ভর্তুকির বকেয়া ২২ হাজার কোটি

ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি প্রভৃতি প্রধান প্রধান রাসায়নিক সারে ভর্তুকি দেয় সরকার। এ পর্যন্ত সারের ভর্তুকিতে বকেয়া পড়েছে প্রায় সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকা। দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও একাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরকারের কাছে বকেয়ার এ অর্থ পায়। বকেয়ার অর্থছাড়ে ধীরগতি অর্থ বিভাগের।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) পাওনা ৭ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) পাওনা ৯ হাজার ১৭২ কোটি টাকা এবং বেসরকারি খাতের পাওনা ৫ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা। সারের ভর্তুকির বকেয়া ২২ হাজার ৫৮১ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় বিসিআইসি, বিএডিসি ও বেসরকারি আমদানিকারকদের সার আমদানি, খালাস ও পরিবহনে অসুবিধা হচ্ছে। ডলার সংকট ও ভর্তুকির অর্থ বকেয়া থাকায় সার আমদানিতে বেসরকারি ব্যাংকগুলো অনীহা প্রকাশ করছে। সম্প্রতি সার আমদানির জন্য দুবার দরপত্র ডাকা হলেও একবার কোনো দরদাতা অংশ নেয়নি। আরেকবার মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। অর্থাৎ আশানুরূপ দরদাতা পাওয়া যাচ্ছে না। দ্রুত বকেয়া পরিশোধ করা না হলে পিক সিজনে সার সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।

বিএডিসির চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ সাজ্জাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারের ভর্তুকির বকেয়ার জন্য আমরা একাধিকবার চিঠি দিয়েছি। বকেয়ার অর্থছাড়ের বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন বলে জানানো হয়েছে। বকেয়ার কারণে সারের সরবরাহে সমস্যা হবে না। সামনে পিক সিজন। আমরা চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহের জন্য প্রস্তুত রয়েছি।’

সূত্র জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইউরিয়ার চাহিদা ৩৩ লাখ, টিএসপির চাহিদা ৯ লাখ, ডিএপির চাহিদা ১৯ লাখ এবং এমওপির চাহিদা ১১ লাখ টন। ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়কে পিক সিজন ধরা হয়। এ সময়ের সারের চাহিদা ইউরিয়া ১৪.২৪ লাখ, টিএসপি ৩.৬৬ লাখ, ডিএপি ৭.৭৮ লাখ এবং এমওপি ৩.৯৫ লাখ টন।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্তমানে ইউরিয়ার মজুদ আছে ৭.৭৩ লাখ ও পাইপলাইনে আছে ৪.৫০ লাখ টন। টিএসপির মজুদ ৩.১৬ লাখ টন ও পাইপলাইনে আছে ০.৯০ লাখ টন। ডিএপির মজুদ ৪.৬৯ লাখ এবং পাইপলাইনে আছে ২ লাখ টন। এমওপির বর্তমান মজুদ ৪.০৬ লাখ ও পাইপলাইনে আছে ১.৫০ লাখ টন। পাইপলাইনে থাকা সার অক্টোবরের মধ্যে মজুদের সঙ্গে যুক্ত হবে।

মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, অক্টোবর পর্যন্ত ইউরিয়ার মজুদ হবে ১২.২৩ লাখ এবং নভেম্বর পর্যন্ত সম্ভাব্য চাহিদা ৮.৮২ লাখ টন। অক্টোবরে টিএসপির মজুদ হবে ৪.০৬ লাখ এবং নভেম্বর পর্যন্ত চাহিদা ২.৮৭ লাখ টন। অক্টোবরে ডিএপির মজুদ হবে ৬.৬৯ লাখ এবং নভেম্বর পর্যন্ত চাহিদা ৫.৯০ লাখ টন। অক্টোবরে এমওপির মজুদ হবে ৫.৫৬ লাখ এবং নভেম্বর পর্যন্ত চাহিদা ৩.৩৬ লাখ টন।

বেসরকারি আমদানিকারকরা বলছেন, পাইপলাইনের সার রাখা, আমদানি এবং খালাস মূলত ব্যাংকের আচরণ ও ডলারপ্রাপ্তির ওপর নির্ভরশীল। ভর্তুকির বকেয়া পরিশোধ না হলে সার আমদানি হুমকিতে পড়বে।

চলতি বছরের ১০ এপ্রিলে প্রতি কেজি সারের দাম পাঁচ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বাড়ায় দেশেও বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এখন কৃষকপর্যায়ে প্রতি কেজি ইউরিয়া ২৭, ডিএপি ২১, টিএসপি ২৭ ও এমওপি ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের বর্তমান দাম ৪৮, ডিএপি ৭০, টিএসপি ৫০ আর এমওপি ৬০ টাকা। পাঁচ টাকা দাম বাড়ানোর পরও সরকারকে প্রতি কেজি ইউরিয়ায় ২১, ডিএপিতে ৪৯, টিএসপিতে ২৩ ও এমওপিতে ৪০ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

২০২০-২১ অর্থবছরে সারের ভর্তুকিতে সরকারের লেগেছিল ৭ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। এরপর সারের দাম বিশ্ববাজারে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ায় ২০২১-২২ অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। ২০০৮-০৯ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।

সূত্র জানায়, ইউরিয়া সারের উৎপাদন ও আমদানি বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিএডিসি ও বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা মিলিতভাবে আমদানি করেছে টিএসপি, এমওপি এবং ডিএসপি প্রভৃতি সার। ভর্তুকির অধিকাংশ টাকাই যাচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর খাতে। বাকি টাকা যাচ্ছে বেসরকারি ঠিকাদার ও আমদানিকারকদের পকেটে। ভর্তুকির ৫৫ শতাংশ পায় বিসিআইসি, ১৮ শতাংশ পায় বিএডিসি, ২২ শতাংশ নেন বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা এবং বাকি ৫ শতাংশ যায় কৃষকদের জন্য বিভিন্ন সহায়তা হিসেবে।

কৃষিবিদরা বলছেন, একসময় প্রায় ৬৬ শতাংশ সারের চাহিদা মেটানো হতো অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের মাধ্যমে, এখন মাত্র ২০ শতাংশ চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে। সম্প্রতি একের পর এক সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। বাংলাদেশ ইউরিয়া সার আমদানি করে সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও কাতার থেকে; টিএসপি আমদানি করা হয় মরক্কো ও তিউনিশিয়া থেকে; ডিএপি চীন ও জর্দান থেকে এবং এমওপি রাশিয়া, বেলারুশ ও কানাডা থেকে। বাংলাদেশে যৌথ মালিকানার কারখানা স্থাপন করে সারের সরবরাহ সংকট ও উচ্চমূল্য এড়ানোর সুযোগ রয়েছে।