দুই কেজি আপেল-আঙুরে হাজার পার

বর্ধমান পণ্যমূল্যের কারণে সংসারের ঘানি টানতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ফল ব্যবসায়ী হাবিবুল্লাকে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত হরেক রকমের ফল বিক্রি করে সংসার চালান তিনি। নানান ফলের পসরা সাজিয়ে অন্যের চাহিদা মেটালেও সর্বশেষ কবে তিনি নিজ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফল ভাগ করে খেয়েছেন, তা জানেন না। এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন কারওয়ান বাজারের এই ফল ব্যবসায়ী।

তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগের মতো ব্যবসায় লাভ হয় না। ডলারের বাজারে ওঠানামার সঙ্গে ফলের বাজার জড়িয়ে আছে। ডলারের দাম বাড়লে আমদানির ফলেরও দাম বাড়ে। এখন সব পণ্যের দামই বাড়তির দিকে, নতুন করে বিলাতি ফলের দাম বাড়ায় গ্রাহকরা দেশি ফলে আকৃষ্ট হচ্ছেন। চাহিদা বাড়ায় মৌসুমি ফলেরও চড়া দাম। তাই সাধারণ ক্রেতারা খুচরায় ফল কিনছেন।’

গত সপ্তাহ থেকে বাজারে আমদানি করা ফল চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। দেশি ফলের দামও চড়া। ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ফল কেনার সামর্থ্য হারিয়েছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখনো আপেল-কমলার মতো বিলাসী ফল কিনলেও পরিমাণ কমিয়েছে। অনেকে ১৫০-২৫০ গ্রাম আঙুর, দুটি আপেল, ২০০ গ্রাম মালটা, একটি বেদানা ও দুটি করে কমলা কিনছে।

সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার থেকে অন্তত ১৫ জনকে দুটি আপেল, ২০০ গ্রাম আঙুর ও দুটি কমলা কিনতে দেখা গেছে।

তেমনই একজন বেসরকারি চাকরিজীবী আবদুল হালিম। দুই বছরের শিশুসন্তানের জন্য একটি বেদানা ও দুটি আপেল কিনছিলেন তিনি। জানতে চাইলে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘মাসিক আয় ২৬ হাজার টাকা। এ টাকায় সংসারের খরচ চালানো কষ্টকর। পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের জন্য ফল কেনা বন্ধ করেছি কবে মনে পড়ছে না। বাচ্চাদের বেড়ে ওঠার সময়ে তাদের পুষ্টিকর খাবার থেকে দূরে রাখা যায় না। এতে তারা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারাবে। সাধ্য নেই, তবু বাধ্য হয়ে অন্য খাতের খরচ কমিয়ে তাদের জন্য নামমাত্র ফল কিনছি।’

গেল এক সপ্তাহের ফলের বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আপেল, আঙুর, আনারসহ আমদানি করা সব ধরনের ফলের দাম কেজিতে ৫০-৬০ টাকা বেড়েছে। লাল আঙুর ৩৫০ থেকে ৪২০ টাকা, যা আগের সপ্তাহে ছিল ৩০০ থেকে ৩৭০ টাকা। এখন প্রতি কেজি কমলা বিক্রি হচ্ছে ৩২০-২৭০, সবুজ আঙুর ৩৫০-৪২০, কুজি আপেল ৩০০-২৭০, গালা আপেল ২৫০-৩২০, সবুজ আপেল ৪০০-৩২০, মালটা ৩৫০-২৪০, আনার ৩৫০-৩০০ ও নাশপাতি ৩২০-২৬০ টাকায়।

দেশি মৌসুমি ফলেরও চড়া দাম। প্রতি পিস পাকা তাল ৮০-১৫০, জাম্বুরা ৫০-১২০, প্রতি জোড়া আনারস ৮০-১০০, প্রতি হালি সাগর কলা ৪০ ও প্রতি কেজি পাহাড়ি মালটা ১০০-১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট খাতের আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা জানান, এলসি বন্ধ থাকায় কোনো ব্যবসায়ী ফল আমদানি করতে পারছেন না। আগের এলসিতে কিছু ফল আসছে। তবে চাহিদার তুলনায় খুব কম। ডলারের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচও বেড়েছে।

