দেশে হৃদরোগের চিকিৎসায় যুগান্তকারী উন্নতি হয়েছে

অধ্যাপক ডা. খন্দকার কামরুল ইসলাম হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ। ঢাকায় ইউনিভার্সেল কার্ডিয়াক হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান। বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে দেশে হৃদরোগ চিকিৎসার নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশে হৃদরোগের প্রকোপ কেমন। কী পরিমাণ রোগী এবং মৃত্যুর সংখ্যা কেমন? অন্যান্য সংক্রামক রোগের এই রোগে মৃত্যু ও রোগীর সংখ্যা কোন পর্যায়ে রয়েছে?

অধ্যাপক ডা. খন্দকার কামরুল ইসলাম : বিশে^র অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশেও হৃদরোগের প্রকোপ অনেক বেশি। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে জানা যায়, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ২৭ শতাংশ ঘটে হৃদরোগের কারণে। এই রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ও ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। কারণ অনেক সময় হার্ট অ্যাটাকের পর রোগীকে হাসপাতালে আনার আগে পথেই তার মৃত্যু ঘটে। প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ লোক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বাংলাদেশে এই সংখ্যাটা ৩ লাখের ওপরে। হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর এর চিকিৎসা বেশ ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো মধ্যম আয়ের দেশে অনেক রোগীর জন্যই এই চিকিৎসা ব্যয় বহন করা দুষ্কর। এ ক্ষেত্রে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। নিয়মিত চেকআপের মধ্যে থাকলে ও সুস্থ জীবন যাপন করলে হৃদরোগের আশঙ্কা অনেকাংশেই কমে যায়।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশে হৃদরোগের চিকিৎসাব্যবস্থা কেমন। ১০-২০ বছরে এই চিকিৎসার কেমন অগ্রগতি হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে কেমন চিকিৎসা পাচ্ছে মানুষ। খরচ কেমন। এই রোগের চিকিৎসায় সংকট কোথায়?

ডা. খন্দকার কামরুল : এক দশকে বাংলাদেশে হৃদরোগের চিকিৎসাব্যবস্থায় যুগান্তকারী উন্নতি হয়েছে। দেশের সব মেডিকেল কলেজেই হৃদরোগ বিভাগ রয়েছে এবং হৃদরোগের চিকিৎসকও পাওয়া যায়। খরচটা আসলে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। যেমন হার্ট অ্যাটাক যদি হয়েই যায়, তবে আমরা রোগীকে এনজিওগ্রাম করতে বলি। সরকারি হাসপাতালে এটা ৫ থেকে ৭ হাজারের মধ্যেই করা যায়। বেসরকারি হাসপাতালে খরচটা একটু বেশি পড়ে। তবে এনজিওগ্রামের পরে যদি হার্টে রিং বসাতে হয় বা বাইপাস করতে হয়, সেগুলোর খরচ অনেক বেশি। তবে স্বস্তির বিষয় এই যে আগে রিংয়ের দাম একেক জায়গায় একেক রকম থাকলেও এখন সরকার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাই সব হাসপাতালে রিংয়ের দাম একই। তবে রিংয়ের প্রকারভেদের কারণে দাম বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। ৬০ হাজার থেকে শুরু করে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত আছে। আবার কারও কারও ক্ষেত্রে একের অধিক রিং লাগতে পারে। এগুলোর ওপরেই মূল খরচটা নির্ভর করে। স্বাভাবিকভাবেই বাইপাসের ক্ষেত্রেও সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে খরচের তফাত আছে, তবে সরকারি হাসপাতালেও ১ লাখ টাকার নিচে বাইপাস করা সম্ভব হয় না।

দেশ রূপান্তর : দেশে কোন কোন হৃদরোগের চিকিৎসা হচ্ছে এবং কোন ধরনের হৃদরোগের চিকিৎসা এখনো হচ্ছে না। কেন এসব হৃদরোগের চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়নি?

ডা. খন্দকার কামরুল : বাংলাদেশে হৃদরোগকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়, যেমন জন্মগত রোগ, হার্টের ভাল্বের রোগ, হার্টের মাংসপেশির রোগ, কম্পনজনিত রোগ, রক্তনালির রোগ ইত্যাদি। এর মধ্যে রক্তনালির রোগই সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর এবং বেশিরভাগ রোগী এই রোগেই ভুগে থাকে। কোনো কারণে যদি রক্তনালি ব্লক হয়ে রক্ত চলাচল বিঘিœত হয়, তাহলে হার্ট অ্যাটাক হয়। বিশে^র অন্যান্য দেশের সঙ্গে যদি আমরা তুলনা করি তো সব ধরনের চিকিৎসাই আমাদের দেশে হচ্ছে, শুধু একটা জায়গাতেই আমরা পিছিয়ে আছি তা হচ্ছে, হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট। এটা দেশে এখনো আমরা করতে পারি না। এই হার্ট প্রতিস্থাপন বাদে বাকি সব ধরনের চিকিৎসাই সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে হয়ে থাকে। এ ছাড়া হৃদকম্পনজনিত রোগের চিকিৎসাব্যবস্থা ১০ বছর আগেও অপ্রতুল ছিল। কিন্তু বর্তমানে এ ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে গেছি। অন্যান্য হৃদরোগজনিত রোগের চিকিৎসাও আমরা বিশে^র সঙ্গে তাল মিলিয়ে দিচ্ছি। এমনকি পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের দিকে তাকালেও আমরা দেখতে পাই যে সেখানেও হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টের সংখ্যা খুবই কম।

