ইউক্রেনে প্রাধান্য বিশ্বকে উপেক্ষা!

বিশ্বে ক্ষমতাশালী ধনী দেশগুলোর বলয় বিস্তারের প্রতিযোগিতায় আধুনিক সময়েও ইউরোপের এক কোণে চলছে দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সম্প্রসারণের শঙ্কায় রাশিয়ার শুরু করা ইউক্রেন যুদ্ধ এখন দুই বছরে গড়াতে চলেছে। উন্নত দেশগুলোর এমন ক্ষমতার দাপট দেখানোর প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বিপদে পড়েছে অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো। আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকার এসব দেশ তাদের চেয়ে বহুদূরের এ যুদ্ধের প্রধান পরোক্ষ ভুক্তভোগী। এ ছাড়া উন্নত দেশগুলোর বিপুল কার্বন নিঃসরণে ঘটা জলবায়ু পরিবর্তনেরও প্রধান শিকার এ দেশগুলোই। অথচ বিশ্ব কূটনীতির সাম্প্রতিক বড় আসরগুলোতে বিশ্বের ৮০ শতাংশ মানুষের দেশগুলোর চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ইউক্রেন। ইতিমধ্যে অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে পৌঁছেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও সুবিধাবঞ্চিত ও জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাতে জর্জরিত দেশগুলোর কণ্ঠ ছাপিয়ে প্রভাবশালীদের পছন্দের ইউক্রেনই প্রাধান্য পাবে এমন শঙ্কা তাই অমূলক বলা যাচ্ছে না।

যদিও এবারের অধিবেশনে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি প্রাধান্য পাবে বলা হচ্ছে, কিন্তু আলোচ্যসূচিতে এর আগে থাকছে পশ্চিমাদের গুরুত্ব দেওয়া ইউক্রেন প্রসঙ্গ। গতকাল মঙ্গলবার শুরু হয় উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক। এবার সাধারণ বিতর্কের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘আস্থা ফেরানো ও বৈশ্বিক সংহতি পুনরুজ্জীবন : সবার শান্তি, সমৃদ্ধি, অগ্রগতি ও স্থিতির জন্য ২০৩০ সালের এজেন্ডা এবং এর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যকে ত্বরান্বিত করা’। গত আগস্টে জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দূত লিন্ডা থমাস গ্রিনফিল্ড সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বেশিরভাগ পশ্চিমা দেশ ইউক্রেন থেকে সেনা প্রত্যাহারে রাশিয়ার ওপর ‘তীব্র চাপ’ প্রয়োগ করবে বলে তিনি আশা করেন। এ ছাড়া চীনকে ঘিরে উদ্বেগ, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়া এবং মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলোও আলোচনায় স্থান পেতে পারে; বিশেষ করে কিছু পর্যবেক্ষক জাতিসংঘে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এ ছাড়া আফ্রিকার সাম্প্রতিক সামরিক অভ্যুত্থানগুলো, বিশেষ করে নাইজারের বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।  লক্ষ করলে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমা প্রভাবিত বিশ্ব আসরের আলোচ্যসূচিতে পেছনেই থেকে যাচ্ছে গ্লোবাল সাউথ, অর্থাৎ বিশে^র অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ, জলবায়ু বিপদ মোকাবিলার তহবিলসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো।

কয়েক দিন আগে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৮তম আসরে গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ উপেক্ষিতই থাকছে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। গার্ডিয়ানের ওই প্রতিবেদনে মোটাদাগে গ্লোবাল সাউথের মানুষের মনোভাব উঠে এসেছে। তাতে বলা হয়, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অনেক দরিদ্র দেশ মনে করে, গত বছর তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকগুলো উপেক্ষিত ছিল। এবারও আশঙ্কা রয়েছে ইউক্রেনই প্রধান মনোযোগ কেড়ে নিতে পারে।

গার্ডিয়ান বলছে, ২০১৫ সালে দারিদ্র্য ও অনাহার হ্রাস, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার সর্বজনীন বিধানসহ ১৭টি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) নির্ধারণ করেছিল জাতিসংঘ, ২০৩০ সালের মধ্যে সদস্যদেশগুলোর এ লক্ষ্যমাত্রা সন্তোষজনকভাবে পূরণ করার কথা। নির্ধারিত সময়ের প্রায় অর্ধেক পার হওয়ার পর দেশগুলো মিলিত হচ্ছে এবারের সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে। অথচ এই লক্ষ্য অর্জনে বিশে^র অগ্রগতি মাত্র ১২ শতাংশ। ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করতে পারে। প্রায় ১০ কোটি শিশু স্কুলে যাবে না। কিছু ক্ষেত্রে যে উন্নতি হয়েছিল তা পিছিয়ে গেছে। আশা করা হয়েছিল এবারের অধিবেশনে এসবই প্রাধান্য পাবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা কেবল ইউক্রেনে জোর দিলে বিশে^র জন্য গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা উপেক্ষিত থেকে যাবে।

তবে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের দূত আত্মপক্ষ সমর্থন করে অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রতিদ্বন্দ্বীরা’ এসডিজিএসের প্রতি ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভুল ধারণা ছড়াচ্ছে। গত শুক্রবার কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সকে গ্রিনফিল্ড বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বীরা চায় যুক্তরাষ্ট্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ব্যবধান তৈরি করতে। কারণ, তারা চায় উন্নয়নশীল দেশগুলো মনে করুক যে যুক্তরাষ্ট্র শুধু বড় শক্তির লড়াইয়ের প্রতি মনোযোগী। কারণ, তারা তুলে ধরতে চায় যুক্তরাষ্ট্র এসডিজিএস নিয়ে শুধু মুখেই কথা বলে।