খনন করা ১২ নৌপথের অর্ধেকই পরিত্যক্ত

উন্নয়ন খাতের এক প্রকল্পের অধীনে খনন করা ১২টি নৌপথের অর্ধেকই ইতিমধ্যে পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনীয় নাব্যর অভাবে ওইসব নৌপথে যাত্রী ও পণ্যবাহী নৌযান চলাচল করতে পারছে না। শিপিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন রিপোর্টার্স ফোরামের (এসসিআরএফ) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেছে। গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিবেদনের সার-সংক্ষেপ প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫০৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ড্রেজিং বিভাগ। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল যাত্রী ও পণ্যবাহী জলযানগুলোর নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৩১৬ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ১২টি নৌপথের নাব্য উন্নয়ন। প্রকল্পটি বাস্তবায়নকাল ছিল অক্টোবর ২০১১ থেকে জুন ২০১৫।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্প বাস্তবায়নকালে প্রয়োজনীয় খনন করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে নিয়মিত পলি অপসারণের মাধ্যমে নাব্য বজায় রাখা হয়নি। ফলে অর্ধৈক নৌপথ পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নৌপথ নিয়ে নানা সময়ে অনেক প্রকল্প নিলেও তা সঠিক সমীক্ষা না করায় অনেক কাজের সুফল মেলেনি। যার ফলে অনেক নৌপথ এখন প্রায় পরিত্যক্ত।

এসসিআরএফ জানায়, জুলাই ২০২১ থেকে জুন ২০২৩ পর্যন্ত দুই বছর পর্যবেক্ষণ চালিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এ সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ ছাড়া নৌপরিবহন বিশেষজ্ঞ, নৌযান মালিক ও শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের সঙ্গে আলাপ করা হয়েছে। তবে বিআইডব্লিউটিএ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য দেয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসসিআরএফ জানায়, প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে চিঠি দেওয়া হলেও সংস্থাটির ড্রেজিং বিভাগ দুই মাসেও চিঠির জবাব দেয়নি।

জানা যায়, ‘১২ নৌপথ খনন’ প্রকল্পের আওতায় থাকা নৌপথগুলো হলো ঢাকা-তালতলা-ডহুরী-জাজিরা-মাদারীপুর, লাহারহাট-ভেদুরিয়া, সাহেবেরহাট-টুঙ্গীবাড়ী-লাহারহাট, সদরঘাট-বিরুলিয়া, পাটুরিয়া-বাঘাবাড়ী, ডেমরা-ঘোড়াশাল-পলাশ, ঢাকা-রামচর-মাদারীপুর, ঢাকা-শরীয়তপুর, চাঁদপুর-নন্দীর বাজার-শিকারপুর-হুলারহাট, হুলারহাট-চরচাপিল-গোপালগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ-দাউদকান্দি এবং ঢাকা-সুরেশ্বর-আঙ্গারিয়া-মাদারীপুর। তবে এগুলোর মধ্যে সদরঘাট-বিরুলিয়া, ডেমরা-ঘোড়াশাল-পলাশ, হুলারহাট-চরচাপিল-গোপালগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ-দাউদকান্দি নৌপথ কার্যত পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া নাব্য সংকটের কারণে আরও কয়েকটি নৌপথের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে সঠিকভাবে নদী খনন ও নৌপথ সংরক্ষণ হচ্ছে না বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

এদিকে ঢাকার সদরঘাট-বিরুলিয়া নৌপথের খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই পথ দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নকালে যেভাবে খনন করার কথা ছিল, সেভাবে কাজ করা হয়নি। আর কাজ শেষে নিয়মিত পলি অপসারণের মাধ্যমে নাব্য বজায় রাখা হয়নি। যার ফলে এখানের অনেক জায়গায় নৌপথ বছরের পর বছর পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নৌপথ স্বাভাবিক রাখতে হলে নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত রাখতে হবে। যদি তা না করা হয়, তাহলে যতই প্রকল্প নেওয়া হোক না কেন, কোনো কাজেই আসবে না। বিগত সময় নৌপথের যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, সেগুলো বেশিরভাগ সমীক্ষা হয়নি। তাছাড়া আমাদের ঢাকার চারপাশে যেসব নদী ও খাল-বিল আছে, সেগুলো ব্যবহার করে যোগাযোগের মাধ্যম এখনো তৈরি হতে পারছে না। ফলে সড়কে দিনের পর দিন গাড়ির চাপ বাড়ছে। সেই সঙ্গে যানজট তৈরি হচ্ছে।’