মশা মেরে কি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব?

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েই চলেছে। ২০০০ সালে দেশে ঢাকায় প্রথম ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এরপর থেকে প্রতিবছরই ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা গেছে, যা সময়ের সঙ্গে বেড়েই চলেছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকা সিটি করপোরেশন থেকে প্রতিবছরই কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে তা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে খুব একটা কার্যকর হয়নি। এবার তো ডেঙ্গু প্রত্যন্ত অঞ্চলেও আশঙ্কাজনকভাবে বিস্তার লাভ করেছে।

কীটতত্ত্ববিদ ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মশাবাহিত ডেঙ্গু ভাইরাস মূলত দুভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব, এডিস মশা নির্মূল করা অথবা এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো টিকা আবিষ্কার করা। গত দুই যুগে মশা সহনীয় পর্যায়ে না রাখতে পারায় ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও আক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। অন্যদিকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুর কোনো টিকার প্রয়োগ দেশে হয়নি।

গবেষকরা বহু বছর ধরে ডেঙ্গু ভাইরাসের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর টিকা আবিষ্কারের চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। ২০১৯ সালে বিখ্যাত ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি সানোফির আবিষ্কৃত ডেনভ্যাকসিয়া নামে একটি ডেঙ্গু টিকা যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অনুমোদন পায়।

তবে সম্প্রতি ডেঙ্গু প্রতিরোধে নতুন একটি টিকার দ্বিতীয় ধাপের সফল ‘ট্রায়াল’ হয়ে গেছে বাংলাদেশে। টিভি-০০৫ নামের এই টিকার একটি ডোজই সব ধরনের ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। এই টিকা বাজারে আনতে বেশ কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। অন্যদিকে জাপানের তৈরি ডেঙ্গু প্রতিরোধী টিকা ‘কিউডেঙ্গা’ ব্যবহারের ছাড়পত্র দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে টিকার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন স্বাস্থ্য খাত-সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, একটি আন্তর্জাতিক মানের টিকা উৎপাদনকেন্দ্র চালু করা সম্ভব হলে অন্য দেশের কাছ থেকে উচ্চমূল্যে টিকা কিনতে হবে না। ডেঙ্গুসহ অনেক রোগের টিকা দেশেই তৈরি করা সম্ভব হবে। এতে সরকার যেমন স্বল্পমূল্যে টিকা পাবে, একই সঙ্গে অন্য দেশে রপ্তানি করেও বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে। ডেঙ্গু টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করা এবং স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন ধরনের টিকা উৎপাদনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘গ্রামে ডেঙ্গু যাওয়ায় আতঙ্ক বেড়েছে। সেখানে সিটি করপোরেশন নেই, লজিস্টিকস (যন্ত্রপাতি) নেই, দক্ষ লোকবল নেই। এটি আমাদের শঙ্কিত করছে যে, ডেঙ্গুটা সারা দেশে স্থায়ী হয়ে গেল কি না। টিকার ম্যাস ভ্যাকসিনেশন (গণহারে টিকাদান) করা গেলে সেটি কার্যকর হবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় যদি ডেঙ্গুর ভ্যাকসিনেশন করা সম্ভব হয়, সেটি অত্যন্ত ভালো হবে। লক্ষ রাখতে হবে টিকা যেন একেবারে প্রান্তিক পর্যায়েও পৌঁছায়। এজন্য সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। বিদেশি টিকার দাম যেহেতু বেশি, নিজেরা উৎপাদন করতে পারলে তা ভালো হতো। তবে ডেঙ্গুর টিকার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে।’