আমাদের দেশজুড়ে আমরা মাত্র একটি ভাষায় কথা বলে থাকি। বিকল্প ভাষার প্রয়োজন পড়ে না। অথচ আমাদের নিকট প্রতিবেশী ভারতীয় নাগরিকরা সেটা কল্পনাও করতে পারে না। পশ্চিম বাংলার অনেকে এ নিয়ে তাদের আক্ষেপের কথা অকপটে বলেছিল। নিজেদের প্রদেশেও বাংলা ভাষায় একচেটিয়া কথা বলার উপায় তাদের নেই। বৃহৎ ভারতে সাতাশটি স্বীকৃত ভাষা রয়েছে। এছাড়া অস্বীকৃত আঞ্চলিক ভাষা তো গুনে শেষ করা যাবে না। ভারতকে ইউরোপ মহাদেশের সঙ্গে এক্ষেত্রে তুলনা করা যায়। ইউরোপের প্রতিটি দেশের যেমন ভিন্ন-ভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতি। ঠিক তেমনি বৃহৎ ভারতের প্রতিটি প্রদেশের ভাষা-সংস্কৃতি ভিন্ন ভিন্ন। কোনোটির সঙ্গে কোনোটির মিল নেই। ভারতীয়দের সরকারি ভাষা হিন্দি। মাতৃভাষা সেখানে আঞ্চলিক ভাষার মর্যাদায়।
আমরা অধিক ভাগ্যবান কেননা আমাদের মাতৃভাষাই রাষ্ট্রভাষা। ভারতীয়দের ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটেনি। হিন্দিভাষী প্রদেশের নাগরিকরা শুধুমাত্র সে দাবির যোগ্যতা রাখে। অন্যরা নয়। সরকারি হিন্দি ভাষা কিন্তু সব প্রদেশে সম্মান ও মর্যাদায় নেই। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে সরকারি হিন্দি ভাষা তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। দক্ষিণের চার প্রদেশের প্রাদেশিক ভাষার একমাত্র বিকল্প ভাষা রূপে তারা সানন্দে ইংরেজিকে গ্রহণ করেছে। এই চার রাজ্য যথাক্রমে তামিলনাড়, অন্ধ্র, কেরালা এবং কর্নাটক। এই চার রাজ্য নিয়েই দক্ষিণ ভারত। পাশাপাশি চার রাজ্যের পৃথক চার ভাষা। তামিল, তেলেগু, মালয়ালাম এবং কানাড়া। কোনোটির সঙ্গে কোনোটির সাদৃশ্য নেই। না-বর্ণমালায়, না-শব্দে। দক্ষিণ ভারতীয়রা সচেতনভাবে হিন্দি ত্যাগ করেছে। সরকারি ভাষা হিন্দির প্রতি তাদের ন্যূনতম ভালোবাসা নেই। রয়েছে অবজ্ঞা। দক্ষিণের অনেকের কাছে হিন্দি প্রত্যাখ্যান প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেছিলাম। তাদের প্রত্যেকেরই উত্তর ছিল একই রকম। তাদের অভিযোগ ‘ভারতের সব আঞ্চলিক ভাষার মতো হিন্দিও আঞ্চলিক ভাষা। ব্রিটিশদের অধীনতা থেকে মুক্তির পর হিন্দিভাষী ভারতীয় রাজনীতিকরা জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করে হিন্দিকে সরকারি ভাষার মর্যাদায় জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল। এই চাপাচাপি দক্ষিণ গ্রহণ করেনি।’
এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্যটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন ভারতে রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে শান্তিনিকেতনে মতবিনিময় সভায় রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ‘স্বাধীন ভারতে প্রাদেশিক ভাষাসমূহ অপরিবর্তিত থাকবে। এখন যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনি। তবে রাষ্ট্রভাষা হতে হবে ইংরেজি।’ সেই বৈঠকে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহও উপস্থিত ছিলেন। হিন্দি বলয়ের ভারতীয় বুর্জোয়া-পুঁজিপতি শ্রেণি এবং রাজনীতিকদের কারণেই ভারতের সরকারি ভাষা হিন্দি হয়েছিল। এই হিন্দির অসীম আগ্রাসনে একমাত্র দক্ষিণ ভারত ছাড়া সারা ভারতের মাতৃভাষা-সংস্কৃতিকে বিপদাপন্ন করে তুলেছে। যার জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত আমাদের অভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতির পশ্চিম বাংলার দিকে তাকালেই স্পষ্ট দেখতে পাব। প্রদেশের রাজধানী কলকাতা এক সময়ের বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির পীঠস্থান ছিল বটে। এখন অতীতের সেই ঐতিহ্য ইতিহাসে রয়েছে মাত্র। বাস্তবে সেখানে বাংলা ভাষা- সংস্কৃতি ক্রমেই বিলুপ্তির পথ ধরেছে। বাংলা ভাষা সেখানে কঠিন সময় অতিক্রম করছে। কলকাতার কেন্দ্রস্থলে বাংলায় কথা বলার পর্যন্ত উপায় নেই। বাংলাভাষী লোক সেখানে খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। হোটেলে, মার্কেটে, ট্রামে, বাসে, হাটে-বাজারে যেখানেই কথা বলার প্রয়োজন হবে, কথা বলতে হয় হিন্দিতে। বাংলাভাষী পশ্চিম বাংলার মানুষেরাও ক্রমেই হিন্দিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।
মনে পড়ে, ১৯৮৮ সালে কলকাতার নাট্যদল নান্দীকারের নাট্য-উৎসবের আমন্ত্রণে ঢাকা থিয়েটারের প্রতিনিধিরূপে কলকাতায় গিয়েছিলাম। ‘কেরামত মঙ্গল’ নাটকটি উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছিল রবীন্দ্র সদনে। রবীন্দ্র সদনে উপচেপড়া দর্শকদের উপস্থিতিতে নাটকের প্রদর্শনীর পর দর্শক প্রতিক্রিয়ায় হতাশ হয়েছিলাম। দর্শকদের অভিযোগ ছিল নাটকের সংলাপ তাদের বিন্দু-বিসর্গও বোধগম্য হয়নি। এ নিয়ে নান্দীকার প্রধান নাট্যজন রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত বলেছিলেন, ‘হিন্দি শুনতে শুনতে কলকাতার বাঙালিদের কান নষ্ট হয়ে গেছে। আর হিন্দি বলতে বলতে বাংলা ভাষাও ভুলতে বসেছে। সেখানে পূর্ববাংলার গ্রামীণ বাংলা ভাষার ‘কেরামত মঙ্গল’ নাটকের সংলাপ তাদের বোঝার উপায় কোথায়?’ বাংলা শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির পীঠস্থান কলকাতার বাঙালিদের বাস্তব অবস্থা দেখে সেদিন আমরাও কম হতাশ-বিস্মিত হইনি। এক ধরনের আতঙ্ক সেদিনই উপলব্ধি করেছিলাম। এখন তো বিষয়টি আরও চরম আকার ধারণ করেছে। কলকাতার উচ্চবিত্তদের পাশাপাশি মধ্যবিত্তরা পর্যন্ত বাংলা ত্যাগ করে হিন্দি-ইংরেজি ভাষার শিক্ষাক্রমে সন্তানদের ঢালাওভাবে ঠেলে দিয়েছে। সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠার মোহে তারা মাতৃভাষা বাংলা ছেড়ে হিন্দি-ইংরেজির পিছু নিয়েছে।
