শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে শিক্ষাব্যবস্থায়

‘শিক্ষাই সব শক্তির মূল’ দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকনের বাণীটি আমাদের প্রায় সবারই জানা। প্রবাদ বাক্যটি চারশো বছর পরেও সমান প্রাসঙ্গিক, একই মূল্য বহন করে। শিক্ষা ছাড়া কোনো ধরনের অগ্রগতি কল্পনাও করা যায় না। ফলে শিক্ষাকে আখ্যায়িত করা হয়, একটি জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে। সরকার শিক্ষার প্রসারে ব্যাপক গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেছে নানা কার্যকরী পদক্ষেপ। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য প্রশংসার দাবি রাখে। শিক্ষার উন্নয়ন কিংবা শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ আলোচনায় নজর দিতে হয়, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন সূচকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে। যেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এগিয়েছে। আগের তুলনায় বাংলাদেশের সূচকের মূল্যমান বেড়েছে দশমিক ০০০৬। ইউএনডিপির প্রকাশ করা ‘মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২১-২২’-এ এই চিত্র উঠে এসেছে। সর্বশেষ সূচকে বাংলাদেশ অবস্থান ১২৯।

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছাতে যেসব সূচক অর্জন করতে হয়, তার প্রত্যেকটি সূচকেই ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা বা সংকট এ তিন সূচকের ওপর ভর করেই উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশ করতে হয়। আর এ কারণেই আমরা দেখতে পাই, আফ্রিকাসহ অনগ্রসর দেশগুলো যখন শিক্ষায় ছেলেমেয়ের সমতা অর্জনে হিমশিম খাচ্ছে, তখন বাংলাদেশ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক দুই স্তরেই সেই সমতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও ছাত্রদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে ক্রমাগত। শিক্ষায় দৃশ্যমান সাফল্য বাংলাদেশ সরকারের একটি বড় অর্জন। এই অনন্য অর্জন এখন দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।

শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশ উন্নয়নের এক রোল মডেল। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ৮টি লক্ষ্যের মধ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। শিক্ষাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্র্তৃক গৃহীত পদক্ষেপসমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, শতভাগ ছাত্রছাত্রীর মধ্যে বিনামূল্যে বই বিতরণ কার্যক্রম। নারীশিক্ষাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত চালু করা হয়েছে উপবৃত্তি ব্যবস্থা। প্রতি বছর কোটি কোটি পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হচ্ছে, যা পৃথিবীতে নজিরবিহীন। এখন শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে বহুলাংশে। বাড়ছে উপস্থিতি। ঝরে পড়ার হার কমে গেছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সব ধরনের কাজ অনলাইনে ঘরে বসেই সম্ভব হচ্ছে। ভর্তি, রেজিস্ট্রেশন, পরীক্ষা ফি, পরীক্ষার ফল হয়ে যাচ্ছে অনলাইনে। এতে জনগণের আর্থিক অপচয় ও ভোগান্তি, দুর্নীতি কমেছে। উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গড়তে জনগোষ্ঠীকে প্রযুক্তিনির্ভর কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর নিমিত্ত আধুনিক সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। পুরো ব্যবস্থাটিকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনার লক্ষ্যে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও সহজ ও আধুনিকায়ন করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইসিটি ল্যাব চালু হচ্ছে। কম্পিউটার কোর্সকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বর্তমান সরকারের শাসনামলে দেশের শিক্ষার বহুমাত্রিক সাফল্য অস্বীকার করা যাবে না। তবে যে কোনো বিষয়ের মতোই, শিক্ষা নিয়েও সমালোচনা থাকতে পারে। এক্ষেত্রে বাস্তব প্রেক্ষাপটকেও বিবেচনায় নিতে হবে। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় মানবিক, নৈতিক, তথ্যপ্রযুক্তি-নির্ভর যুক্তিবাদী ও দেশপ্রেমে আলোকিত নাগরিক হিসেবে একজন শিক্ষার্থীকে গড়ে তোলার মহৎ লক্ষ্যে একটি কার্যকর, আধুনিক, বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা চালুর কোনো বিকল্প নেই। আর সেই চেষ্টাটাই দৃশ্যমান হয় সরকারের নানাবিধ কর্মকাণ্ডে। একটি পরিকল্পিত নীতির আওতায় লক্ষ্য স্থির করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ থেকে এমপিওভুক্তি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, কারিকুলাম যুগোপযোগী করা, কারিগরি ও নারীশিক্ষা জনপ্রিয় করে তোলা, অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন এবং সর্বোপরি শিক্ষাসেবায় আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সংযোজনের মতো নির্ধারক পদক্ষেপগুলো ব্যবস্থাপনা কাঠামোয় ইতিবাচক রূপান্তর এনে দিয়েছে। সব সংকটকে পাশ কাটিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও প্রয়োজনমুখী ধাঁচে গড়ে তোলার চেষ্টায় সরকারের যে গভীর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সক্রিয়তা দৃশ্যমান, এ নিয়ে দ্বিমত পোষণ করার খুব একটা কারণ খুঁজে পাই না।

মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকার যুগোপযোগী নানাবিধ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে। ভিত্তি যদি শিক্ষা হয়, তাহলে উন্নয়নের সড়কে সাফল্য আসাটাই স্বাভাবিক। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক কিংবা উচ্চতর স্তরের শিক্ষা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও মেধার পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য, শুধু শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত করলেই হবে না। এর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে আমাদের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক- সাংস্কৃতিক বিষয়েরও। এসব বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান সরকার নিরন্তর চেষ্টা করছে শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি আধুনিক কাঠামো দেওয়ার। ফলে সময়ের চাহিদাকে গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় সংস্কারও করতে সরকার সচেষ্ট বলেই নতুন করে শিক্ষাক্রম আধুনিকতার ছকে সাজানো হয়েছে। যেখানে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির পাশাপাশি মানবিক ও সংস্কৃতিচেতনায় ঋদ্ধ সমাজ গড়ে তোলার দর্শন দৃশ্যমান। আর এ জন্য দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার আন্তরিক সহযোগিতামূলক সক্রিয় মানসিকতা দরকার। মনে রাখতে হবে, এটা কোনো রাজনৈতিক সমস্যা নয়। সুতরাং কোনো সমস্যা থাকলে, সামষ্টিকভাবে তার সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি শুধু সমস্যা চাই নাকি তার শৈল্পিক সমাধান খুঁজে বের করতে চাই? আমি মনে করি, শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে তেমন কোনো অস্থিরতা নেই। যদি অস্থিরতা থেকেই থাকে, তাহলে সেটা আমাদের মধ্যে। যার প্রকাশ ঘটে অন্যত্র। পৃথিবীর আদিকাল থেকে বৈষম্য ছিল, থাকবে। তবে তা যেন হয় সহনশীল।

প্রতিযোগিতার এ বিশ্বে সবাই সামনে এগিয়ে যেতে চায়, সফল হতে চায়। কথায় আছে সাফল্যের কোনো শর্টকাট রাস্তা নেই। তাই জীবনে সফল হতে হলে জীবনের প্রারম্ভিক সময় থেকেই শক্ত হয়ে নামতে হবে জীবনযুদ্ধে। এ সময়টাতে প্রতিটা শিক্ষার্থীর মধ্যে এ উপলব্ধিটা না এলেও তার অভিভাবক যদি সঠিক গাইডলাইন দিয়ে তার সন্তানকে এগিয়ে নিতে পারেন, তবে তার জীবনে সাফল্য আসবেই। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষার সব স্তরেই সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়মাবলি মেনে চললে সাফল্যের পথে অনেকদূর এগিয়ে যাওয়া যায়।

রাষ্ট্রের অনেক ইতিবাচক যুগোপযোগী নীতি, নির্দেশনা, প্রজ্ঞাপন বা আইন বিশেষ করে শিক্ষার্থীর আচরণের স্থায়ী পরিবর্তনে সহায়ক যৌক্তিক ও মানবিক সৃজনীসত্তা বিকাশে সহায়ক কর্মকাণ্ডে অংশীদারত্ব বা সক্রিয়তার বিষয়ে অনেকেই প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না। সেই ব্যর্থতার দায় সরকার বা রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আমাদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের ভূমিকাকেও আলোচনায় আরও বেশি করে আনতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, নগর পুড়লে দেবালয় যেমন রক্ষা পায় না, তেমনি সমাজদেহের বিভিন্ন অংশে পচন ধরলে শিক্ষাও তা থেকে নিরাপদ থাকে না। সুতরাং সামাজিক জীব হিসেবে আমরা আমাদের কোনো দায়ই এড়াতে পারি না, বিশেষত রাষ্ট্র বা সরকারের ওপর চাপিয়ে দিয়ে। কারণ রাষ্ট্র কিংবা সরকার আমি, আপনি, আমরাই। আমাদের সামগ্রিক উন্নয়ন আসলে আমাদেরই সমন্বিত প্রচেষ্টা ফল।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক ভাসানটেক সরকারি কলেজ

mohon.abdullahal@gmail.com