‘ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্য’ নিয়ে দিনভর আলোচনা

‘ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্য’ নামে একটি জোটের আত্মপ্রকাশ হয়েছে আজ। নয় দফার ভিত্তিতে সরকার বিরোধী ১৫ ছাত্রসংগঠন নিয়ে এ ছাত্র ঐক্য গঠিত হয়েছে। যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা দিনভর চলছে। এ আলোচনায় যোগ দিয়েছে ছাত্রলীগও। ছাত্রদলের নেতৃত্বে গঠিত এ ঐক্যে নামসর্বস্ব বাম ধারার ছাত্র সংগঠনকে জোটবদ্ধ করা নিয়ে যেমন আলোচনা হচ্ছে, তেমনি বড় কোনো ইসলামি ছাত্র সংগঠনকে না নেয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা।

শুক্রবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্যের মুখপাত্র হিসেবে ঐক্যের ঘোষণা দেন।

ভোটাধিকার, সন্ত্রাস-দখলদারিত্বমুক্ত নিরাপদ ক্যাম্পাস, সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ছাত্র আন্দোলন গড়ে তুলতে এ জোট গঠন করা হয়েছে বলে জানায় তারা।

ছাত্রদল ছাড়াও এতে রয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (জেএসডি), গণতান্ত্রিক ছাত্রদল (এলডিপি), নাগরিক ছাত্র ঐক্য, জাগপা ছাত্রলীগ, ছাত্র ফোরাম (গণফোরাম মন্টু), ভাসানী ছাত্র পরিষদ, জাতীয় ছাত্রসমাজ (কাজী জাফর), জাতীয় ছাত্রসমাজ (পার্থ), জাগপা ছাত্রলীগ (লুৎফর), ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ, বিপ্লবী ছাত্র সংহতি এবং রাষ্ট্র সংস্কার ছাত্র আন্দোলন।

এ ১৫ দলীয় জোটে একমাত্র ইসলামী ছাত্র সংগঠন হলো ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ, যেটি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের ছাত্র সংগঠন। কিন্তু মাঠের রাজনীতিতে আরও বড় অনেক ইসলামী সংগঠন রয়েছে। যাদের নেওয়া হয়নি এ ঐক্যে।

অভিযোগ রয়েছে গেছে, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনসহ কয়েকটি ইসলামি ভাবধারার সংগঠনকে ছাত্র ঐক্যে নেয়ার কথা ছিল। তাদের জোটে নেয়া হয়নি কয়েকটি বাম ছাত্র সংগঠনের বিরোধিতায়। যার ফলে ছাত্রদল সরকার বিরোধী কার্যকর বৃহত্তর ছাত্র ঐক্য গড়া থেকে পিছিয়ে গেছে বলে মনে করছে কেউ কেউ।

অন্যদিকে রাজনীতি সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, ছাত্ররাজনীতির প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ জোটের শরিকদের কারো শক্তিশালী অবস্থান নেই, নেই উল্লেখযোগ্য কর্মসূচিও। তাদের নিয়ে গঠিত এ জোটের সফল হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল কীভাবে এ জোট কাজ করবে তা নিয়ে কিছু জানে না। ঢাবি ছাত্রদলের শীর্ষ এক নেতা বলেন, ছাত্র জোট হচ্ছে, কিন্তু আমাদের রাখা হচ্ছে না, বৈঠকে কী হচ্ছে না হচ্ছে আমরা জানি না।

ঢাবি ছাত্রদলের সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেল বলেন, এ জোটের বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। আমাদের কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিষয়টি দেখছেন।

জানা যায়, গত ২৭ আগস্ট বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ১৯ ছাত্র সংগঠন নিয়ে বৃহত্তর ছাত্র ঐক্য গঠনের লক্ষ্যে মতবিনিময় সভা হয়। সেখানে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনসহ ধর্মভিত্তিক কয়েকটি সংগঠনও অংশ নেয়। সেই সভায় ছাত্র ফেডারেশন ও ছাত্রলীগ (রব) বৃহত্তর ছাত্র ঐক্যের বিরোধিতা করে। পরবর্তীতে ছাত্র ঐক্যের প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। পরে গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারা বিএনপির লিয়াজোঁ কমিটির সঙ্গে বৈঠক করে। সেখানে ছাত্রদলের সঙ্গে শুধু মঞ্চভুক্ত সংগঠনের ঐক্য করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে বিএনপি সাড়া না দিলে আরো কিছু সংগঠনকে যুক্ত করার প্রস্তাব ওঠে।

