নান্দনিক লিটন নাকি আগ্রাসী গুরবাজ

‘হি ইজ ড্রয়িং মোনালিসা উইথ হিজ ব্যাট’, লিটন কুমার দাসের ব্যাটিং দেখে একবার কথাটি বলেছিলেন ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি ইয়ান বিশপ। সত্যিই তাই, লিটন স্বরূপে থাকলে মনে হয় ক্রিকেট মাঠটা একটা ক্যানভাস আর সেখানে ব্যাটকে তুলি বানিয়ে অসম্ভব সুন্দর কোনো ছবি আঁকছেন তিনি। তার ব্যাটিং দেখা মানেই চোখ ও মনের শান্তি।

শৈল্পিক ব্যাটিংয়ে লিটনের ধারেকাছেও নেই আফগানিস্তানের রহমানুল্লাহ গুরবাজ। কিছুটা ‘সি দ্য বল, হিট দ্য বল’ ঘরানার ব্যাটসম্যান তিনি। পছন্দ করেন প্রতিপক্ষের বোলারদের ওপর চড়াও হয়ে খেলতে। চলতি বিশ্বকাপে দুই ব্যাটসম্যানকে দেখা যাবে তাদের নিজেদের সর্বোচ্চটা দেওয়ার প্রচেষ্টায়। যার শুরু আজ থেকে, ধর্মশালায় বাংলাদেশ-আফগানিস্তানের ম্যাচ দিয়ে।

বাংলাদেশ ব্যাটিং লাইন আপে যেমন খুবই গুরুত্বপূর্ণ লিটন, আফগানিস্তান দলে তেমনি গুরবাজ। দুজনই ওপেনার। দলকে ভালো শুরু এনে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব থাকবে তাদের ওপর। দ্বিতীয় বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া লিটনের ক্ষেত্রে দায়িত্বটা একটু বেশিই। কারণ, এবারের আসরে উদ্বোধনী জুটিতে তার সঙ্গী তরুণ তানজিদ হাসান তামিম, যার অভিজ্ঞতা কেবল পাঁচ ওয়ানডে খেলার। যদিও প্রস্তুতি ম্যাচ দুটিতে নিজের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়েছেন তিনি ৮৪ ও ৪৫ রানের ইনিংস খেলে। প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলার অপেক্ষায় থাকা গুরবাজ এ জায়গায় একটু স্বস্তিই পাবেন সঙ্গীকে নিয়ে। এখনো খুব বেশি অভিজ্ঞতা না হলেও ১৯ ম্যাচে এরই মধ্যে চারটি করে সেঞ্চুরি ও ফিফটি করে নিজের প্রতিভা দেখিয়ে যাচ্ছেন আফগানদের আরেক ওপেনার ইব্রাহিম জাদরান।

শিল্পী হলেও নিজের চিত্রকর্ম নিয়মিত দেখাতে পারেন না ২৮ বছর বয়সী লিটন। সাম্প্রতিক সময়ে তো তার ফর্মটা একদমই ভালো যাচ্ছে না। গৌহাটিতে গা গরমের ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৬১ রানের ইনিংস খেললেও পরের ম্যাচে ইংল্যান্ডের সঙ্গে যেতে পারেননি দুই অঙ্কেও। করেন কেবল পাঁচ রান। এর আগে ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ড সিরিজে এক ম্যাচ ব্যাটিংয়ে সুযোগ পেয়ে থামেন ছয় রানে। এশিয়া কাপে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের বিপক্ষে তার ছিল যথাক্রমে ১৬, ১৫ ও ০ রান।

চলতি বছর এখন পর্যন্ত ১৭ ওয়ানডে খেলে ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান করতে পেরেছেন ৩৩৮ রান, ব্যাটিং গড় মাত্র ২৪.১৪। সেঞ্চুরি নেই একটিও, ফিফটি মোটে তিনটি, এ ছাড়া ৩০ পার করতে পেরেছেন কেবল একবার। বিশ্বকাপের বছরে লিটনের এমন পারফরম্যান্স বাংলাদেশের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ। যদিও স্টাইলিশ এই ব্যাটসম্যানের ওপর আস্থার হাত রেখেছেন অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। সপ্তাহখানেক আগে সতীর্থকে নিয়ে বলেছেন, ‘বিশ্বকাপে সেরাদের একজন হবেন লিটন। পুরো বিশ্বই তার দিকে তাকিয়ে থাকবে।’ সাকিবের মতো সেই আশায় বাংলাদেশের সমর্থকরাও।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে অবশ্য লিটনের পারফরম্যান্স ভালোই। নয় ওয়ানডেতে রান করেছেন ৪৭.২৫ গড়ে ৩৭৮, সেঞ্চুরি একটি, ফিফটি দুটি। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এর চেয়ে বেশি কেবল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে রান করেছেন তিনি, ১৩ ম্যাচে তিন সেঞ্চুরি ও দুই ফিফটিতে ৬৫৮। এই সংস্করণে তার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৩৬ রানের ইনিংসটি এসেছে আফগানদের বিপক্ষেই। গত বছর চট্টগ্রামে নান্দনিক ব্যাটিংয়ের প্রদর্শনীতে সবার চোখে ঘোর লাগিয়ে দলের জয়ে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছিলেন লিটন। তাদের সঙ্গে সবশেষ ইনিংসেও অপরাজিত ৫৩ রান করেছিলেন তিনি। ২০২০ সালে সিলেটে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ক্যারিয়ার সেরা ১৭৬ রানের ইনিংসটি খেলেছিলেন লিটন। ওয়ানডেতে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বড় ইনিংসের রেকর্ড। আফগান মিশনে নামার আগে পরিসংখ্যানে তাকিয়ে তাই কিছুটা আত্মবিশ্বাস নিতেই পারেন আট বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা এই কিপার-ব্যাটসম্যান।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে লিটনের মতো অভিজ্ঞ নন গুরবাজ। ২০২১ সালে ওয়ানডে অভিষিক্ত এই কিপার-ব্যাটসম্যান পারফরম্যান্সে অবশ্য লিটনের চেয়ে পিছিয়ে নেই একদমই। পাঁচ সেঞ্চুরি করতে লিটনের যেখানে লেগেছে ৭৭ ওয়ানডে, গুরবাজ এই অঙ্ক ছুঁয়ে ফেলেছেন ২৬ ম্যাচেই। ওয়ানডেতে ব্যাটিং গড়ে তো লিটনের চেয়ে এগিয়ে আফগান ক্রিকেটারই, লিটন ৩৬.৪৭ ও গুরবাজ ৩৮.৩২।

বাংলাদেশকে পেলেই জ¦লে ওঠেন ২১ বছর বয়সী গুরবাজ। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বেশি রান এই দলের সঙ্গে করেছেন তিনি, সাত ম্যাচে ৪৯ গড়ে ২৯৪। এই সংস্করণে সর্বোচ্চ দুটি সেঞ্চুরি পেয়েছেন তিনি বাংলাদেশের বিপক্ষেই। দ্বিতীয় সেরা ওয়ানডে ইনিংসটিও একই প্রতিপক্ষের সঙ্গে। গত জুলাইয়ে চট্টগ্রামে বাংলাদেশকে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে (১৪২ রানে) হারানোর পথে ১২৫ বলে ১৪৫ রান করেছিলেন তিনি। পরের মাসেই পাকিস্তানের বিপক্ষে ক্যারিয়ার সেরা ১৫১ রানের ইনিংসটি খেলেন গুরবাজ। ওয়ানডেতে যা আফগানিস্তানের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইনিংস।

ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সঙ্গে সবশেষ দেখায় কিছুই করতে পারেননি গুরবাজ। সেপ্টেম্বরে এশিয়া কাপে লাহোরে বিস্ফোরক এই ব্যাটসম্যানকে এক রানেই ফিরিয়ে দেন শরিফুল ইসলাম। এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে বাকি দুই ম্যাচেও হাসেনি গুরবাজের ব্যাটে। পাকিস্তানের বিপক্ষে পাঁচ ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে কেবল চার রান করেন তিনি। প্রস্তুতি ম্যাচ দিয়ে অবশ্য ছন্দে ফেরার আভাস দিয়েছেন আফগান তরুণ। গৌহাটিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলেছেন ৯২ বলে ১১৯ রানের ইনিংস। অধারাবাহিকতার মধ্যে বিধ্বংসী এই পারফরম্যান্স গুরবাজের জন্য হবে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার বড় রসদ।

গত আইপিএলে গুরবাজকে শুরু থেকে খেলায় কলকাতা নাইট রাইডার্স। দ্বিতীয় ম্যাচে ফিফটি করার পর টানা তিন ম্যাচে ব্যর্থ হন এই আফগান। পরে তাকে বসিয়ে লিটনকে সুযোগ দেয় কলকাতা। ভারতের ঘরোয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে প্রথমবার খেলতে নেমে লিটন ছিলেন একেবারেই নিষ্প্রভ। মাত্র চার রান করেন তিনি। পরে উইকেটের পেছনে গ্লাভস হাতেও গড়বড় করেন লিটন, মিস করেন দুটি স্টাম্পিং, যেখানে একটি ছিল একেবারেই সহজ। এরপর আর একাদশে সুযোগ পাননি লিটন। আসরে ১১ ম্যাচ খেলে দুই ফিফটিতে ২২৭ রান করেছেন গুরবাজ। এই আফগানের সামনে বিশ্বকাপে ভালো খেলে নিজের সামর্থ্য আরও একবার দেখানোর জেদ কাজ করতেই পারে লিটনের ভেতরে। চাপ সামলে বৈশ্বিক আসরে নিজেকে কে কতটা মেলে ধরতে পারেন, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।