সরকারি মালিকানাধীন বিদ্যুৎ সরবরাহ কোম্পানি ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) বিরুদ্ধে আবাসিক এলাকার জন্য শিল্প এলাকার মিটার ক্রয় ও মিটারের দামে বড় ধরনের কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। বাজার মূল্যের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি দরে মিটার কিনেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি। এতে সংস্থাটির প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছর ডিপিডিসির কাজের ওপর চালানো মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার (সিএজি) এক নিরীক্ষায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সিএজির তথ্য বলছে, ডিপিডিসির নিজস্ব বাজেটের আওতায় এএমআর বা আরএমআর ফ্যাসিলেটেড মিটার ক্রয়ের জন্য ২০২০ সালের মার্চ মাসে এমএম এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। ওই চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে ১৬ কোটি ৬০ লাখ টাকায় ৮০০টি মিটার কেনে ডিপিডিসি। তবে বিভিন্ন নেটওয়ার্ক অপারেশন ও কাস্টমার সার্ভিস (এনওসিএস) অফিসের ভাউচার পর্যালোচনায় দেখা যায়, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার জন্য ক্রয় করা এসব মিটারের সর্বোচ্চ দাম ৪০ হাজার টাকার হওয়ার কথা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রতিটি মিটারের দাম দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৭ হাজার ৫০৭ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি মিটারের কোম্পানিটির ক্ষতি হয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫০৭ টাকা। সব মিলিয়ে এ ক্ষতির পরিমাণ ১৩ কোটি ৪০ লাখ টাকার বেশি।
সিএজির ভাষ্য, ডিপিডিসির মিটার ক্রয়ে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে। আইন লঙ্ঘন করে এ ধরনের ক্রয় চুক্তি করায় অনিয়মের দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের অনিয়ম না ঘটে, সেজন্য সুপারিশ করেছে সিএজির নিরীক্ষা দল।
এ বিষয়ে জানতে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিরীক্ষার মাধ্যমে এসব অনিয়ম চিহ্নিত করলেই চলবে না, যারা বা যে এ অনিয়মে জড়িত তাদের যথাযথ আইনের আওতায় আনতে হবে। নিরীক্ষায় এসব বিষয় বেরিয়ে এলেও দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় বারবার এ ধরনের অনিয়ম ঘটছে। আর যদি প্রতারণার মাধ্যমে কেউ সুযোগ গ্রহণ করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।
এর আগে ২০১৯ সালে আরেক পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ঢাকা ইলেকট্রনিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকোর) বিরুদ্ধেও মিটার ক্রয়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দাম দেখানোর অভিযোগ উঠেছিল। প্রতিষ্ঠানটি টেন্ডার ছাড়াই কয়েকগুণ বেশি দামে প্রিপেইড মিটার কিনেছিল। সিঙ্গেল ফেজের যে মিটার ২ হাজার ৩৩৭ টাকায় পাওয়া যায়, সেটিই তাড়াহুড়ো করে সরাসরি ৫ হাজার ৫৫০ টাকায় কেনে তারা। আর ৯ হাজার ৬৬০ টাকার থ্রি ফেইজের প্রতিটি মিটার কিনেছিল ২৩ হাজার টাকায়। সরাসরি এমন দুই লাখ মিটার কিনতে সে সময় রাষ্ট্রের নিট ক্ষতি হয় প্রায় ১০৫ কোটি টাকা।
এদিকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে খোলাবাজারে প্রিপেইড মিটার সরবরাহের জন্য বেসরকারি কোম্পানি যমুনা মিটার ইন্ডাস্ট্রিকে অনুমতি দিয়েছে ডিপিডিসি। সে সময় প্রতিটি সিঙ্গেল ফেজ মিটারের দাম ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ৬০০ টাকা। গ্রাহকদের হয়রানি বন্ধ ও সুবিধা নিশ্চিতের জন্য এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি, যাতে খোলাবাজার থেকে গ্রাহকরা মিটার কিনতে পারেন।
সে সময় যমুনা মিটারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম ভূঁইয়া বলেন, ২০২০ সালের মার্চ থেকে তারা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) গ্রাহকদের প্রিপেইড মিটার সরবরাহ করছেন। পিডিবির মিটারগুলোর দাম পড়ছে সাড়ে ৫ হাজার টাকা করে। তখন তিনি জানান, খোলাবাজারে মিটারের দাম বিতরণ কোম্পানিগুলোর টেন্ডারে কেনা মিটারের চেয়ে কম। টেন্ডারে কেনা সিঙ্গেল ফেজ মিটারের দাম ৭০০ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়।