এ বিষয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আব্দুর রব, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ও নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ গণতন্ত্র মঞ্চের নেতাদের সঙ্গে বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন স্বপন ও দলটির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুলের সভা হয়। সেখানে ছাত্র ঐক্যের ‘স্টিয়ারিং’ ছাত্রদলের পর গণতন্ত্র মঞ্চের ছাত্র সংগঠনের কাছে রাখার জন্য চাপ দেন গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গণতন্ত্র মঞ্চের ছয়টি রাজনৈতিক দল তাদের ছয়টি ছাত্র সংগঠন আছে বলে দাবি করলেও এখন পর্যন্ত চারটির নাম পাওয়া গেছে। যার মধ্যে শুধু ছাত্র ফেডারেশনের কিছু কর্মী রয়েছে, মাঝে কিছু কর্মসূচিও করতে দেখা যায় তাদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগে (রব) আছে চার থেকে পাঁচজন। অন্যদিকে নাগরিক ছাত্র ঐক্যের নেতাকর্মী রয়েছে আট থেকে ১০ জন। ভাসানী পরিষদের এখন পর্যন্ত আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব ছাড়া কাউকে দেখা যায়নি।

ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি শরিফুল ইসলাম রিয়াদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা চেয়েছিলাম বৃহত্তর ছাত্র ঐক্য হোক, কিন্তু কয়েকটি বাম ছাত্র সংগঠন আদর্শের কথা বলে সেটি পণ্ড করে দেয়। অথচ এ সংকটের সময়ে বৃহৎ ঐক্য হওয়া প্রয়োজন ছিল। একটি গোষ্ঠীর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ছাত্রদল এখানে সাংগঠনিক অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। আন্দোলন তো দূরে থাক, এটি ইতিমধ্যে বিতর্কের মধ্যে পড়েছে। ছাত্র সমাজ এটাকে কতটা গ্রহণ করে সেটা দেখার বিষয়।

ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্যের সঙ্গে জড়িত এক ছাত্রনেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপির হাইকমান্ড থেকে হস্তক্ষেপ করে এ ঐক্যকে বামকেন্দ্রীক করা হয়েছে। ছাত্রদলের হাতে থাকলে হয়তো আরো ভালো কিছু সম্ভব ছিল। যাদের জোটে নেয়া হয়েছে ক্যাম্পাসে তাদের অবস্থানও নেই। আমরা আরো বৃহৎ জোট চেয়েছিলাম।

এ বিষয়ে ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছাত্রদলের উদ্যোগে ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্য গঠন হয়েছে। বাম কিংবা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ এখানে দেখা হয়নি। সবার সুযোগ রয়েছে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন করার।

ইসলামী ভাবধারার সংগঠন বাদ দেওয়া বিষয়ে ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাশেদ ইকবাল খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা কাউকে বাদ দিইনি। ছাত্রশিবিরও যদি ফ্যাসিবাদবিরোধী অবস্থান দেখাতে পারে এবং আমাদের দফার সঙ্গে একমত হয়, তাহলে তাদেরও সুযোগ আছে এ ঐক্যে যুক্ত হওয়ার। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রত্যেক ক্যাম্পাসে ছাত্র সমাজের আন্দোলন চলবে।

ছাত্রদলের এ জোটের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই জোটের কোনো ভ্যালু নেই। তাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কোনো সংযোগ নেই। তারা মূলত সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও ক্যাম্পাসে কিলিং মিশন করতেই এই জোট করেছে। কিন্তু ছাত্র সমাজ তাদের রুখে দেবে।

সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান বলেন, এটা একটা ভুয়া ঐক্য, দেশবিরোধী অপশক্তির ঐক্য। এ ঐক্য কোনো প্রভাব রাখতে পারবে না।