চট্টগ্রামে বেসরকারি ৬ হাসপাতালই পূর্ণাঙ্গ নয়

ছোটবেলায় রিউম্যাটিক ফিভার হয়েছিল নুর বেগমের। চল্লিশ পেরুনোর পরে চিকিৎসকরা জানান, হার্টের ভাল্ব প্রতিস্থাপন না করলেই নয়। কিন্তু করবেন কীভাবে? নিম্নবিত্ত পরিবারের এই গৃহবধূ বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয়ের কথা শুনে ধরেই নিয়েছিলেন, তিল-তিল করে মৃত্যুর দিকে এগোনোই তার ‘ভবিতব্য’। কিন্তু তার ‘ভবিতব্য’ বদলে দিলেন চট্টগ্রামের বেসরকারি মেট্রোপলিটন হাসপাতালের চিকিৎসকরা। সম্প্রতি এই হাসপাতালে ৫০ হাজার টাকায় হার্টের ভাল্ব প্রতিস্থাপন হলো তার। এখন তিনি ভালো আছেন।

শুধু কি মেট্রোপলিটন হাসপাতাল? না। হৃদরোপ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ এখন হৃদরোগ চিকিৎসায় প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। চট্টগ্রামে ছয়টি বেসরকারি হাসপাতালে হার্টের চিকিৎসা হচ্ছে। এগুলো হলো এভারকেয়ার হসপিটাল, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, চট্টগ্রাম ম্যাক্স হাসপাতাল, ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল, সিএসসিআর ও চট্টগ্রাম হার্ট ফাউন্ডেশন। চিকিৎসকদের মতে, প্রকোপ বেশি হলেও চট্টগ্রামে এখনো গড়ে ওঠেনি হৃদরোগের কোনো বিশেষায়িত পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল।

নগরের প্রবর্ত্তক এলাকায় অবস্থিত বেসরকারি সিএসসিআর হাসপাতালে হার্টের সফল চিকিৎসা হচ্ছে। এখানে দক্ষ ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, অভিজ্ঞ টেকনোলজিস্ট, নার্স ও সাপোর্ট স্টাফের সমন্বয়ে অত্যন্ত কার্যকর টিম রয়েছে। ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজির সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি নিরসনে সিএসসিআরের কার্ডিয়াক বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে।

ঢাকায় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের মতো চট্টগ্রামেও একটি হৃদরোগ ইনস্টিটিউট বা বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে সিএসসিআর কার্ডিয়াক বিভাগের ক্যাথল্যাব পরিচালক ডা. ইব্রাহীম চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামে হৃদরোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ঢাকার বাইরে বৃহত্তর চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও ফেনী জেলার হৃদরোগীদের চিকিৎসার একমাত্র ভরসাস্থল চট্টগ্রাম। তিনি জানান, ১১ মাস আগে সিএসসিআরে কার্ডিয়াক ক্যাথল্যাব স্থাপনের পর থেকে এ পর্যন্ত ৫৫০ জনের হার্টে রিং পরানো হয়েছে। এনজিওগ্রাম করা হয়েছে প্রায় দেড় হাজার জনের। এ ছাড়া পেসমেকার লাগানো হয়েছে ১৫০ জনের।

এক প্রশ্নের উত্তরে ডা. ইব্রাহীম চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে হৃদরোগীর চিকিৎসা হলেও সরকারি বা বেসরকারি কোনো হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ সুযোগ-সুবিধা নেই। দুপুর আড়াইটার পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকেন না। এই অবস্থায় মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসায় বেসরকারি হাসপাতালের ক্যাথল্যাব গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।’

ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালের কার্ডিওলজিস্ট ডা. এন এ এম মোমেনুজ্জামান বলেন, ‘চট্টগ্রামের হার্টের রোগীদের এখন আর দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। ২০ থেকে ২২ বছর আগে বলতে গেলে হার্টের চিকিৎসা ছিল ইসিজি নির্ভর। আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হার্টের রোগীরা বিদেশ চলে যেতেন। এমনকি নিম্ন মধ্যবিত্তদেরও জমি বিক্রি করে দেশের বাইরে যাওয়ার প্রবণতা আমরা দেখেছি। সেসময় দেশে বাইপাস করাতে রোগীকে রাজি করানোই কঠিন ছিল। বলতে গেলে ডাক্তারদের প্রতি রোগীদের কনফিডেন্স ছিল না। তবে বন্ধুর সে পথ আমরা পাড়ি দিয়ে এসেছি।’

