সর্বজনীন পেনশন

প্রবাসে সাড়া কম, কী বলছে কর্তৃপক্ষ

দেশে প্রথমবারের মতো সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালুর এক মাস পূর্ণ হয়েছে রবিবার (১৭ সেপ্টেম্বর)। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৭ আগস্ট এর উদ্বোধন করেন।

প্রথম মাসে পেনশন স্কিমে অ্যাকাউন্ট খুলে চাঁদা পরিশোধ করেছেন ১২ হাজার ৮৮৯ জন। তবে পেনশন স্কিমের প্রতি মানুষের যে সাড়া পাওয়া গেছে তা কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সর্বজনীন পেনশন স্কিমে আছে মোট চারটি ধরন-প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা। এর মধ্যে প্রথম এক মাসে প্রগতি স্কিমে ছয় হাজার ১৭৬ অ্যাকাউন্ট চালু হয়েছে, যা পেনশন স্কিমের মোট অ্যাকাউন্টের প্রায় অর্ধেক। এ ছাড়া সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় ৪ হাজার ৯৯০, সমতা কর্মসূচিতে ১ হাজার ৩২৬ অ্যাকাউন্ট চালু হয়েছে।

আর বিদেশে বাস করেন এমন বাংলাদেশিদের জন্য প্রবাস স্কিমে মাত্র ৩৯৫ জন অ্যাকাউন্ট চালু করেছেন। একে ‘হতাশাজনক’ বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মন্তব্য, সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালুর সময় বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা হয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ দেখা গিয়েছিল। ১৭ আগস্ট এ কর্মসূচির উদ্বোধনের কয়েক ঘণ্টা পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, এক সঙ্গে ১১০০-১২০০ লোক তাদের প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে। আর প্রথম দিনেই নিবন্ধন করেন হাজারেরও বেশি মানুষ। সেই হিসেবে উদ্বোধনের এক মাস পর যে পরিমাণ নিবন্ধন হয়েছে, তাতে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে মানুষের আগ্রহে ভাটা পড়ল কি না?

অনেকে বলছেন, এ স্কিম চালুর সময় দেশের অন্তত ১০ কোটি মানুষকে পেনশন ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসার প্রত্যাশার কথা জানিয়েছিল সরকার। যেহেতু সরকারি চাকরির বাইরে দেশে পেনশন সুবিধা খুব একটা নেই, তাই ধারণা করা হয়েছিল এ কর্মসূচিতে মানুষের সাড়া মিলবে। তা ছাড়া দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রবাসী। যাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নেই। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বের ১৬৮টি দেশে বাংলাদেশি কর্মী আছেন ১ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি। তাদের মধ্যে একটা বড় অংশ সৌদি আরব, দুবাই, কাতার, মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন। তুলনামূলকভাবে ইউরোপ-আমেরিকায় যারা বসবাস করেন বা কাজের জন্য গিয়েছেন তাদের সুযোগ-সুবিধা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা অনেক বেশি থাকলেও অন্যান্য দেশগুলোতে তা সীমিত।

তাদের ভাষ্য, এসব দেশে বসবাসকারী শ্রমিকরা লম্বা সময় কাজ করার পর অসুস্থ হয়ে বা অন্য কারণে দেশে ফির আসলে তাদের সঞ্চয় বলতে কিছু থাকে না। তখন তাদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। ধারণা করা হয়েছিল সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে প্রবাসীদের একটা বড় অংশকে যুক্ত করা যাবে। কিন্তু প্রথম এক মাসে মাত্র ৩৯৫ প্রবাসী এ কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়াটা হতাশাজনক।

প্রবাসীদের এ কর্মসূচিতে যুক্ত না হওয়ার কারণ জানতে দেশ রূপান্তর থেকে হোয়াটস অ্যাপে যোগাযোগ করা হয় সৌদি আরবের তায়েফে বসবাসকারী বাংলাদেশি আব্দুল্লাহ আল জাবেরের সঙ্গে। সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলায় তার বাড়ি।

তিনি বলেন, আমরা যারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বসবাস করি, তাদের স্যালারি বা মজুরি কিন্তু খুব বেশি না। আমরা এখানে যা টাকা পাই, তা দিয়ে পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজেদের জন্য কোনো সঞ্চয় করা সম্ভব নয়।

সরকারের প্রবাসীদের পেনশন কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে বিষয়টি জানেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জানি আবার জানি না। ফেসবুকে আর অনলাইন পত্রিকায় এ নিয়ে কিছু আলোচনা দেখেছি। কিন্তু বিষয়টি পরিষ্কার না। দূতাবাস থেকে আমাদের কিছু জানানো হয়নি। আগে বিষয়টি প্রবাসীদের কাছে পরিষ্কার করতে হবে। এতে যদি আমাদের সত্যিই লাভ হয় তাহলে আমার মতো অনেক প্রবাসী যুক্ত হবেন।

