অবশেষে রেলের চাকরি ফিরে পেলেন সেই জিবরান

অবশেষে বাংলাদেশ রেলওয়েতে চাকরি ফিরে পেয়েছেন জিবরান সওদাগর। আজ বুধবার বাংলাদেশ রেলওয়ে মহাপরিচালকের কার্যালয়ের পার্সোনেল-৩ শাখার উপপরিচালক পলাশ কুমার সাহার সই করা চিঠিতে তাকে বাংলাদেশ রেলওয়ের ফিটার গ্রেড–২ পদে যোগ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, শারমিন আক্তার ঝিনুককে মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী কাজে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হলো। তাঁর কর্মস্থলে অনুপস্থিতকালের বিষয়ে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জিবরান সওদাগর দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি কতটা খুশি হয়েছি বলে বোঝাতে পারবো না। এই খারাপ সময়ে যারা আমার পাশে ছিলেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

এর আগে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরের অনলাইনে, 'ভালোবাসার মানুষকে পেতে নারী থেকে পুরুষ, তারপর জীবন অনেক যন্ত্রণার' শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যেখানে জীবরানের জীবনের দীর্ঘ গল্প ও রেলওয়েতে যোগদান করতে না পারার বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।

নারী ক্রিকেটার হিসেবে খেলেছেন ন্যাশনাল লীগে। বেশ কিছু সাফল্যও পেয়েছেন, অর্জন করেছেন ম্যাচ সেরাসহ নানা পুরস্কার। এরপর তার জীবনে আসে সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত। ভালোবাসার মানুষকে আপন করে পেতে শরীর বদলিয়ে (লিঙ্গ পরিবর্তন করে) নারী থেকে পুরুষ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।২০২১ সালে ভারতে যান চিকিৎসার জন্য। যদিও সেই চিকিৎসা পদ্ধতি খুব কঠিন আর ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তারপর চিকিৎসা শেষে নারী থেকে পুরুষ হয়ে দেশে ফেরেন।

বলছিলাম ট্রান্সজেন্ডার শারমিন আক্তার ঝিনুকের কথা, যিনি বর্তমানে জিবরান সওদাগর নামে পরিচিত।

জিবরানের বাড়ি চট্রগ্রামে। তার বাবা রফিকুল ইসলাম একজন মুক্তিযুদ্ধা ছিলেন। জিবরানরা ৪ বোন ও দুই ভাই। ছোটবেলা থেকে জিবরান মেয়ে হিসেবে বড় হন। কিন্ত বয়স বাড়ার সাথে সাথে তিনি উপলব্ধি করেন ছেলেদের চেয়ে তার আগ্রহ মেয়েদের প্রতি। এমনকি তিনি স্কুলে মেয়েদের পোশাক পরে গেলেও তার ছেলেদের সাথে মিশতে ভালো লাগত, তাদের মতো বাইরে আড্ডা দেওয়া, খেলাধুলা করা ও শার্ট জিন্স পরতে তার ভালো লাগত। ঘুরে বেড়াতেন মোটরসাইকেল চালিয়ে।

একটা মেয়ের সাথে তার চার বছরের সম্পর্ক থাকলেও তাকে আপন করে পাননি। এরপর ঝিনুকের পরিচয় হয় আরও এক মেয়ের সাথে। এক সময় উভয় পরিবার তাদের সম্পর্কের কথা জেনে যায়। সেই মেয়ের বাবা একদিন ডেকে বলেন, কোন মেয়ের কাছে আমি আমার মেয়েকে বিয়ে দিতে পারি না। তুমি ছেলে হলে আমি দাঁড়িয়ে থেকে আমার মেয়েকে তোমার সাথে বিয়ে দেব। এরপর তিনি চিকিৎসা শুরু করেন। ভারতে অস্ত্রোপচার শেষে দেশে ফিরে জানতে পারেন, মেয়েটি আর তাকে চাচ্ছে না।

বিরহ কাটিয়ে ওঠার আগেই তাকে নামতে হয় চাকরি বাঁচানোর লড়াইয়ে। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় শারমিন আক্তার ঝিনুক নামে রেলওয়েতে ২০১২ সালে ট্রেড অ্যাপ্রেনটিস মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি পেয়েছিলেন। প্রথমে তার কর্মস্থল ছিল চট্রগ্রামে এরপর সেখান থেকে বদলি হয়ে যান সৈয়দপুর। কিন্ত এরপর তিনি পুরুষ হয়ে যান। ফলে নারী পরিচয়ে আর চাকরীর কোন সুযোগ ছিল না। তিনি যে নারী থেকে পুরুষ হয়েছেন তার প্রমাণ দিয়ে চাকরিতে যোগদান করতে বলা হয় জিবরান সওদাগরকে।

২০২১-২৩ মাঝখানের এই সময়ে চাকরি ফিরে পেতে দীর্ঘ লড়াইয়ে নামতে হয় জিবরানকে। কতটা কঠিন ছিল সেই লড়াই এমন প্রশ্নের জবাবে জিবরান সওদাগর দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত দেড় বছর রেল ভবনে আমার ফাইল ঘুরেছে। এই টেবিল থেকে সেই টেবিলে ঘুরতে হয়েছে আমাকেও। সমাজের উচ্চ শিক্ষিত মানুষরাও আমার কষ্ট বুঝেননি। একপর্যায়ে আমার নারী থেকে পুরুষ হওয়ার প্রমাণ দিতে বলেন তারা। সেই প্রমাণ চাইতে গিয়ে রেলওয়ে থেকে গঠন করা হয় মেডিক্যাল বোর্ড।