প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগে শারদীয় দুর্গাপূজায় কলকাতায় গিয়েছিলাম। কলকাতার বাইরে মফস্বল ও জেলাগুলোর পূজা দেখতে চব্বিশ পরগনা, হাওড়া, বর্ধমান, চুঁচুড়াসহ অনেকগুলো স্থানে গিয়েছিলাম। দেখেছি বারোয়ারী পূজা মণ্ডপের মাইকগুলোতে হেমন্ত, সতীনাথ, মান্না দে, কিশোর কুমার, জগন্ময় মিত্র, তালাত মাহমুদ, সলিল চৌধুরী, শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র, দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, সাগর সেন, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, ভূপেন হাজারিকাসহ বরেণ্য বাংলা গানের শিল্পীদের গান দিন-রাত বেজে চলেছে। অথচ মাত্র ক’বছর আগে ওই স্থানগুলোতে দুর্গাপূজায় গিয়ে দেখেছি সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। মণ্ডপে গান বাজছে সত্য তবে একটিও বাংলা গান নয়। সমস্তই ছায়াছবির ধুম ধাড়াক্কা হিন্দি গান। যুগের ব্যবধানে পশ্চিম বাংলার বাঙালিদের পাল্টে গেছে সাংস্কৃতিক মান ও রুচি। ক্রমেই এখন সেটা ভয়ানক পর্যায়ে। বরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় জীবদ্দশায় বলেছিলেন, ‘বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির লালন-পালন কলকাতাকেন্দ্রিক থাকবে না। সেটা বাংলাদেশকেন্দ্রিক হয়ে যাবে।’ তার বলা কথা এখন বাস্তবে পরিণত।
হিন্দির বহুমাত্রিক আগ্রাসনে পশ্চিম বাংলা কেবল আক্রান্ত নয় আক্রান্ত ভারতের অপরাপর প্রদেশগুলোও। দক্ষিণ ভারত ছাড়া সারা ভারতে হিন্দির আগ্রাসনে প্রদেশসমূহের ভাষা-সংস্কৃতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। দুঃখজনক হলেও বাংলাদেশেও হিন্দির প্রভাব ক্রমেই বিস্তার লাভ করছে। স্যাটেলাইট টেলিভিশনের কল্যাণে হিন্দি ছবি-সিরিয়ালে আক্রান্ত বাংলাদেশের দর্শক। আমাদের কিশোর বয়সীরা পর্যন্ত ইতিমধ্যে হিন্দি ভাষা রপ্ত করে ফেলেছে। হিন্দি ভারতের সরকারি ভাষা। সে বিবেচনায় পশ্চিম বাংলার বাঙালিদের ওপর হিন্দির প্রভাব থাকবেই। তারা ইচ্ছা করলেই দক্ষিণের মতো হিন্দিকে এখন আর পরিত্যাগ করতে পারবে না। তারা বাঙালি জাতীয়তা পরিত্যাগ করে বহু আগে ভারতীয় জাতীয়তায় নিজেদের সঁপে দিয়েছে। কিন্তু আমরা কেন হিন্দির আগ্রাসনের কাছে আত্মসমর্পণ করে চলেছি? হিন্দি সিরিয়ালে আকৃষ্ট দর্শকরা পরনিন্দা, পরচর্চা, হিংসা-বিদ্বেষ, কুটিলতা, শঠতার কুশিক্ষায় পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনকে কলুষিত করছে না? সমাজে নেতির প্রভাব দ্রুত বিস্তার লাভ কি করছে না? আমরাও সেই ঘৃণিত ব্যাধিমুক্ত কোথায়? একদিকে হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতির আগ্রাসন। অপর দিকে ধর্মীয় জাতীয়তা ও সংস্কৃতির প্রভাব আমাদের জাতীয় জীবনকে শঙ্কার মুখে ফেলেছে। এর থেকে মুক্ত হতে না পারলে আমাদেরও পশ্চিম বাংলার পরিণতি ভোগ করতে হবে। তাই অনতিবিলম্বে সচেতনভাবে এই আপদ-বিপদ দুটো থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হবে। নয়তো ভয়ানক বিপদের মুখে পড়তে হবে, সেটা যেন ভুলে না যাই।
লেখকঃ নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত