একজন আদর্শবান দূরদর্শী শিক্ষকের প্রতিচ্ছবি

যুগে যুগে দুনিয়ায় এমন কিছু মানুষের জন্ম হয়, যারা তাদের কর্ম, নীতি ও আদর্শের কারণে স্মরণীয়-বরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। এমনই একজন ব্যক্তি হলেন শায়খুল হাদিস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক। যুগ সচেতন আলেম, লেখক, প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও শিক্ষক। তার আরও অনেক পরিচয় রয়েছে। সেসব ছাপিয়ে আদর্শ শিক্ষক হিসেবে তিনি ঠাঁই করে নিয়েছেন। এ মনীষীর বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে লিখেছেন মোস্তফা ওয়াদুদ

তিনি প্রায় অর্ধশতাধিক মাদ্রাসার মুরুব্বি। রাজধানীর জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা, জামিয়া সুবহানিয়া তুরাগ ও জামিয়াতুন নুর আল কাসেমিয়ার শায়খুল হাদিস। শতাব্দী প্রাচীন রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সিনিয়র সহসভাপতি। আলেম-উলামাদের আস্থার প্রতীক। দেশজুড়ে রয়েছে তার অসংখ্য ছাত্র ও ভক্ত-অনুরক্ত।

মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ১৯৪৭ সালের ৯ আগস্ট সিলেট জেলার কানাইঘাট থানার আকুনি গ্রামের প্রভাবশালী শিকদার বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা শায়খুল হাদিস ওয়াত তাফসির আল্লামা শফিকুল হক আকুনি (রহ.)। দাদার নাম মাওলানা ইবরাহীম আলী (রহ.)। নয় ভাইবোনের সংসারে মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক সবার বড়।

আল্লামা শফিকুল হক আকুনি (রহ.) প্রতিষ্ঠিত নিজ গ্রামের মাজাহিরুল উলুম আকুনি মাদ্রাসায় মক্তব থেকে মেশকাত পর্যন্ত পড়াশোনা করেন তিনি। শৈশব থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী এবং লেখাপড়ায় খুব মনোযোগী ছিলেন। এরপর চট্টগ্রামের হাটহাজারি মাদ্রাসা থেকে ১৯৬৯ সালে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। দাওরায়ে হাদিস পাস করে এক বছর তাবলিগে কাটান। দাওয়াত ও ইমানের মেহনতকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে যুবক বয়সে অশেষ পরিশ্রম করেন। এরপর যোগ দেন শিক্ষকতায়। এ সময় তিনি সিলেটের ফাতেহপুর মাদ্রাসায় ১৯৭২ সালে ও ভারতের আসাম প্রদেশের নোয়াগাং মাদ্রাসায় ১৯৭৩ সালে শিক্ষকতা করেন। শিক্ষকতা করলেও, মনে আকাক্সক্ষা ছিল দারুল উলুম দেওবন্দে গিয়ে আরও পড়াশোনার। ফলে শিক্ষকতায় সাময়িক বিরতি দিয়ে বিশ্বখ্যাত ইসলামি বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দে গমন করেন মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক। দুই বছর তিনি (১৯৭৪-৭৫) দেওবন্দে পড়াশোনা করেন।

কর্মজীবনে অসংখ্য অবদান আছে তার। মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক দেওবন্দ থেকে দেশে ফিরেন ১৯৭৫ সালে। এরপর ১৯৭৭ সনে পবিত্র হজব্রত পালনে সৌদি আরব গমন করেন। ১৯৭৮ সালে ঢাকার ফরিদাবাদ মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। এ সময় দেশসেরা শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেন তিনি। ওই সময়ই প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড ‘বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ।’ শুরুতে বেফাকের পরীক্ষার প্রশ্ন হাতে লিখে তৈরি করা হতো। মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ছিলেন প্রশ্ন সম্পাদনা কমিটির অন্যতম সদস্য।

ফরিদাবাদ মাদ্রাসায় ৬ বছর শিক্ষকতার পর ১৯৮৪-৮৭ সাল পর্যন্ত জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগে শিক্ষকতা করেন। পরে নিজ গ্রাম আকুনিতে পিতা কর্র্তৃক প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত। এরপর তার একান্ত হিতাকাক্সক্ষী আল্লামা নুর হোসাইন কাসেমি (রহ.)-এর আহ্বানে জামিয়া মাদানিয়া বারিধারায় শায়খুল হাদিস (শায়খে সানি) পদে যোগ দেন। জামিয়া বারিধারা ও জামিয়া সুবহানিয়ার প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমি (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর থেকে এই দুই প্রতিষ্ঠানে প্রধান শায়খুল হাদিসের পদ অলঙ্কিত করে আছেন খ্যাতনামা এ আলেম।

অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে শিক্ষকতা করা এই আলেমের হাজার হাজার শিক্ষার্থী হাদিস পড়েছেন। যারা দেশের আনাচে-কানাচে দ্বীনি ইলমের তালিম দিয়ে বেড়াচ্ছেন। মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদ সম্পর্কে বিস্তৃত এবং গভীর পড়াশোনা করে এ বিষয়ে জাতিকে সতর্ক করার কাজে পথিকৃতের ভূমিকায় আছেন। তিনি নিয়মিত ক্লাসে ছাত্রদের কাছে ও মাঠে-ময়দানে ওয়াজ-মাহফিলে সাধারণ মানুষদের মধ্যে এসব বিষয়ে সতর্কবার্তা তুলে ধরেন। বাতিল মতবাদ থেকে মানুষকে ব্যাপকভাবে সতর্ক করতে তিনি বেশ কিছু পুস্তকও রচনা করেছেন।

মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক হাদিস অস্বীকারের ফেতনার মোকাবিলায় নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীর মর্যাদা হৃদয়গ্রাহী করে উপস্থাপন, শিয়া মতবাদ খণ্ডনের লক্ষ্যে সাহাবিদের ফজিলত ও মর্যাদা বর্ণনা, কাদিয়ানি মতবাদের মোকাবিলায় খতমে নবুওয়তের প্রমাণ ও এর দাবিসমূহ মানুষকে বোঝানো, মাজহাব অস্বীকারকারীদের মোকাবিলায় মাজহাবের ইমামদের মর্যাদা ও উম্মতের প্রতি তাদের অবদানসমূহ এমন হৃদয়গ্রাহী করে উপস্থাপন করেন যার বর্ণনা দেওয়া মুশকিল। ভ্রান্ত মতবাদ ও বিশ্বাসের অসারতা প্রমাণে তার যুক্তি পূর্ণ আলোচনায় মানুষের আকিদা যেমন মজবুত হয়, তেমনি অনেক মানুষ ভ্রান্ত মতবাদ ও বিশ্বাসের পথ ছেড়ে সঠিক পথের সন্ধান পায়।

লেখালেখির জগতে রয়েছে তার সরব পদচারণা। দরসে নেজামিতে যেসব জীবিত লেখকদের কিতাব পড়ানো হয়, তিনি তাদের অন্যতম। তার রচিত অনবদ্য হাদিসের কিতাব ‘খোলাসাতুল আছার’ (চমৎকার বিন্যাসের এ গ্রন্থে তিনি হানাফি মাজহাবের মৌলিক মাসয়ালা সমর্থনের শক্তিশালী হাদিসসমূহ সংকলন করেছেন) অনেক কওমি মাদ্রাসার পাঠ্য কিতাব। যুগ যুগ ধরে এ কিতাব তাকে সর্বমহলে বাঁচিয়ে রাখবে। এ ছাড়া তিনি আকর্ষণীয় ভাষারীতি ও প্রাঞ্জলতার সঙ্গে রচনা করেছেন বেশ কিছু গ্রন্থ। তার মধ্যে-ইসলাম ও মওদুদীবাদের সংঘাত, কোরআন ও হাদিসের আলোকে নামাজ, তাহকিক-তাকলিদ, শিক্ষা পর্যালোচনা, মাকামে সাহাবা, ভূগোল ও ইতিহাস, বিরাজমান সমস্যা কারণ ও প্রতিকার, মওদুদিবাদ ও সাদ সাহেবের আসল রূপ অন্যতম। তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের বিভিন্নবিষয় নিয়ে রচনা করেছেন অসংখ্য পুস্তিকা। লেখনীর পাশাপাশি তার বক্তৃতাও বেশ চমৎকার। তার বক্তব্য যুক্তি তর্ক নির্ভর। যে কাউকে মুগ্ধ করে তার বয়ান। তিনি দেশব্যাপী বিভিন্ন মাদ্রাসায় বোখারি শরিফের উদ্বোধনী ও সমাপনী সবক পড়ান। এ ছাড়া সারাদেশের তওহিদি জনতার মধ্যে হেদায়েতি বয়ানের মাধ্যমে দ্বীনের দাওয়াত প্রচার করেন।

মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক পারিবারিকভাবে বেশ সম্ভ্রান্ত। ১৯৮০ সালে মাস্টার ফজলুল হকের কনিষ্ঠ কন্যার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক। দুই ছেলেই আলেম দ্বীনি খেদমতে নিয়োজিত।

মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ১৯৬৬ সাল থেকে পাঁচ দশকের অধিককাল অবধি এ দেশের রাজনীতি ও ইসলামি আন্দোলনের এক নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে সর্বমহলে পরিচিতি লাভ করেছেন। বাবার হাত ধরে ছাত্রকাল থেকেই তিনি জমিয়তের সক্রিয় কর্মী। সাংগঠনিকভাবে নানা পদে দায়িত্ব পালন শেষে বর্তমানে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সিনিয়র সহসভাপতি ও কেন্দ্রীয় মজলিশে আমেলার অন্যতম নীতি নির্ধারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বলা হয়, তিনি একজন ইতিহাস সমৃদ্ধ রাজনীতিবিদ। তার বক্তৃতা ও লেখনীর মাধ্যমে এমনটাই ফুটে ওঠে। তিনি জানেন, কীভাবে রাজনীতির মাঠে ইতিহাস স্মরণ করিয়ে রাজনৈতিক ভাষায় বক্তৃতা করতে হয়। কীভাবে, কোন পদ্ধতিতে, কোন ভাষায়, কাকে, কি জবাব দিতে হয়। তিনি স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সবস্থানে বিচরণ করেন। বর্তমানে এমন চতুর্মুখী মেধাবী আলেম খুবই বিরল। তার তুলনা শুধুই তিনি।

মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশি অনেক ছাত্র দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তির সুযোগ লাভ করেন। বর্তমান প্রজন্মের ছাত্রদের ব্যাপকভাবে দেওবন্দের সঙ্গে সরাসরি ও চিন্তা-চেতনায় সম্পর্ক স্থাপনে তার অবদান অনস্বীকার্য। মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ছোটবেলা থেকেই বাবা ও দাদার কারণে আকাবিরদের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পান। জীবনে অনেক বুজুর্গ আলেমের সান্নিধ্য পেয়েছেন। তবে তিনি নিয়মতান্ত্রিকভাবে আধ্যাত্মিক সাধনা শুরু করেন দেওবন্দে অবস্থানকালে ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যিদ আসআদ মাদানি (রহ.)-এর সঙ্গে ইসলাহি সম্পর্ক স্থাপন করে। সাইয়্যিদ আসআদ মাদানি (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর তিনি বায়াত গ্রহণ করেন খলিফায়ে মাদানি শায়খ আবদুল মুমিন (রহ.)-এর হাতে। পরে সদরে জমিয়ত আল্লামা শায়খ আবদুল মুমিন (শায়খে ইমামবাড়ি রহ.) তাকে খেলাফত প্রদান করেন।

মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ইতিহাস, দর্শন এবং ভূগোলের একজন ভালো পাঠক। তার বক্তব্য শোনলেই যে কেউ তা বুঝতে পারে। তিনি এই যোগ্যতা লাভ করেছেন মূলত তার পিতা শায়খুল হাদিস আল্লামা শফিকুল হক আকুনি (রহ.)-এর কাছ থেকে। মাওলানা আকুনি (রহ.)-কে বলা হতো সিলেটের আলেমদের জীবন্ত ইতিহাসের বই। তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন তত দিন আলেমদের সঠিক ইতিহাস লেখার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহে অনেকই তার কাছে যেতেন।

মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক সবসময় দেশ, জাতি, মানুষ ও মানবতা নিয়ে ভাবেন, তাদের উন্নতির কথা চিন্তা করেন। তার চিন্তা-চেতনা স্বচ্ছ। কথায় ও কাজে পরিচ্ছন্ন। তিনি এদেশের ইসলাম ও দেশ প্রিয় জনতার অমূল্য সম্পদ। ইলম, আমল, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, পারিবারিক ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক সাধনায় মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক উজ্জ্বল একটি নাম। তার জ্ঞান ও সান্নিধ্য থেকে উপকৃত হওয়ার অনেকে সুযোগ রয়েছে। আল্লাহতায়ালা তাকে সুস্থতার সঙ্গে নেক হায়াত দান করুন। তার থেকে আরও বেশি বেশি উপকৃত হওয়ার তওফিক দিন।