চলচ্চিত্রের ছায়াসঙ্গীর হঠাৎ প্রস্থান

শুধু সালমান শাহ-মৌসুমীই নয়, আজকের সুপারস্টার শাকিব খান, পপি, ইরিন জামানের মতো অনেক জনপ্রিয় তারকা সিনেমায় এসেছেন সোহানুর রহমান সোহানের হাত ধরে। তাইতো তাকে বলা হয় তারকা তৈরির কারিগর। নতুন জুটি দিয়েও যে ছবি হিট করা যায় সেটি তিনি প্রমাণ করেছিলেন। এরপর তার দেখাদেখিই অনেকে নতুনদের নিয়ে কাজ করার ব্যাপারে আগ্রহী হন। সোহান ছিলেন পুরোদস্তুর চলচ্চিত্রের মানুষ। চলচ্চিত্রের প্রতিটি সংকটে, সুসময়ে তিনি ছিলেন ছায়াসঙ্গী। একইসঙ্গে আধুনিক মানসিকতা ও বয়সের অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি শেষ দিন পর্যন্ত চলচ্চিত্রশিল্পে দারুণ ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিয়ে গেছেন। এজন্যই তাকে সবাই ভালোবাসত, সম্মান করত, পরিবারের মানুষ মনে করত, চলচ্চিত্রের অভিভাবক মনে করতা। সেই মানুষটির এই হঠাৎ চলে যাওয়ায় তাই চলচ্চিত্রশিল্প যেন শোকের কালো ছায়ায় নিমজ্জিত।

১৯৯৩ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবিটি। সোহানুর রহমান সোহানের এ ছবির মাধ্যমে দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষরা পেয়েছিলেন দুটি নতুন মুখÑ মৌসুমী ও সালমান শাহ। এ বছর ছবিটির ৩০ বছর পূর্তি হয়। ‘উপমহাদেশের সাড়া জাগানো প্রেমকাহিনির ছবি। আসিতেছে ঈদুল ফিতরের শ্রেষ্ঠ ছবি ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। যে ছবি দেখার জন্য এখন থেকেই ব্যাপক প্রস্তুতি পরিলক্ষিত হচ্ছে দর্শকদের মধ্যে। সুধী দর্শকরা বলছেন, এ ছবিই হবে ’৯৩-এর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ফটোসুন্দরী মৌসুমী ও ‘লাভার বয়’ সালমান শাহ অভিনীত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবি ঝড় তুলবেই।’ মুক্তির আগে এমন কথা লিখে পোস্টার ছাপায় দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহ মালিক। পোস্টারের সেই কথা মিথ্যা হয়নি। বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের একটি মাইলফলক হয়ে আছে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবিটি। মুক্তির ৩০ বছরে এসেও এ ছবির আবেদন যেন প্রথম দিনের মতো। সবাই এখনো ছবিটি নিয়ে কথা বলতে ভীষণ ভালোবাসেন, আনন্দ পান। আর কেয়ামত থেকে কেয়ামত ছবিটি দিনকে দিন ছবিপ্রেমীদের মনের কোণে আরও শক্তপোক্ত জায়গা করে নিচ্ছে।

সালমান-মৌসুমীর জন্য নয়, নির্মাণের জাদুতেই ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিল। এতে শিল্পীর কোনো হাত নেই। কারণ, কেন্দ্রীয় চরিত্র সালমান-মৌসুমী দুজনই ছিলেন নবাগত।

ছবির গুণেই ছবিটি আজও মানুষের হৃদয়ে দাগ কেটে আছে। এমনটাই মনে করেন এ ছবির পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান। ২০২২ সালের ২৪ মার্চে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘৩০ বছরে এসে কেউ আয়োজন করে আমার সিনেমার কথা স্মরণ করছেন, এটা তো অবশ্যই ভালো লাগার। আমাদের চলচ্চিত্রের জন্যও খুব ভালো দিক। তবে খুব বেশি করে ৩০ বছর আগের দিনটা মনে পড়ছে। কীভাবে ছবিটা মুক্তি পেল, কীভাবে ব্যবসা করল, আমাকে কিংবা আমার ছবির শিল্পীরা এ ছবির বদৌলতে কীভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। এই দিনে এসব মনে পড়ছে।’

ছবিটি এতটা সাড়া ফেলবে, ভেবেছিলেন কী? এক সাক্ষাৎকারে জানতে চাওয়া হয়েছিল সোহানুর রহমান সোহানের কাছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, ‘এটা যে প্রেমের আদর্শ গল্প হয়ে যাবে, এই জুটি যে প্রেমের আদর্শ জুটি হবে, প্রিয় জুটি হয়ে উঠবে, ভাবিনি। এত বড় স্বপ্ন মানুষ দেখতে পারে না। যখন পেছনে ফিরে তাকাই, দেখা যায়, এই স্বপ্ন যদি দেখতাম, তাহলে স্বপ্ন দেখেই মারা যেতাম। ৩০ বছর সমানতালে জনপ্রিয় থাকবে একটা ছবি, এর প্রতিটি গান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে স্পর্শ করবে- এসব ভাবার মতো শক্তি আল্লাহ দেননি। এটা আল্লাহর দান। এটা মানুষ কখনো সৃষ্টি করতে পারে না’।

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আনন্দমেলা সিনেমা লিমিটেড হিন্দি ‘সানাম বেওয়াফা’, ‘দিল’ ও ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’-এর কপিরাইট নিয়ে সোহানুর রহমান সোহানের কাছে আসে এর যেকোনো একটির রিমেক করার জন্য। উপযুক্ত নায়ক-নায়িকা খুঁজে না পেয়ে সম্পূর্ণ নতুন মুখ দিয়ে ছবি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন তারা। নায়িকা হিসেবে মৌসুমীকে নির্বাচন করেন। নায়ক হিসেবে প্রথমে তৌকীর আহমেদ ও পরে আদিল হোসেন নোবেলকে প্রস্তাব দিলে তারা ফিরিয়ে দেন। তখন নায়ক আলমগীরের সাবেক স্ত্রী খোশনুর আলমগীর ‘ইমন’ নামের এক ছেলের সন্ধান দেন। প্রথম দেখাতেই তাকে পছন্দ করেন পরিচালক এবং ‘সনম বেওয়াফা’ রিমেকের জন্য প্রস্তাব দেন। কিন্তু ইমন ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’-এর জন্য পীড়াপীড়ি করেন। এ ছবি তিনি ২৬ বার দেখেছেন। শেষ পর্যন্ত পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন ও ইমনের নাম পরিবর্তন করে সালমান শাহ রাখা হয়। আমির খান ও জুহি চাওলা অভিনীত ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ চলচ্চিত্রের কাহিনি লিখেছেন নাসির হোসেন আর পরিচালনা করেন মনসুর খান। এদিকে বাংলাদেশে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেছেন সোহানুর রহমান সোহান ও সংলাপ লিখেছেন আশীষ কুমার লোহ। প্রযোজক সুকুমার রঞ্জন ঘোষের আনন্দমেলা সিনেমা লিমিটেডের ব্যানারে নির্মিত হয় ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। ছবিতে সালমান-মৌসুমী ছাড়া আরও অভিনয় করেন রাজিব, আহমেদ শরীফ, আবুল হায়াত, খালেদা আক্তার কল্পনা, মিঠু, ডন, জাহানারা আহমেদ, অমল বোসসহ অনেকে। চলচ্চিত্রটি ১৯৯৩ সালের ঈদুল ফিতরে মুক্তি পায়।

সত্তরের দশকের শেষ ভাগে নির্মাতা শিবলি সাদিকের সহকারী পরিচালক হিসেবে ঢালিউডে আসেন সোহান। ১৯৮৮ সালে ‘বিশ্বাস অবিশ্বাস’ সিনেমা দিয়ে পরিচালনায় নাম লেখান। ১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ নির্মাণ করে খ্যাতি পান। চার দশকের ক্যারিয়ারে রোমান্টিক সিনেমা নির্মাণ করে পরিচিতি পেয়েছেন সোহান। ‘অনন্ত ভালোবাসা’, ‘আমার জান আমার প্রাণ’, ‘কোটি টাকার প্রেম’, ‘সে আমার মন কেড়েছে’সহ বহু সিনেমা নির্মাণ করেছেন সোহান। ১৯৫৯ সালের ১৫ অক্টোবর বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার ফুলবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন সোহান। বগুড়া ও জয়পুরহাটে স্কুল ও কলেজজীবন শেষে ঢাকায় আসেন তিনি।