জিবরান বলেন, সমস্ত কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর ভেবেছিলাম আমার দৌড়াদৌড়ির অবসান হবে। নিশ্চিন্তে চাকরিতে যোগ দিতে পারবো, কিন্ত না হল তার উল্টো। তারা কোন সিদ্ধান্ত দেননি। অনুমতি দেওয়া হয়নি আমার চাকরীতে যোগদানের। উল্টো পুনরায় মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করতে তৎপর হন তারা।

জানা যায়, জিবরান লিঙ্গ পরিবর্তন করে নারী থেকে পুরুষ হওয়ার ইচ্ছে নিয়ে ২০২০ সাল থেকে দেশে চিকিৎসা শুরু করেন। তার যে সমস্যা ডাক্তাররা তার রোগের নাম জানান, জেন্ডার ডেসফোরিয়া। এ ক্ষেত্রে মেয়েদের আচরণ হয় ছেলেদের মতো আর ছেলেদের আচরণ হয় মেয়েদের মতো। এরপর ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ভারতে চিকিৎসার জন্য যান। সেখানে ইনডোরের জেনিথ ক্লিনিকে ব্রেস্ট ও জরায়ু রিমুভ সার্জারি হয়। এরপর আরেকটি অপারেশন একই ক্লিনিকে হয় একই বছরের আগস্টে।

তার অসুস্থতা ও চিকিৎসাজনিত কারণে ২০২০ সালের ২৮ নভেম্বর থেকে ২০২২ সালের ২০২২ সালের ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। এ নিয়ে তিনি ১৭ এপ্রিল কাজে যোগদানের অনুমতি চেয়ে রেলওয়ের মহাপরিচালক বরাবর আবেদন করেন। কিন্ত নানা কারণে তাকে কাজে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এরপর রেলওয়ের পক্ষ থেকে তার লিঙ্গ পরিবর্তনের বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখার জন্য একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়। সেই মেডিক্যাল বোর্ড ২০২২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তাকে ছেলে হিসেবে ফিট ঘোষণা করে। কিন্ত এরপরও তাকে কাজে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে চলতি বছরের ১০ এপ্রিল রেলওয়ের পক্ষ থেকে আরও একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়। এই মেডিক্যাল বোর্ড ও তাকে ফিট বলে ঘোষণা দিলেও তাকে কাজে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।

মুখে কষ্টের ছাপ আর খানিকটা হতাশা নিয়ে জিবরান বলেন, তাদের খুব কিউরিওসিটি একজন ট্রান্সজেন্ডার পুরুষের শরীরে কি কি আছে সেটা দেখার। অফিসের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা আমাকে দেখে প্রশ্ন করেন, তুই চ্যাংড়ি থেকে চ্যাংড়া হইলি কেমনে?

জানা যায়, এরপর জিবরান বিভিন্ন সময় রেল ভবনের একাধিক কর্তার টেবিলে দৌড়াদৌড়ি করেও কোন ফলাফল পাননি। তাকে ঢাকা-সৈয়দপুর-রাজশাহী-ঢাকা দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। একপর্যায়ে গিয়ে জানতে পারেন, ট্রান্সজেন্ডারদের সমস্যা নিয়ে কাজ করেন (ট্রান্সজেন্ডার) অধিকারকর্মী হো চি মিন ইসলাম।

এ প্রসঙ্গে হো চি মিন ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার কাছে এসে জিবরান সব খুলে বলেন। বিস্তারিত ঘটনা জানার পর সিদ্ধান্ত নিলাম যেভাবেই হোক জিবরানের চাকরি ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে সহযোগিতা করব। যতটা সহজ ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক কষ্টসাধ্য ছিল এ লড়াই। রেলের মহাপরিচালক পশ্চিমাঞ্চল, যুগ্ম পরিচালক থেকে শুরু করে, উপ সচিব সকলের কাছে ফোন দিলাম। কিন্ত কেউই সঠিক সমাধান বলছেন না। ফাইলটা কোথায় আছে সেটাও জানাননি। একেকজন ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়ে আমাদের আরও ঘুরাতে শুরু করলেন। এ ঘোরার যেন কোন শেষ নেই।

হো চি মিন বলেন, একপর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। অবাক হয়ে দেখি, যার কাছেই যাই তিনিই মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন। যার কাছে যাই তিনিই আরেকজনকে দেখিয়ে বলেন, আমার কাছে নয় তার কাছে যান সমাধান পাবেন। যথারীতি তার কাছে গেলে তিনি আবার আরেকজনকে দেখিয়ে বলেন, আমাকে নয় তাকে বলুন।

এরপর হো চি মিন যোগাযোগ করেন রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. কামরুল আহসানের সাথে। সাক্ষাতের অনুমতি চাইলে, তিনি সময় দিলেন। রেল ভবনে মহাপরিচালকের সাথে যখন হো চি মিন দেখা করতে যান, তখন রাজ্যের দুশ্চিন্তা নিয়ে রেল ভবনের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন জিবরান সওদাগর। তারপর মহাপরিচালকের কক্ষে প্রবেশ করেন হো চি মিন। জানতে পারেন কামরুল আহসান তখন অন্য একটা মিটিংয়ে ব্যস্ত।

এরপর রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. কামরুল আহসানের সাথে দেখা করে বিস্তারিত ঘটনা খুলে বললে, তিনি আশ্বাস দিয়েছেন জিবরানের নিয়োগের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার।