যেন ২০০ কোটির ময়লার ভাগাড়

উদ্বোধনের আগেই সৌন্দর্য হারিয়েছে নারায়ণগঞ্জ শহরের ঐতিহ্যবাহী বাবুরাইল খাল। পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে। গত বছর সিটি করপোরেশন খালটির সৌন্দর্যবর্ধন ও উন্নয়নকাজ সমাপ্ত হয়েছে ঘোষণা দিলেও এক বছর যেতে না যেতেই ময়লা-আবর্জনায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে দুর্গন্ধে পরিবেশ দূষিত হওয়ার পাশাপাশি মশার প্রজননকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এজন্য সঠিক তদারকির অভাব এবং স্থানীয় মহিলা কাউন্সিলরকে দায়ী করেছেন সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও এলাকাবাসী।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা বাবুরাইল খালটি শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ধলেশ্বরী নদী পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার বিস্তৃত একটি সংযোগ খাল। একসময় বাবুরাইল খাল হয়ে পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী নৌকা ম-লপাড়া, বউবাজার ও জিমখানা ঘাটে অবস্থান করত। এ খালটি স্থানীয় লোকজনের দৈনন্দিন গোসল, সাঁতার, মাছ ধরাসহ বিভিন্ন ধরনের বিনোদনের স্থান ছিল। এ ছাড়া তৎকালীন সময়ে খালের পানি দিয়ে গৃহস্থালি কাজকর্ম সম্পন্ন করা হতো। মানুষের দৈনন্দিন পানির চাহিদা পূরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করত ঐতিহ্যবাহী এই বাবুরাইল খাল। পরে নব্বই দশকের পর অবৈধ দখল, দূষণ ও নদীর নাব্য হ্রাসের ফলে বাবুরাইল খালটি বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়। প্রতিনিয়ত মানুষের বর্জ্য ফেলার কারণে খালটি ডাম্পিং স্থানসহ মশা-মাছির প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়।

২০১৪-১৫ সালে খালটি পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বাবুরাইল খাল পুনরুদ্ধারসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও শোভাবর্ধন ও আলোকিতকরণ (শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ধলেশ্বরী নদী পর্যন্ত) প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে বিশ্বব্যাংকের কাছে প্রস্তাব পাঠায়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে ১৯৫ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়।

এ প্রকল্পের আওতায় ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার রাস্তা, ৫ দশমিক ৫০ কিলোমিটার আরসিসি ড্রেন, ফুটপাত (প্রস্থ ৬ দশমিক ৫ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত), ১০টি আরসিসি গার্ডার ও সøাব ব্রিজ, ৫টি মেটাল ফুট ব্রিজ, ৩টি আরসিসি ভিউইং ডেক, ১টি আরসিসি ঘাটলা ও ১টি পাবলিক টয়লেট এবং ফুটপাতে স্ট্রিট লাইট অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে।

বলা হয়েছিল, বাবুরাইল খালটি নগরীর পরিবেশ উন্নয়নসহ নগরবাসীর দীর্ঘদিনের খোলামেলা পরিবেশের চাহিদা পূরণ করবে। এ ছাড়া খালটি অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণের জন্য সংরক্ষিত জলাধার (রিটেনশন পুকুর) হিসেবে কাজ করবে। অন্যদিকে অগ্নিকা- নির্বাপণের জন্য পানি সরবরাহের একমাত্র প্রধান উৎস হিসেবে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। বাবুরাইল খালটি সংরক্ষণ ও সংস্কারের মাধ্যমে নগরবাসীর একঘেয়েমি জীবনযাপন পরিবর্তন ও প্রাণোজ্জ্বল করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এই লক্ষ্যে দখলদার উচ্ছেদ এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পর ২০২২ সালে কাজ সম্পন্ন করে সিটি করপোরেশন। বর্তমানে পার্কটি উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করা বাবুরাইল খালটির অধিকাংশই ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। উদ্বোধনের আগেই খালটিতে আবারও আবর্জনার স্তূপ জমে গেছে। কেউ কেউ ব্যবহার করছে ময়লা ফেলার

স্থান হিসেবে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছয় বছর আগে এই খাল দখলমুক্ত ও বর্জ্য অপসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করে সিটি করপোরেশন। কিন্তু ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করা প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন হলেও উদ্বোধনের আগেই আবার আগের জায়গায় ফিরে যাচ্ছে। কাশীপুরের বাংলাবাজার অংশে খালের ওপর ময়লা-আবর্জনা ও পলিথিন ফেলে রাখা হয়েছে। পানিতে দুর্গন্ধে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। সেই সঙ্গে মশার প্রজননকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে খালটি। খালের ম-লপাড়া অংশ কিছুটা স্বচ্ছ থাকলেও বাকি অংশের প্রায় পুরোটাই ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়।

এ ব্যাপারে কাশীপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও বাংলাবাজার এলাকায় বাসিন্দা মো. আইয়ুব আলী বলেন, খাল পুনরুদ্ধার হয়েছে ঠিকই। কিন্তু ময়লা ফেলার সুনির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় মানুষ সেই খালেই ময়লা ফেলছে। খাল পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গে ময়লা ফেলার সুনির্দিষ্ট জায়গা ও মানুষকে সচেতন করার পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। খালটি পরিচ্ছন্ন রাখার শর্তে মাছ ছাড়ার অনুমতি পেয়েছেন স্থানীয় সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর বিভা হাসান।

এ বিষয়ে জানতে স্থানীয় সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর বিভা হাসানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

সিটি করপোরেশনের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. রিয়াদ হাসান বলেন, ‘বাবুরাইল খালটি অনেক টাকা ব্যয় করে সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়েছে। খালটি পরিচ্ছন্ন রাখার শর্তে মাছ ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যে মাছ ছাড়ে সে পরিষ্কার রাখছে না। ফলে খালটি সৌন্দর্য হারাচ্ছে। পরিষদের সভায় বিষয়টি উত্থাপন করে প্রতিকার আমি চাইব।’