একই বিষয়ে মেসেঞ্জারে কথা হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজায় বসবাসকারী বুরহান উদ্দীনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পেনশন কর্মসূচি সম্পর্কে কিছুই জানি না। দিনে ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। আসা-যাওয়া, বাসায় গিয়ে রান্না করা, দেশে কথা বলা-এতেই তো দিন শেষ হয়ে যায়। পেনশনের খবর কেমনে নেই’।

এ কর্মসূচিতে যুক্ত হবেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দেখেন, আমাদের এখান থেকে অনেক বয়স্করা যখন শেষ বেলায় দেশে ফেরেন, তখন বলতে পারেন তারা শূন্য হাতে ফেরেন। অধিকাংশ সময় পরিবার থেকে তারা কোনো সাপোর্ট পান না। আমদের যে আয় তাতে মাসে ৫ হাজার টাকা জমা দেওয়া বেশ কঠিন। মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারলে ভালো হবে’।

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার নজরুল ইসলাম সৌদি আরবের মক্কায় একটি ফাস্ট ফুডের দোকানে কাজ করেন। পেনশন স্কিম নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফেসবুক ও অনলাইনে তিনি বিষয়টা দেখেছেন। কিন্তু তিনি পুরোপুরি পেনশন বিষয়ে জানেন না। বিষয়টা আরও বেশি প্রচার প্রয়োজন। কীভাবে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে হবে সে বিষয়টি আরও পরিষ্কার করতে হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রবাসীরা কিন্তু সুযোগ পেলে দেশ নিয়ে আলোচনা করে। পেনশন নিয়েও আমাদের আলাপ হয়। এটা নিয়ে এক ধরনের ভীতি কাজ করছে। কেউ কেউ বলে সরকার নির্বাচনের টাকা তুলতে এটা করছে। আবার কেউ বলে আমাদের ভালোর জন্যই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এদিকে গত ২৮ আগস্ট মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকে সর্বজনীন পেনশন নিয়ে জনগণ যাতে কোনো অপপ্রচারে প্রভাবিত না হয়, সেদিকে নজর রাখতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রকৃত তথ্য, সরকার কী করেছে, কী করতে যাচ্ছে, কীভাবে মানুষ উপকৃত হবে, এ ব্যাপারগুলো জনগণের কাছে উপস্থাপন করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ দিয়েছেন।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য গোলাম মোস্তফা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এক মাস কিন্তু খুব বেশি সময় নয়। প্রথম মাসে যুক্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা দেখেই কিন্তু আগ্রহ কমে গেছে বা বেড়ে গেছে এমন মন্তব্য করা ঠিক হবে না।

মাত্র ৩৯৫ জন প্রবাসী যুক্ত হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে গোলাম মোস্তফা বলেন, আমরা এ সংখ্যা নিয়ে হতাশ নই। আমরা প্রচারটা আরো বেগবান করার চেষ্টা করছি। আশা করি খুব দ্রুত আমরা ভালো ফলাফল পাব। প্রবাসীদের যুক্ত করতে আমরা প্রচার বাড়ানোর চেষ্টা করছি। ইতিমধ্যে জুমে বিদেশে দায়িত্ব পালনরত মিশনগুলোর সঙ্গে মিটিং করেছি। মিশনগুলোতে লিফলেট, বুকলেট পাঠানোর কাজ শুরু হয়েছে। মিশনের সঙ্গে মিটিংয়ে মুখ্য সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ সচিব, প্রবাসী কল্যাণ সচিব ছিলেন। মিটিংয়ে অনেকগুলো নির্দেশনা দেওয়া হয়। এটা একটা ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। আরও সময় প্রয়োজন।

সর্বনিম্ন চাঁদা পাঁচ হাজার বেশি হয়ে যায় বলে অনেক প্রবাসীর অভিমত, এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোলাম মোস্তফা বলেন, ইতিমধ্যে বিষয়টি আমাদেরও নজরে এসেছে। আমাদের কাছেও দু’একজন এমনটি জানিয়েছেন। একটা বিষয়ে তো চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, এখনো চাঁদা কমানোর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা বিষয়টি আরো পর্যবেক্ষণ করব।

পেনশন স্কিমের টাকা নিয়ে বিভিন্ন অপপ্রচার চলছে এ বিষয়ে গোলাম মোস্তফা বলেন, পেনশন স্কিম থেকে টাকা নিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ নিয়ে কোনো লুকোচুরিও নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া যে কেউ যে কোনো মুহূর্তে তার টাকার খবর জানতে পারবেন। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ বা কর্মসূচি এটা কিন্তু সুনির্দিষ্ট আইন দিয়ে তৈরি হয়েছে। পেনশন খাতের টাকা অন্য কাজে ব্যবহারের সুযোগ নেই।