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এ কে এম ফজলুল হক বলেন, ‘হার্টের চিকিৎসার জন্য মেট্রোপলিটন হাসপাতাল কমপ্লিট সলিউশন বলা চলে। এখানে পাঁচজন কার্ডিওলজিস্ট স্ট্যান্ডবাই থাকেন। অন্য হাসপাতাল বা ক্লিনিকে অন কলে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ আনতে হয়। সময়ের ব্যবধানে আমরা আমাদের চিকিৎসাসেবায় যুক্ত করেছি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। এখানে আছে স্বয়ংসম্পূর্ণ কার্ডিওভাসকুলার বিভাগ।’ তার দাবি, চট্টগ্রামে প্রথম হার্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এই হাসপাতালে।

চট্টগ্রামের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও কার্ডিয়াক সার্জনরা জানাচ্ছেন, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৩০ ভাগই হৃদরোগজনিত কারণে। অঞ্চলভিত্তিক পর্যালোচনায় চট্টগ্রামেই হৃদরোগের সংখ্যা বেশি। এক সময় হৃদরোগ চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামের অনেকে দেশের বাইরে যেতেন। তবে এখন তা কমে এসেছে। এর কারণ চট্টগ্রামে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মানের হৃদ‌রোগ চিকিৎসক ও চিকিৎসাকেন্দ্র, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় কম।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দেশে এ পর্যন্ত প্রায় লাখ খানেক মানুষের ওপেন হার্ট সার্জারি হয়েছে। চট্টগ্রামসহ সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি ২৫টি হাসপাতালে বর্তমানে ওপেন হার্ট সার্জারি হয়। এসব হাসপাতালে প্রতি বছর ১০ থেকে ১২ হাজার বাইপাস সার্জারি হয়। ১৫ থেকে ১৬ হাজার এনজিওপ্লাস্টি হয়। ৫০ থেকে ৬০ হাজারের বেশি মানুষের এনজিওগ্রাম হয়।

হার্টের রোগ নির্ণয়ে চট্টগ্রামের বেসরকারি ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল আছে সর্বাধুনিক সিটি স্ক্যান মেশিন। এই মেশিনে মাত্র ৩ থেকে ১০ সেকেন্ডে হার্টের ব্লক নির্ণয় করা যাচ্ছে। ‘এনজিওগ্রাম’ পরীক্ষার চেয়ে এই সিটি স্ক্যান পরীক্ষায় খরচও অনেক কম। জার্মানির ১২৮ ডুয়েল সোর্সের সিটি স্ক্যান মেশিনটিতে ব্লক নির্ণয়ে ফি লাগছে ছয় হাজার টাকা।

শিশুদের হার্টের চিকিৎসায় অন্যন্য ভূমিকা পালন করছে চট্টগ্রামের বেসরকারি এভারকেয়ার হসপিটাল। এই হাসপাতালের শিশু হৃদরোগ বিভাগের প্রধান ডা. তাহেরা নাজরীন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে শিশুদের হৃদরোগ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের শিশু হৃদরোগ বিভাগ হাসপাতাল চালু হওয়ার শুরু থেকেই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ডিভাইস এবং বেলুনের মাধ্যমে হার্টের জন্মগত ছিদ্র বন্ধ করা এবং ত্রুটিযুক্ত ভাল্বের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে।’

এভারকেয়ার হসপিটাল, চট্টগ্রামে রয়েছে একটি স্টেট-অফ-আর্ট ক্যাথল্যাব ও অত্যাধুনিক পেডিয়াট্রিক আইসিইউ সুবিধা। চালু আছে কমপ্রিহেন্সিভ পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি সার্ভিস। কার্ডিওলজিস্টরা জানান, হৃদরোগ থেকে রক্ষা পেতে প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তের উচ্চ কোলেস্টেরল, মেদ বাহুল্য প্রতিরোধ ও চিকিৎসার মাধ্যমে হৃদরোগ বা হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ সম্ভব।

চট্টগ্রাম হার্ট ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. প্রবীর কুমার দাশ বলেন, ‘সামর্থ্যবান হৃদরোগীরা ঢাকা, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বা উন্নত দেশে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। তবে হৃদরোগে আক্রান্ত বিশালসংখ্যক রোগীর তুলনায় এ সংখ্যা নিতান্তই নগণ্য। আবার হার্ট অ্যাটাক ও হৃদরোগের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা নিতে হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে চট্টগ্রাম হার্ট ফাউন্ডেশন।’

এক প্রশ্নের উত্তরে ডা. প্রবীর কুমার দাশ বলেন, ‘চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে দায়িত্বপালনকালে হৃদরোগীদের জন্য চট্টগ্রামে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তোলার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়ে ছিলাম। কিন্তু আজ পর্যন্ত এর কোনো অগ্রগতি হয়নি। সীতাকু-ের জঙ্গল সলিমপুরে চার একর জায়গায় চট্টগ্রাম হার্ট ফাউন্ডেশনের নিজস্ব হাসপাতাল গড়ে তোলা হবে। সেখানে থাকবে সিসিইউ, ক্যাথল্যাব, আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটারসহ ৫০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ হৃদরোগ হাসপাতাল।’