অন্ধত্ব যাকে দমাতে পারেনি

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির অদম্য মেধাবী দৃষ্টিহীন ক্রিকেটার আরাফাতুল ইসলাম ফয়সাল। দুই আইবিএসএ ওয়ার্ল্ড গেমসে ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেছেন বাংলাদেশের হয়ে। চোখে আলো না থাকায় তার জীবনের গল্পটা একটু ব্যতিক্রম।

যে ক্রিকেট ব্যাটের আঘাতে আরাফাতের চোখের আলো নিভে যায়, সেই ক্রিকেটেই এবার তিনি জয় করলেন বিশ্বমঞ্চ। সম্প্রতি ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত আইবিএসএ ওয়ার্ল্ড গেমস-২০২৩ ক্রিকেট ইভেন্টে দ্বিতীয় রানার্সআপ হয়ে ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করে
বাংলাদেশ ব্লাইন্ড ক্রিকেট দল। মেধা ও বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে বলের শব্দ বুঝেই ক্রিকেট ব্যাট চালিয়ে মারেন চার-ছক্কাও। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত আরাফাতের বাড়ী ফটিকছড়ি উপজেলার জাফতনগর গ্রামে।

২০১১ সালের ২৮ মে ফটিকছড়ির জাফতনগর লতিফ রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলার সময় দ্রুতগতির বল এসে চোখে লাগলে মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার দুই চোখের রেটিনা। ভারতসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক চিকিৎসা নিয়েও চোখে দেখতে কষ্ট হয় তার। এক পর্যায়ে ধীরে ধীরে নিভে যায় তার বাম চোখের দৃষ্টিশক্তি। ডান চোখে কিছুদিন দেখতে পেলেও সেটিরও আলোকশক্তি কমে যায়। আরাফাত ২০১৫ সাল থেকে চিটাগাং ব্লাইন্ড ক্রিকেট টিমে খেলে আসছেন। দৃষ্টিহীন হওয়ার পর ২০১২ সালে চট্টগ্রাম নগরীর সরকারি দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার মাধ্যমে আরাফাতের শিক্ষাজীবন শুরু হয়। ২০১৯-২০২০ সেশনে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন। বর্তমানে তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত রয়েছেন।

আরাফাত বাংলাদেশ ব্লাইন্ড ক্রিকেট দলে অলরাউন্ডার হয়ে খেলছেন। লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব করে দেশের জন্য সুনাম কুড়ানোয় খুশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পরিবার ও ভক্তরা। সর্বশেষ দেশের হয়ে ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত আইবিএসএ ওয়ার্ল্ড গেমস-২০২৩ খেলেছে বাংলাদেশ দল। যেখানে ছিলেন আরাফাতও। ২০২১ সালের ২৪ ডিসেম্বর ভারতের মাটিতে প্রথম আন্তর্জাতিক দ্বিপাক্ষিক সিরিজ দিয়ে অভিষেক হয় অদম্য আরাফাতের। দুই চোখে আলো না থাকলেও নিজেদের প্রথম ম্যাচে স্বাগতিক ইংল্যান্ডকে ৩২ রানে, দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে ৫৩ রানে হারিয়ে অ্যালিমেনিটরে উঠে বাংলাদেশ ব্লাইন্ড ক্রিকেট দল। এর আগে ২০২২ সালে ব্লাইন্ড ক্রিকেট টি-টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপে বাংলাদেশ রানার্সআপ হয়। সেই টিমেও দলের গুরুত্বপূর্ণ অলরাউন্ডারের ভূমিকা রাখেন আরাফাত। নিজের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ অদম্য আরাফাত।

দেশ রূপান্তরকে আরাফাত বলেন, ‌‘ব্যাটে বলে শাসন করে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনাই আমার মূল লক্ষ্য।’ দৃষ্টিহীন হয়েও কিভাবে ক্রিকেট খেলেন এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘ব্যাটিংটা নরমাল ক্রিকেটের মত, তবে আমাদের বলে বিশেষ একটি শব্দ করে, বোলিং করার পর একটি বিশেষ শব্দ হয়, যা শুনে আমরা ব্যাটিং করি। ফিল্ডিংটাও শব্দের ওপর নির্ভর করে করা হয়। এছাড়া বোলিং করার সময় ব্যাটসম্যানের সাথে কথা বলে জিজ্ঞেস করে নেওয়া হয়, ‘ব্যাটসম্যান প্রস্তুত আছে কি না। মূলত কমান্ডের উপর বোলিংটা করা হয় বলেও জানান তিনি।’

সম্প্রতি আইবিএসএ ওয়ার্ল্ড গেমস-২০২৩ দলের ব্রোঞ্জ পদক অর্জন প্রসঙ্গে এই ক্রিকেটার বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রত্যাশা মাফিক এবারের লক্ষ্যটা অর্জন করতে পেরেছি। প্রথমবার হিসেবে কন্ডিশন বিবেচনায় আমাদের টার্গেটটাই ছিল ব্রোঞ্জ। সেটা এবার আমরা অর্জন করেছি। আগামীতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার টার্গেট রাখি। এখানে প্রথম ম্যাচ ইংল্যান্ডের সাথে, দ্বিতীয় ম্যাচ পাকিস্তানের সাথে, তৃতীয় ম্যাচ ইন্ডিয়ার সাথে, চতুর্থ ম্যাচ অস্ট্রেলিয়ার সাথে খেলেছি। যেখানে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াকে বড় ব্যবধানে হারিয়েছি। ভারতের সাথে উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ৩ উইকেটে হেরে যাই।’

তিনি এই ইভেন্ট নিয়ে আরও বলেন, ‘এবারের আইবিএস ওয়ার্ল্ড গেমসে বিভিন্ন ইভেন্টে ওয়ার্ল্ডের ৭০টি দেশ অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে আমরা বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরেছি বহির্বিশ্বে। ব্রোঞ্জ পদক পেয়ে বাংলাদেশের সুনাম বাড়িয়েছি।’

বাংলাদেশ ব্লাইন্ড ক্রিকেট দলের আগামীর পরিকল্পনা কী, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে আগামীতে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের মাটিতে ব্লাইন্ড ক্রিকেট টি-টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপে চ্যাম্পিয়ন হতে চাই। তারই অংশ হিসাবে আমরা খেলোয়াড়রা কঠোর অনুশীলন করতে ঐক্যবদ্ধ।’

এ সময় তিনি বলেন, ‘সফলতা পেতে হলে তো স্ট্রাগলের কোনও বিকল্প নেই। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় আমার চোখে বল পড়ে চোখের রেটিনা ফেটে গিয়েছে। এরপর থেকে আমি ব্লাইন্ড ক্রিকেটে খেলে যাচ্ছি। সর্বোপরি পরিশ্রমের বিকল্প আর কোনো কিছু হতে পারে না বিশেষ করে স্পোর্টসে।’

আরাফাতের বাবা মাওলানা নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ছেলের পারফরমেন্সে আমি খুশি। আমি একসময় প্রবাসে ছিলাম। ছেলে এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়ে খেলে জয় ছিনিয়ে আনছে, তাতে আমি আনন্দিত। আশা করব আমার ছেলে ক্রিকেটে আরও ভালো করবে এবং বিশ্বজয় করবে। ইতোমধ্যে আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা সফলভাবে শেষ করার আশাও রাখেন তিনি।’