বাদামতলীর সিয়াম ফুডসের বিক্রয়কর্মী শরিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গেল এক সপ্তাহে ডলারের দাম বাড়তে থাকায় ফলের দাম বেড়েছে। প্রতি কার্টনে গড়ে ৪০০ টাকা বেড়েছে। ২১০০-২৪০০ টাকার লাল আপেল এখন ২৪০০ থেকে ২৮০০ টাকা। ৪২০০ টাকার মালটা বিক্রি হচ্ছে ৪৮০০ টাকায়, ৪৮০০ টাকার গালা আপেল বিক্রি হচ্ছে ৫৩০০ টাকায়, ২৪০০ টাকার নাশপাতি বিক্রি হচ্ছে ২৮৫০ টাকায় এবং ২০ কেজির আনারের কার্টন বিক্রি হচ্ছে ৬২০০ টাকায়।’

ফল আমদানিকারক বিকে ফুডস লিমিটেডের পরিচালক মোহাম্মদ সুলাইমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের কারণে বাজারে ফলের চাহিদা বেড়েছে। চাহিদা থাকলে পণ্যের দাম বাড়া স্বাভাবিক। তবে ডলার সংকট থাকায় আমদানিকারকরা নতুন এলসি খুলতে পারছেন না। স্টকের ফল শেষ হতে চলেছে। নতুন এলসি খুলতে না পারলে আগামীতে ফলের দাম আরও বাড়বে।’

পুষ্টিবিদরা বলছেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ও পুষ্টির চাহিদা পূরণে খাদ্যতালিকায় দৈনিক ১৮০-২০০ গ্রাম ফলের প্রয়োজন। চাহিদা অনুযায়ী ফল না খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়াসহ রোগাক্রান্ত হওয়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে; বিশেষ করে হাড় ক্ষয় ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি রয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. তাজউদ্দিন সিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা মানুষকে ফ্যাট জাতীয় খাবার এড়াতে বলি। কিন্তু ফল এমন একটি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাদ্য, যা মানবদেহের জন্য উপকারী। ফল খুবই দরকার। ফলের মধ্যে শর্করা থাকে ফ্যাট শর্করা। ভাত বা অন্য যেসব খাবার পরিহার করতে বলি এর মধ্যে যেগুলোতে ভিটামিন মিনারেল ফ্যাট থাকে, তাতে বিভিন্ন ধরনের বডিবিল্ডিং বায়োমলিকিউল পাওয়া যায়।’

তিনি বলেন, ‘একেকটি ফল একেক রকম। লেবু এক রকম, আনারস আরেক রকম। রোগ প্রতিরোধক হিসেবে এগুলো কাজ করে। যদি না খাওয়া হয় তাহলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় ঘাটতি দেখা দেবে। এগুলো বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গাতেই আছে। আমরা যে পরিবার থেকে উঠে এসেছি, সেই ধরনের পরিবারে মাসে পেয়ারা ছাড়া একটু আপেল খাওয়া হতো। এখন অবস্থার পরির্বতন হয়েছে। মানুষের আর্থিক সংগতিও বেড়েছে, কিন্তু সংগতির সঙ্গে যদি ফলগুলোর দামের সামঞ্জস্য থাকত তাহলে মানুষ স্বাস্থ্যগত প্রটেকশন পেত।’

সম্প্রতি আমদানি করা ফলের দাম অনেক বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশি ফলে আমাদের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এসব ফলে আমরা অভ্যস্ত। এসবের দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই ছিল। এখন দেশি ফলেরও দাম বেড়েছে। গরিব বা মধ্যবিত্ত কখনো আমদানির ফলের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। এগুলো সাধারণত ধনীদের ফল। নতুন একটা উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হয়েছে। তাদের সক্ষমতাও বেড়েছে। বলতে চাই, ফল ক্রেতার সামাজিক প্রেক্ষাপট বদলেছে।’