শরিয়াহ আইনের পক্ষে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মানুষ

নতুন গবেষণা বলছে, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম শরিয়াহ আইনকে দেশের রাষ্ট্রীয় আইন করার পক্ষে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মালয়েশিয়ার ৮৬ ভাগ মুসলিম শরিয়াহকে জাতীয় আইন হিসেবে দেখতে চায়। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ান মুসলিমদের ৬৪ ভাগ বলেছেন, শরিয়াহকে দেশের আইন হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।

২০২২ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে করা সমীক্ষাটিতে আরও দেখা গেছে, উভয় দেশের প্রায় সব মুসলমানই বলছেন, সত্যিকারের ইন্দোনেশিয়ান বা মালয়েশিয়ান হওয়া গুরুত্বপূর্ণ!

উভয় দেশের মুসলমানরা সাধারণত ইসলামকে একটি সংস্কৃতি, পারিবারিক ঐতিহ্য বা জাতিসত্তা হিসেবে দেখে। শুধু একটি ধর্ম (যা কেউ ইচ্ছেমতো অনুসরণ করে) দেখতে রাজি নয়।

মালয়েশিয়ার মুসলিমরা আলেমদের রাজনীতিতে প্রবেশের পক্ষে ছিলেন। ইন্দোনেশিয়ায় এই জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় অর্ধেকই এই মত গ্রহণ করেছে।

ইন্দোনেশিয়ান মুসলিমদের ৫৮ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ান মুসলিমদের ৬৯ শতাংশ বলেছে, আলেমদের উচিত তাদের পছন্দের রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলগুলো সম্পর্কে প্রকাশ্যে কথা বলা। ইন্দোনেশিয়ার ৯২ শতাংশ মুসলমান বলেছে, ইসলাম ত্যাগ করা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।

মালয়েশিয়ায় একটি দ্বৈত আইনি ব্যবস্থা প্রচলিত, যা সেক্যুলার এবং ইসলাম, উভয় আইনি ব্যবস্থাকেই অন্তর্ভুক্ত করে। এর ধর্মনিরপেক্ষ আইনি ব্যবস্থা ব্রিটিশদের রচিত আইনের ওপর ভিত্তি করে মালয়েশিয়ার মুসলিম-অমুসলিম সব নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য। এটি দেওয়ানি, ফৌজদারি এবং বাণিজ্যিক আইনে অনুসরণ করা হয়।

সেক্যুলার আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় ইসলামি আইনের ওপর ভিত্তি করে একটি (তুলনামূলক শিথিল) ইসলামি আইনি ব্যবস্থাও রয়েছে। এই আইনি ব্যবস্থাটি প্রাথমিকভাবে মুসলমানদের ব্যক্তিগত অবস্থা, পারিবারিক আইন এবং ধর্মীয় রীতিনীতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মালয়েশিয়ার ১৩টি রাজ্যের প্রত্যেকটির নিজস্ব ইসলামিক আইনি কাঠামো রয়েছে। এই আইন-ব্যবস্থার প্রয়োগ রাজ্য থেকে রাজ্যে পরিবর্তিত হতে পারে!

মালয়েশিয়ার কিছু রাজ্য ইসলামি ফৌজদারি আইনও প্রয়োগ করেছে, যা মুসলমানদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। চুরি, ব্যভিচার এবং মদ্যপানের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। যদিও এই শাস্তির মাত্রা ও প্রয়োগ রাজ্যগুলোতে পরিবর্তিত হতে পারে!

এদিকে ইন্দোনেশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র, যার সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলছে! রাষ্ট্রীয় আদর্শ, ঐক্য ও বৈচিত্র্যের প্রচার করে এবং এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র এবং ‘ধর্মীয় স্বাধীনতাকে (কাগজে-কলমে) সমর্থন করে।

ইন্দোনেশিয়ার কিছু অঞ্চল রয়েছে, যা ‘বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল’ নামে পরিচিত। এসব এলাকায় ইসলামি আইন বিভিন্ন মাত্রায় প্রয়োগ করা হয়। এই অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে আচেহ, যেখানে শরিয়াহ আইনের সবচেয়ে ‘ব্যাপক প্রয়োগ’ রয়েছে। পশ্চিম জাভা, দক্ষিণ সুলাওয়েসি এবং অন্যান্য প্রদেশের মতো বেশ কয়েকটি রাজ্য ও পৌরসভা রয়েছে।

আচেহ ইন্দোনেশিয়ার একমাত্র প্রদেশ যাকে শরিয়াহ আইন আরও ‘ব্যাপকভাবে’ বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছে। এটি ড্রেস কোড, নৈতিকতা এবং ফৌজদারি আইনসহ দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে প্রযোজ্য হয়। শাস্তির মধ্যে কিছু অপরাধের জন্য বেত্রাঘাত অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

ইন্দোনেশিয়ার অন্য কয়েকটি অঞ্চলে ইসলামি আইনের কিছু দিক বাস্তবায়িত হতে পারে। যেমন ইসলামি পোশাক, ধর্মীয় পালন বা নৈতিকতা সম্পর্কিত বিধিবিধান। অবশ্য প্রয়োগের ব্যাপ্তি এবং প্রকৃতি বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হতে পারে! অনেক ক্ষেত্রেই ধর্মনিরপেক্ষ আইন প্রচলিত রয়েছে।

ফলাফল হিসেবে বোঝা যাচ্ছে, দুদেশেই ইসলামের প্রভাব বাড়ছে।

আগস্টে মালয়েশিয়ার রাজ্য নির্বাচনে দেখা গেছে, ইসলামি দল ছয়টি রাজ্যের মধ্যে তিনটিতে নিজেদের অবস্থান মজবুত করেছে। এ ছাড়া দেশটির সবচেয়ে ধনী রাজ্য সেলাঙ্গরে আরও বেশি আসন পেয়েছে।

সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া একটি ফৌজদারি আইন প্রণয়ন করেছে, যেখানে বিবাহবহির্ভূত যৌনসম্পর্ক স্থাপনকারী ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যাকে রাষ্ট্রীয় প্রচলিত আইনের চেয়ে ইসলামি আইনের তুলনামূলক মজবুত অবস্থানের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে।