অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায়ে রেখে নির্বাচনের নিশ্চয়তা একা আওয়ামী লীগ দিতে পারবে না। তবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার অঙ্গীকার সরকারের রয়েছে। এজন্য নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতাও করবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের সঙ্গে বৈঠকে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিরা এসব কথা বলেছেন।
গতকাল সোমবার দুপুরে বনানীর একটি হোটেলে ঢাকা সফররত যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলের সদস্যদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলের সদস্যদের বৈঠক হয়। বৈঠকে শর্ট র্টামে ফ্রি-ফেয়ার, ইনক্লুসিভ অ্যান্ড পিসফুল নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগ কী করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র প্রাক-পর্যবেক্ষক দলের এ প্রশ্নে আওয়ামী লীগ প্রতিনিধিদলের সদস্যরা আরও বলেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রেখে নির্বাচন আয়োজনের পুরো ব্যাপারটা আওয়ামী লীগের হাতে নেই। পর্যবেক্ষক দল জানতে চেয়েছে, অ্যাডজাস্টমেন্টে, কম্প্রোমাইজ করার কোনো সুযোগ আওয়ামী লীগের হাতে রয়েছে কি না? জবাবে ক্ষমতাসীন দলের
প্রতিনিধিরা বলেছেন, সে সুযোগ বিএনপি খোলা রাখেনি। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপিকে নির্বাচনকালীন সরকারে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছিল। তারা সেটা প্রত্যাখ্যান করেছে। এখন তো বিএনপি সংসদেও নেই। পদত্যাগ করেছে তারা। বিএনপির দাবি তো অসাংবিধানিক। ফলে অ্যাডজাস্টমেন্টের পথ খোলা নেই। তবে সাংবিধানিকভাবে তাদের কোনো দাবি থাকলে সেই সুযোগ বিএনপি পাবে।
ইনক্লুসিভ ও পিসফুল নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সরকার দলের প্রতিনিধিরা বলেন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগ চেষ্টা করতে পারে। তবে এর জন্য বিএনপিসহ অন্য দলগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। আওয়ামী লীগ সব দলকে নিয়ে নির্বাচন করতে চায়। তবে পৃথিবীতে কোনো দেশেই শতভাগ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয় না। পৃথিবীতে অনেক দেশেই অনেক রাজনৈতিক দল আছে, নির্বাচন করার সক্ষমতা তাদের থাকে না।
সরকারি দলের প্রতিনিধিরা আরও বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায়ে রেখে নির্বাচন করতে চাই। আমরা তো রুলিং পার্টি। আমরা কেন শান্তিপূর্ণ ভোটের পরিবেশ নষ্ট করব। বিএনপি নির্বাচন করতে দেবে না ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন বানচাল করতে চায়। ভায়োলেন্স করতে চায়। তেমন পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন করা পুরোপুরি আওয়ামী লীগের হাতে আর থাকে না। তখন কিছু করার থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধিদলকে আরও বলা হয়, কোনো দলকে নির্বাচনে আসতে বাধ্যও করতে পারে না আওয়ামী লীগ।
প্রাক-পর্যবেক্ষক প্রতিনিধিদলকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সরকার ৮২টি সংস্কার করেছে গত ১৫ বছরে জানায় আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। এগুলোর মধ্যে ২০২২ সালে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আলাদা করা হয়েছে। এ সংস্কারের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করার জন্য সার্চ কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। আগে প্রধান নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিতে পারতেন, রাষ্ট্রপতি পরামর্শক্রমে। এ সংস্কারগুলো কেন করেছি লং টার্মে স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন দেখতে চাই বলে। সরকারের এ সংস্কারগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-পর্যবেক্ষক দল আওয়ামী লীগকে সাধুবাদ জানিয়েছে বলে দাবি করেন ক্ষমতাসীন দলের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা।
