাজার স্লুইসগেট থেকে পোস্তগোলা পর্যন্ত মোট ১২ কিলোমিটারের ইনার সার্কুলার রোড করবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। খরচ প্রায় হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বিভিন্ন খাতের ব্যয় চোখ কপালে ওঠার মতো। এ প্রকল্পে একজন পরামর্শকের বেতন ধরা হয়েছে মাসে ৮৭ লাখ টাকার বেশি। একটি সাধারণ প্রকল্পের জন্য বিপুল বেতনের পরামর্শক নিয়োগের এমন প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শুধু পরামর্শক নিয়োগ নয়, প্রকল্পটির বিভিন্ন অংশের অস্বাভাবিক ব্যয়ের প্রস্তাবও অযৌক্তিক বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন। হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পে রিটেইনিং ওয়াল ও অন্য ওয়াল নির্মাণে ব্যয় হবে ৪০৬ কোটি টাকা। আর শুধু বিদ্যুতের খুঁটি সরাতে ব্যয় হবে ১২০ কোটি টাকা। অস্বাভাবিক ব্যয় থাকায় ব্যয় পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়েছে কমিশনের পক্ষ থেকে।

সম্প্রতি প্রকল্পটির ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা (পিইসি) হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। এতে সভাপতিত্ব করেন পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান।

প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ প্রকল্পটির ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৯৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ৮৯৮ কোটি টাকা, বাকি ৯৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা অর্থায়ন করবে ডিএসসিসি নিজেরাই। কোনো প্রকল্প প্রস্তাব করার নিয়ম হলো, সেটি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্ত করা। কিন্তু প্রকল্পটি চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত নেই।

প্রকল্পটি পিইসি সভায় উপস্থাপন করেন ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী (সিইও) মো. মিজানুর রহমান। পিইসি সভায় তিনি বলেন, এ সড়কটি উন্নয়ন করা হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-মাওয়া সড়কের আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ শতাংশ গাড়ি এ সড়ক ব্যবহার করবে। এখন নিয়মিত দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ২১টি জেলা এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম অঞ্চলের ১৬টি জেলার যানবাহনগুলো ঢাকায় আসছে।

প্রকল্পটিতে পরামর্শক খাতে ৩০ জন মাসের জন্য ২৬ কোটি ২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা অত্যধিক বলে মনে করছেন পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা। অর্থাৎ প্রতি মাসে একজন পরামর্শকের বেতন হবে ৮৭ লাখ টাকা। এ ছাড়া পরামর্শকের কার্যপরিধি কী তাও ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়নি। এ প্রকল্পে রাজস্ব খাতে পরামর্শক রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে দক্ষিণ সিটির সিইওকে।

এ প্রসঙ্গে কথা বলার জন্য ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) সঙ্গে কয়েকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী আশিকুর রহমান বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। কথাও বলতে পারব না।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ইনার সার্কুলার রিং রোডের রায়েরবাজার স্লুইসগেট থেকে পোস্তগোলা পর্যন্ত অংশের অর্থাৎ প্রায় ১২ কিলোমিটার উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত সড়কের উন্নয়ন কাজটি প্রথম ধাপে রায়েরবাজার স্লুইসগেট থেকে লোহার ব্রিজ পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার সড়কের উন্নয়ন করা হবে এবং দ্বিতীয় ধাপে লোহার ব্রিজ থেকে পোস্তগোলা পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার সড়কের উন্নয়ন হবে।

এ প্রকল্পটি হাতে নেওয়ার আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছিল। কিন্তু ডিপিপিতে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের যে তথ্য যুক্ত করা হয়েছে, তা মূল প্রতিবেদন নয়। ফিজিবিলিটি স্টাডি পরিপত্রে উল্লিখিত ফরম্যাট অনুযায়ী করা হয়নি বলে প্রতীয়মান হয় বলে মনে করছে কমিশন।

ডিপিপিতে কিছু অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। এর মধ্যে রয়েছে- ডিপিপিতে ৫ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণে ৩৯৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে অর্থাৎ ১ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণে খরচ পড়বে ৭৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া প্রকল্পে তিনটি ভেহিক্যাল ওভারপাস, তিনটি ফুটওভার ব্রিজ, আটটি স্লুইসগেটসহ পাইপ কালভার্ট, বাস বে, যাত্রী ছাউনি, ফুটপাত কাম ড্রেন, রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের জন্য ৪০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে কয় লেনের কী ধরনের রাস্তা নির্মাণ করা হবে, এর ধারণাগত নকশা ছাড়াও অন্যান্য অঙ্গের সংখ্যা ও পরিমাণ এবং দর প্রাক্কলনের ভিত্তি স্পষ্টভাবে ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়নি।

ডিপিপিতে রাজস্ব খাতে বৈদ্যুতিক খুঁটি এবং টাওয়ার স্থানান্তর খাতে ১২০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শুধু খুঁটি সরাতে এত ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।

প্রকল্প প্রস্তাবে অবকাঠামো ক্ষতিপূরণ বাবদ ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কী ধরনের কতগুলো অবকাঠামোর জন্য এ প্রাক্কলন করা হয়েছে এবং এ প্রাক্কলনের ভিত্তি কী, তাও স্পষ্ট নয়।

এ ছাড়া ডিসম্যানট্যলিং অব স্ট্রাকচার খাতে ৮০ লাখ টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হলেও কী ধরনের কতটি স্ট্রাকচার ডিসম্যানট্যালিং বা সরাতে হবে সে সংক্রান্ত কোনো তথ্য দেয়নি ডিএসসিসি। এ দুই খাতে কতটি বা কী পরিমাণ বৈদ্যুতিক খুঁটি, টাওয়ার স্থানান্তর করা হবে ও কী ধরনের কতটি স্ট্রাকচার সরাতে হবে এবং এতে কী পরিমাণ ব্যয় হবে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে পিইসি সভায়।

প্রকল্পের এত বেশি ব্যয় প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. এমদাদ উল্লাহ মিয়ান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ব্যয় বেশি হওয়ায় আমরা একটি কমিটি গঠন করেছি। সড়কের সঙ্গে সমন্বয় করে এ কমিটি করা হয়েছে। তারা দেখে যেটি বাস্তবসম্মত হয় সেটি নিয়ে তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কমিটির সিদ্ধান্তের পর দরকার হলে আমরা আবার এ প্রকল্পের জন্য আরেকটি পিইসি করব।’

তিনি বলেন, ‘তারা তাদের প্রকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। তবে আমাদের কাছে বেশি মনে হয়েছে তাই আমরা সেটিকে গ্রহণ করিনি। সড়ক ও জনপথের সঙ্গে সমন্বয় করা জরুরি। তাছাড়া এত ব্যয়ের প্রকল্পটির ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের কোনো অনুমোদন নেয়নি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।’