অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার

প্রসবের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় কয়েক ধাপে। প্রতিটি ধাপেই প্রসূতি নারীর শারীরিক কিছু পরিবর্তন দেখা দেয়। একই সঙ্গে ‘প্রসব’ মানসিকভাবেও মায়ের জন্য একটি স্পর্শকাতর সময়। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’ বলছে, বাংলাদেশে গত দুই বছরে শিশু জন্মের ক্ষেত্রে সিজারিয়ানের হার বেড়েছে ৫১ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান ৫ বছর আগের। বর্তমানে নিশ্চিতভাবেই, এর পরিমাণ আরও বেড়েছে। বিষয়টিকে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার উল্লেখ করে সংস্থাটি বলছে, এতে বাবা-মায়ের সন্তান জন্মদানে ব্যাপক পরিমাণে খরচের ভার বহন করতে হচ্ছে। শিশু জন্মে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের ফলে ইনফেকশন ও মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, অঙ্গহানি, জমাট রক্ত ইত্যাদির কারণে মায়েদের সুস্থতা ফিরে পেতে প্রাকৃতিক প্রসবের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগে। এ ছাড়া সিজারিয়ানের কারণে প্রাকৃতিকভাবে জন্মের উপকারী দিকগুলোও নষ্ট হতে পারে। শিশু মায়ের প্রসবের পথ দিয়ে যদি স্বাভাবিকভাবে বের হয়, তাহলে তার শরীর কিছু ভালো ব্যাকটেরিয়া গ্রহণ করতে পারে। এসব ব্যাকটেরিয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। অস্ত্রোপচারের ফলে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিশু না যাওয়ার ফলে ভালো ব্যাকটেরিয়াও সে পায় না। এ ছাড়া মায়ের বুকের দুধ পান করার জন্য মায়ের সঙ্গে শিশুর যে শারীরিক নৈকট্য দরকার,  সিজারিয়ান হলে সেটি প্রয়োজনের তুলনায় দেরিতে হয়।  সিজারিয়ানে সন্তান জন্মদানের হার দেশের বেসরকারি হাসপাতালে মারাত্মক হারে বেশি। এসব হাসপাতালগুলোতে যত শিশু জন্ম নেয়,  তার প্রায় ৮০ শতাংশই হয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। দেশে প্রসবকালীন অস্ত্রোপচার বর্তমানে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। 

আমাদের দেশে সিজারিয়ান বন্ধ করে, স্বাভাবিক প্রসবকে উৎসাহিত করার জন্য কোনো সরকার কখনো তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে নগরজীবনে এমন একটি ধারণা প্রায় গেড়েই বসেছিল সন্তান জন্মদান মানেই সিজার। যে কারণে দেশের উচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছে অপ্রয়োজনীয় সিজার রোধে নীতিমালা চূড়ান্ত করে ছয় মাসের মধ্যে তা কার্যকর করার। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে শুক্রবার ‘নীতিমালাই আইন হলো সিজারিয়ানে’ প্রতিবেদনে বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে। সন্তান জন্মদানে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার রোধে নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দেয় হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের নির্দেশসহ রুল দেয় আদালত। রুলে যেসব হাসপাতাল ও ক্লিনিক সন্তান জন্মদানে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিবাদীদের ব্যর্থতা ও নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ও বেআইনি নয়, তা জানতে চায় হাইকোর্ট। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ সচিব, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সভাপতি এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। এর ধারাবাহিকতায় নীতিমালাটি হাইকোর্টে দাখিল করা হয়। এতে সন্তান জন্মদানের পদ্ধতিতে যে দুর্বলতা আছে তার পর্যালোচনা করে পরিবর্তন আনা, অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার ও স্বাভাবিক প্রসবের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চিকিৎসকদের নৈতিক মানের উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের আইনি সুরক্ষার কথা বলা হয়।

ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া তথ্যে জানাচ্ছেন কোনো দেশে এ ধরনের অস্ত্রোপচার ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমাদের দেশে এ হার সরকারিভাবে ৩১ শতাংশ আর বেসরকারিভাবে ৮৩ শতাংশ। এর বড় কারণ, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর লোভ। তিনি বলেন, নীতিমালাকে রায়ের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। এখন থেকে সংবিধান অনুযায়ী এ নীতিমালা আইনের মর্যাদা পেয়েছে।

বিশ্বব্যাপী চিকিৎসক ও গবেষকরা যখন সন্তান জন্ম দিতে সিজারিয়ান বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে চলেছেন, চীন সেসময় সফলভাবে এ হার কমিয়ে আনতে পেরেছে। চীনে সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেওয়ার প্রবণতা কমে আসার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। মাতৃস্বাস্থ্য খাতে চীনের ব্যাপক বিনিয়োগ, শহরাঞ্চলে মধ্যবিত্তের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, সিজারে উদ্বুদ্ধ করলে শাস্তির ব্যবস্থা এবং হাসপাতালে সিজার করতে ইচ্ছুক মায়েদের একেবারে শেষ পর্যায়েও নিরুৎসাহিত করেন চিকিৎসক ও নার্সরা। আর আমাদের দেশে সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বাইরে গিয়ে জনস্বাস্থ্য বা জনকল্যাণের চিন্তা করতে হয় আদালতকে! এর চেয়ে দুঃখজনক বিষয় আর কী হতে পারে?