দেশ রূপান্তর : হৃদরোগের চিকিৎসা নিতে কী পরিমাণ রোগী প্রতি বছর দেশের বাইরে যাচ্ছে। কেন যাচ্ছে? কোন দেশে বেশি যাচ্ছে। বিদেশের সঙ্গে দেশের চিকিৎসা ব্যয় ও মানের তারতম্য কেমন?

ডা. খন্দকার কামরুল : একসময় তো এনজিওগ্রাম করাতেই সবাই বিদেশে চলে যেত। কিন্তু বর্তমানে হয়তো ১০ শতাংশ রোগী হৃদরোগের চিকিৎসায় দেশের বাইরে যায়, বাকি ৯০ শতাংশ দেশেই চিকিৎসা নেয়। এখন কিছু মানুষ তো থাকেই যারা বিদেশ ভ্রমণ পছন্দ করে, এদের তো আমরা কখনোই ঠেকাতে পারব না। সেই সঙ্গে এটাও বলে রাখি যে বিশে^র অন্যান্য দেশের তুলনায় দেশে অনেক কম খরচেই হৃদরোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। হয়তো পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কিছু হাসপাতালের সঙ্গে তুলনা করলে মুদ্রামানের হিসাবে আমাদের চেয়ে কম লাগতে পারে, তবে বিদেশযাত্রার খরচ, রোগীর স্বজনদের যাওয়া-আসা বা থাকার খরচ হিসাব করলেই দেখা যাবে আমরা অনেক কম খরচেই চিকিৎসাসেবা দিচ্ছি। এ ক্ষেত্রে বলতে হয় যে সমাজের উচ্চশ্রেণির কিছু মানুষ আছে, যারা কিছু থেকে কিছু হলেই বিদেশে চলে যায়, এদের সংখ্যা কমানো গেলে সাধারণ মানুষও বিদেশে যাওয়া কমিয়ে দেবে।

দেশ রূপান্তর : দেশে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা কেমন। রোগী অনুপাতে শয্যা ও চিকিৎসক পর্যাপ্ত কি না।

ডা. খন্দকার কামরুল : দেশে বর্তমানে হাজারখানেক হৃদরোগ চিকিৎসক আছেন এবং অবশ্যই সেটা রোগীর অনুপাতে অপ্রতুল এবং সেই সঙ্গে শয্যাও কম। তবে বর্তমানে যত সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়েছে, এর সবগুলোতে করোনারি কেয়ার ইউনিট ও ক্যাথল্যাব আছে।

দেশ রূপান্তর : হৃদরোগ সার্জারির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সুযোগ-সুবিধা কেমন?

ডা. খন্দকার কামরুল : সার্জারির সুবিধা সব জায়গায় নেই; বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ছাড়া শুধু ঢাকা মেডিকেল, চট্টগ্রাম মেডিকেল ও মিটফোর্ডেই সার্জারির সুবিধা বিদ্যমান। এ জন্যই বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কার্ডিয়াক সার্জারির চাপ বেশি।

দেশ রূপান্তর : জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এবং মধ্যম মানের হাসপাতালগুলোতে হৃদরোগ চিকিৎসার কেমন ব্যবস্থা আছে?

ডা. খন্দকার কামরুল : জেলা পর্যায়ে সব জায়গাতেই এখন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ থাকলেও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিশেষ করে এনজিওগ্রামের ব্যবস্থা সব জেলায় এখনো হয়ে ওঠেনি। আর উপজেলা পর্যায়ে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের নিয়োগ এখনো শুরু হয়নি।

দেশ রূপান্তর : দেশে শিশু হৃদরোগের চিকিৎসা কেমন। কোন ধরনের হৃদরোগে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে একং রোগীর সংখ্যা কেমন?

ডা. খন্দকার কামরুল : দেশে এখনো শিশুদের হৃদরোগের চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা খুবই কম। সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে শুধু হৃদরোগ ইনস্টিটিউটেই শিশুদের সার্জারি হয়। বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যেও শিশুদের সার্জারি ইউনিভার্সেল কার্ডিয়াক হাসপাতালসহ হাতে গোনা আরও দুয়েক জায়গায় হয়। এ ছাড়া শিশুদের কিছু কিছু সার্জারি অত্যন্ত দুরূহ, যা মাঝে মাঝে দুই-তিন ধাপে সম্পন্ন করতে হয়। শিশু সার্জনদের সংখ্যাও দেশে অনেক কম। তাই এ ক্ষেত্রে আমাদের কিছুটা সীমাবদ্ধতা আছে। যেহেতু প্রতি বছর হাজার হাজার শিশু হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে, এ জায়গায় আমাদের আরও উন্নতি করা প্রয়োজন।