বাংলাদেশের যে কজন প্রতিভাবান আলেম সৌদি আরবে দীনের খেদমত করে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছেন, তন্মধ্যে ড. মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মাক্কী অন্যতম। তিনি মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববি বিষয়ক জেনারেল প্রেসিডেন্সির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত পবিত্র হজে আরাফাতের ময়দানের খুতবা, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা, দুই ঈদের খুতবা এবং বায়তুল্লাহর সব ধরনের খুতবা ও দারসের লাইভ বাংলা অনুবাদ ও উপস্থাপনাসহ বেশ কিছু মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত।
মেধাবী এই আলেম চাঁদপুর জেলার হাইমচর উপজেলাধীন গাজীপুর ইউনিয়নের বাজাপ্তী গ্রামে ১৯৭২ সালের ১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯২ সালে মেঘনা নদীর ভাঙনে তাদের বাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেলে পরিবারসহ কুমিল্লা শহরের শাসনগাছায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
ড. মুহাম্মদ খলিলুর রহমান ছোটবেলা থেকেই নিজ মেধা ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে মহান আল্লাহর অসীম দয়ায় পড়াশোনার প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে পার করেন। তিনি পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলসহ ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করেন। তিনি কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার উপজেলাধীন দেশসেরা দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঐতিহ্যবাহী ধামতি ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে ১৯৮৬ সালে দাখিল পরীক্ষায় মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সম্মিলিত মেধা তালিকায় ১৩তম স্থান, ১৯৮৮ সালে আলিম পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান, ১৯৯০ সালে ফাজিল পরীক্ষায় প্রথম স্থান এবং ১৯৯২ সালে কামিল পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এ মাদ্রাসায় তিনি দেশবরেণ্য মুহাদ্দিসদের কাছে ইলমে হাদিস শিক্ষা লাভ করার সুযোগ পান। তাদের অন্যতম হলেন মাওলানা ছফিউল্লাহ মুসাপুরী (রহ.), মাওলানা মুহাম্মদ ইসমাইল টুমচরী (রহ.) ও মাওলানা ফজলুল করীম।
কামিল পাস করার পর তিনি নওগাঁ নামাজগড় গাউছুল আজম বহুমুখী আলিয়া মাদ্রাসায় হেড মুহাদ্দিস হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে উচ্চতর ডিগ্রি লাভের জন্য পবিত্র মক্কা মোকাররমা চলে যান। ওই সুবাদে তিনি অদ্যাবধি পবিত্র বায়তুল্লাহ শরিফের প্রতিবেশী হিসেবে সেখানে অবস্থান করছেন। মক্কায় বিশ্বসেরা উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ লাভ করেন। খুব ছোটবেলা থেকেই ড. মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মাক্কী পড়াশোনাতে ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। সৌদি আরবে পড়াশোনা করার সময়ও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। প্রতিটি পরীক্ষায় তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হন। বিএ অনার্স পরীক্ষায় আরবি ভাষা ও সাহিত্য অনুষদে তিনি সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এ জন্য মক্কার গভর্নর তাকে বিশেষ পুরস্কারে পুরস্কৃত করেন। তারপর উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি শায়খ ড. মুহাম্মদ আলী দাগরীরি, শায়খ ড. শরীফ মুহাম্মদ আন-নাজ্জার ও শায়খ ড. আবদুল্লাহ নাছের আল-কারনী প্রমুখ বিশ্ববিখ্যাত উস্তাদদের কাছ থেকে শিক্ষা অর্জনের সুযোগ লাভ করেন। এছাড়া শায়খ ড. আবদুর রহমান আস-সুদাইসসহ পবিত্র মসজিদে হারামের সম্মানিত ইমামদের দারসে বসার সৌভাগ্যও অর্জন করেন।
বহুমাত্রিক মেধা ও মননের অধিকারী এই আলেম দীর্ঘ ১০ বছর ধরে সৌদি সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে সৌদি আন্তর্জাতিক বেতারের বাংলা বিভাগে সংবাদ পাঠ, অনুবাদ, অনুষ্ঠান গ্রন্থনা ও উপস্থাপনাসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া হারামাইন শরিফাইনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ, ঘোষণা, বিজ্ঞপ্তি ও তথ্যসমূহের বাংলা অনুবাদ ও উপস্থাপনাসহ বেশ কিছু মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত তিনি।
নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি লেখালেখিও করেন তিনি। ‘কিসসাতু মক্কা’ নামে একটি বিখ্যাত আরবি গ্রন্থের অনুবাদ করেছেন।
ইসলামি ও জেনারেল শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত ছয় ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। এছাড়া তার দুই বোন রয়েছে। তার স্ত্রী বর্তমানে মক্কা উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়া অনুষদে পিএইচডি গবেষণার শেষ পর্যায়ে রয়েছেন। তার পাঁচ সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়া অনুষদে অনার্স কোর্সে অধ্যয়ন করছে, বড় ছেলে ঢাকা কলেজে এবং ছোট ছেলে ও দুই মেয়ে সৌদি আরবের জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনা করছে।