‘মান্ধাতার আমল’ বাংলা ভাষায় লিখিত এবং মানুষের মুখে মুখে ফেরা শব্দগুলোর একটি। খুবই প্রাচীন বা পুরনো কিছু বোঝাতে এই শব্দের ব্যবহার করা হয়। মান্ধাতা এক পৌরাণিক চরিত্র। রাজা মান্ধাতার সময়কাল ছিল সত্য যুগ। পৌরাণিক কাহিনিতে বর্ণিত ঘটনার বিবরণ থেকে সময়কাল হিসাব করলে দেখা যায়, রাজা মান্ধাতা প্রায় ৩৫ লাখ বছর আগে রাজকার্য পরিচালনা করেছেন। ফলে মান্ধাতার আমল মানে বহু বছর আগের কিছু। এখানে বাংলাদেশসহ এ উপমহাদেশে ৭৬ বছর আগে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলেও প্রায়শই শুনতে হয় যে ‘মান্ধাতার আমলের’ সেই ঔপনিবেশিক নানা আইনই এখানে চলছে। ব্রিটিশ আমলে তখনকার প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতিতে তৈরি এ আইনগুলোর কাঠামো নিয়ে আপত্তি না থাকলেও আইন ও বিচারসংশ্লিষ্ট বেশিরভাগ মানুষের প্রশ্ন আছে সময়, পরিস্থিতি ও প্রয়োজনে আইনগুলোর সংস্কার এবং যুগোপযোগী না করা নিয়ে।
মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘‘বিচারের যত ‘বুড়ো’ আইন” শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে ফৌজদারি অপরাধে আইনের যে ধারায় শাস্তি দেওয়া হয়, দণ্ডবিধি বা পেনাল কোড নামে আইনটি ১৬৩ বছরের পুরনো। বিচারের দিকনির্দেশক হিসেবে ফৌজদারি কার্যবিধি (দ্য কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর বা সিআরপিসি) নামে পদ্ধতিগত আইনটিও ১২৫ বছর আগের তৈরি। এ ছাড়া ১৫১ বছরের বেশি পুরনো (১৮৭২ সাল থেকে প্রচলিত) সাক্ষ্য আইন (এভিডেন্স অ্যাক্ট)। আইনের সংস্কার প্রশ্নে পাঁচজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী দেশ রূপান্তরকে প্রায় অভিন্ন সুরে বলেন, প্রায় ২০০ বছরের ঔপনিবেশিক সময়ে মানুষকে প্রজা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এর প্রভাব পড়েছে ওই সময়ে তৈরি আইনগুলোতে। যেখানে শুধু শাস্তিকেই লক্ষ্য করা হয়েছে। অন্যদিকে একশ, দেড়শ বছরে অপরাধের ধরন, ভিন্নতা, অপরাধে প্রযুক্তিগত ব্যবহারসহ বদলেছে অনেক কিছু। বিপরীতে আইনগুলোতে নগণ্য কিছু সংশোধনী ছাড়া সংস্কার হয়নি। পুরনো আইনের সংস্কার না হওয়াকে মামলাজটের কারণ উল্লেখ করে আইনজীবীরা আরও বলেন, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি, আদালতের সময়সহ বিচারপ্রত্যাশীর অর্থ ও সময় সাশ্রয়, অপরাধীর পুনর্বাসন, সংশোধন ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তেমন কিছুই নেই আইনগুলোতে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে প্রযুক্তিগত বা সাইবার অপরাধ অনেক বাড়লেও এসব অপরাধ প্রমাণে ভিডিও, স্থিরচিত্র, অডিও কীভাবে ব্যবহার হবে, ডিজিটাল ডিভাইস কীভাবে সাক্ষ্য হিসেবে গৃহীত হবে সেসব বিষয়ে সাক্ষ্য আইনে স্পষ্ট কোনো বিশ্লেষণ ও সংজ্ঞা নির্ধারণ নেই। যা ইতিমধ্যেই সংযুক্ত হওয়া উচিত ছিল।
পুরনো ফৌজদারি আইনের সংস্কার নিয়ে ২০১১ সালে একটি রূপরেখা তৈরি করে আইন মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রতিবেদন দিয়েছিল আইন কমিশন। এতে আইনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে প্রশ্নের অবতারণা করে সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানে ৩৩টি সুপারিশ করে কমিশন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কমিশনের ওই সুপারিশ আলোর মুখ দেখেনি। কমিশনের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোর্শেদ ইমতিয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিবেদন দেওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে কমিশন অবহিত নয়। ২০২১ সালে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফৌজদারি আইন সংস্কার ও আইনটি বাংলা ভাষায় প্রণয়ন করতে নির্দেশ দেন। আইনটি যুগোপযোগী, আধুনিক ও বাংলা ভাষায় প্রণয়নের উদ্দেশ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়। মন্ত্রণালয়ের ওয়াকিবহাল একটি সূত্রের তথ্য বলছে, দুই বছর পার হলেও এ বিষয়ে কার্যকর কোনো অগ্রগতি নেই। আইন ও আইন সংস্কার নিয়ে আলোচনায় যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন সেটি হলো সমস্যা আসলে কোনটি? ব্রিটিশ আমল বা ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত আইনটিই সমস্যা নাকি সেই আইনের সময়োপযোগী সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় সংযুক্তি না হওয়াটা সমস্যা? জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার একজন বিচারক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুরনো আইনগুলোতে এমন অনেক কিছু আছে, যা একটু আধুনিক হলে বিচারকাজ আরও গতিশীল হবে।’ লক্ষ করা দরকার সমস্যা কেবল আইনের নয়, প্রশ্নটি সামগ্রিকভাবে বিচারব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত। এক্ষেত্রে আইন কমিশনের ভূমিকা অগ্রগণ্য হতে পারত। মান্ধাতার আমলের আইন দিয়ে ডিজিটাল সময়ের অপরাধ যেমন দমন করা যাবে না, তেমনি এর সংস্কার না হলে স্মার্ট আইনি সেবাও পাওয়া হবে না।