যুক্তরাষ্ট্র প্রাক-পর্যবেক্ষক দলের কাছে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা পরামর্শ চাইলে জবাবে তারা বলেন, পরামর্শ দেওয়া আমাদের কাজ নয়। আমরা পর্যবেক্ষণ করতে পারি, সহযোগিতা করতে পারি। বাকি কাজ এ দেশের জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর।
সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সরকার যা যা করেছে তা তুলে ধরা হয়েছে দাবি করে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা আরও বলেন, বিএনপি যেটা চায় তাদের ক্ষমতায় বসানো, সেটা আওয়ামী লীগ করতে পারবে না। তবে সংবিধানসম্মতভাবে কোনো প্রস্তাব বিএনপির পক্ষ থেকে করা হলে সে ব্যাপারে আওয়ামী লীগ তাদের সুযোগ দেওয়ার মানসিকতা পোষণ করে। সংবিধানবহির্ভূত কোনো কিছু নিয়ে বিএনপির সঙ্গে কোনো ধরনের কম্প্রোমাইজ কখনই হবে না। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের পর্যবেক্ষক দল বিএনপির বেআইনি ও অসাংবিধানিক দাবির ব্যাপারে আওয়ামী লীগকে কিছুই বলেনি উল্লেখ করেন তারা।
বিএনপি সমঝোতা-আপসের কোনো পথ খোলা রাখেনি : আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার জায়গা নেই। বিএনপি সমঝোতা-আপসের কোনো পথ খোলা রাখেনি। বিএনপির দাবি সংবিধানসম্মত নয়। সংবিধান লঙ্ঘন করে তো আমরা সমঝোতা করব না। সফররত যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক নির্বাচনী প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।
বৈঠকে বিএনপির দাবির বিষয়টি এসেছে জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, তারা জানতে চেয়েছে কম্প্রোমাইজ ও অ্যাডজাস্টমেন্টের (সমঝোতা ও আপসের) মাধ্যমে সমাধান খুঁজে পাওয়া যায় কি না। আমরা বলেছি, কম্প্রোমাইজ ও অ্যাডজাস্টমেেেন্টর জন্য স্পেস থাকতে হয়। সেই স্পেস বিএনপি রাখেনি, ব্লক করে দিয়েছে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, প্রথমত বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো মৃত একটি ইস্যুকে সামনে এনেছে। তাদের এক দফা প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ, সংসদ বিলুপ্তি, নির্বাচন কমিশন বাতিল করতে হবে। এসব দাবির মুখে কীভাবে কম্প্রোমাইজ হবে। বিএনপি বা বিরোধী দলের যেসব দাবি রয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিনিধিদল একটি কথাও বলেনি।
বিএনপির দাবি সংবিধানসম্মত নয় জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, আমি সূচনা বক্তব্যেই জানিয়ে দিয়েছি, গণতন্ত্র এমন একটি বিষয় যেখানে কম্প্রোমাইজ ও অ্যাডজাস্টমেন্টের সুযোগ থেকেই যায়। কিন্তু বিএনপির দাবি তো সংবিধানসম্মত নয়। সংবিধান লঙ্ঘন করে। আমরা কম্প্রোমাইজ, অ্যাডজাস্টমেন্ট করব না। বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ চায়। প্রতিনিধিদলকে জিজ্ঞেস করেছি, কেন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করবে? তিনি কি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন? জনগণের ঢল নেমেছে, রাস্তায় প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় নিতে হবে।
আওয়ামী লীগ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কীভাবে চায় সেটি প্রতিনিধিদলকে ব্যাখ্যা করেছে জানিয়ে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতির কাছে যে অঙ্গীকার সে বিষয়েও প্রতিনিধিদলকে বলেছি। তারা আমাদের মনোভাব জানতে চেয়েছে, আমরা কী করতে চাই, কেমন নির্বাচন চাই, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কীভাবে দেখছি।
ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপি যেসব অভিযোগ প্রতিনিধিদলের কাছে করেছে, তার জবাব দিয়েছি। বিএনপি সভা-সমাবেশে ভুল তথ্য দেয়, মিথ্যাচার করে, আইনের ভুল ব্যাখ্যা দেয় সে ব্যাপারে আমাদের সঠিকতা তুলে ধরেছি। আমরা কারও বিরুদ্ধে কিছু বলতে চাই না। কিন্তু দেশে এমন গুজব, মিথ্যাচার চলছে যে, ক্ষমতাসীন দল হিসেবে জবাব দিতে হয়।
বৈঠকে আওয়ামী লীগের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এ ছাড়া অংশ নেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদ, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক সেলিম মাহমুদ ও কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আলী আরাফাত।