সায়নের বয়স পাঁচ বছর হতে আরও এক মাস বাকি। মা অস্থির হয়ে উঠলেন তার লেখাপড়া নিয়ে। বাবা বলেছিলেন, পরের বছর থেকে শুরু হোক ইশকুল। মা মানতে নারাজ। বর্ণমালা শেখানো প্রায় শেষ। ইংরেজি অক্ষরগুলোও সে পড়ে ফেলতে পারে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। কাজেই কিছুতে আর দেরি নয়। এ বছরই তার লেখাপড়া শুরুর আসল বয়স।
সায়নের জন্য ফুটবলের ছবিঅলা একটি চমৎকার ব্যাগ কিনে আনলেন মা। ব্যাগের সঙ্গে এক ডজন পেনসিল, কালার পেনসিলসহ হাতিঘোড়ার রাবারও কিনলেন মার্কেট থেকে। হাতিঘোড়ার রাবার দেখে সায়ন আনন্দে আত্মহারা।
সায়নের বাবার নটায় অফিস। মা রোজ আটটায় ঘুম থেকে উঠে বাবার জন্য নাশতা তৈরি করেন। বাবা খোশমেজাজে নাশতা খেয়ে অফিসে যান। সায়ন তখন দিব্যি ঘুমে মজে থাকে। সে নটার আগে কখনো ঘুম থেকে উঠতে পারে না।
মা আজ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়লেন। জানালার একটি কপাট খুলে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে এক মুঠো ঠা-া বাতাস ভেতরে ঢুকে পড়ল। শীতের পরশে মা’র শরীরটা আচমকা দুলে উঠল।
এখনো দু-চারটে কাক ডেকে যাচ্ছে গাছগাছালির ডালে আবডালে। কুয়াশা চাদর বিছিয়ে রেখেছে সবুজাভ বিছানায়। মা সায়নের পাশে এসে দাঁড়ালেন। সায়ন দু’চোখ বুজে ঘুমুচ্ছে। মা ওর কাছাকাছি এসে নরম করে ডাকলেন, সায়ন সায়ন....।
মায়ের ডাকে সায়নের কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না। ও আগের মতোই বুকে বালিশ জাপটে শুয়ে আছে। মা ওর কম্বলটা টেনে একপাশে করল, পাঁজাকোলা করে ওকে বসিয়ে দিল। সায়ন এক হাতে চোখ কচলে মায়ের মুখের দিকে তাকাল। মা বললেন, ওঠো ওঠো। ইশকুলে যাবে। আজ ইশকুলের প্রথম দিন।
মা সায়নকে দুই হাতে ধরে ওয়াশরুমে নিয়ে গেলেন। চোখেমুখে কয়েকবার পানির ছিটা মেরে দিলেন। পানির ছিটায়ও তার ঘুমের ঘোরটা একটুও কাটল না।
মা ওকে দ্রুত ইশকুলের পোশাক পরিয়ে দিলেন। শার্ট-প্যান্ট চারদিকে টেনেটুনে দিলেন এবং মনে মিটি মিটি হাসতে থাকলেন।
সায়ন কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, আমি ইশকুলে যাবো না আম্মু।
মা অবাক হয়ে বললেন, ইশকুলে যাবে না মানে? তুমি নিজের দিকে তাকাও। কী সুন্দর নতুন ড্রেস। কী সুন্দর লাগছে তোমাকে। আজ তো ইশকুলের প্রথম দিন। এই ইশকুল কিছুতেই মিস করা যাবে না সায়ন।
সায়ন বুঝতে পারল মা নাছোড়বান্দা। তাকে ইশকুলে নিয়ে যাবেই। অগত্যা সে হাঁটতে থাকল।
ফকিরগলির মোড়ে এসে সায়ন থমকে দাঁড়াল। মোড়ে একটি নতুন বেকারি দোকান। বাইরে পোলার আইসক্রিমের বিরাট ফ্রিজ। ফ্রিজের আশপাশে সকালের রোদ পড়ায় ওটা ঝিকমিক ঝিকমিক করছে।
মা থতমত খেয়ে বললেন, দাঁড়ালে কেন বাবা? আমাদের হাতে সময় কম। পাঁচ মিনিটে ইশকুলে পৌঁছাতে হবে।
আমি আইসক্রিম খাবো আম্মু।
আইসক্রিম খাবে? ঠান্ডার মধ্যে কেউ আইসক্রিম খায়?
আমি খাবো। চকলেট আইসক্রিম কিনে দাও। আইসক্রিম না দিলে আমি ইশকুলেই যাবো না।
মা হঠাৎ কোনো দিশকুল পান না। এমনিতে একটুখানি ঠা-ায় সায়নের খুকখুক কাশি শুরু হয়। নাক দিয়ে পানি বের হতে থাকে। এই সাতসকালের আইসক্রিমটা তাকে দ্রুত কাহিল করে ফেলবে। কিন্তু প্রথম দিনের ইশকুলটাও অতীব জরুরি। ইশকুল মিস হলে ম্যাডামদের কাছে একেবারে পাতা হয়ে যাবেন তিনি।
ত্রিশ টাকা দিয়ে একটা চকলেট আইসক্রিম কিনলেন মা। আইসক্রিম হাতে পেয়ে মহা উল্লাসে হাঁটতে থাকে সায়ন।
ইশকুলের প্রথম দিন বলে ছাত্রছাত্রীদের নতুন নতুন বই দিলেন ম্যাডামরা। একেবারে ঝকঝক করছে বইয়ের কভার। নতুন বই পেয়ে একটানা হইচই করছে ছেলেমেয়েরা। সায়নকেও তিনটে নতুন বই দিলেন আফসানা ম্যাডাম। তাকে কাছে টেনে চুলে আঙুল ডুবিয়ে আদরও করে দিলেন হেসে হেসে।
এক ঘণ্টা পরে ভেতর থেকে বের হয়ে এলো সায়ন। তার পিঠে বল-ব্যাগটি ঝুলে আছে। এখন তার চেহারায় বিষাদের ছায়া-টায়া আর নেই। মা একটু নিচু হয়ে তাকে বুকে টেনে নিলেন। মায়ের জীবনটা যেন আজ পুরোটাই সার্থক হয়ে গেল।
গলির মোড়ে এসে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল সায়ন। পোলার আইসক্রিমের বিরাট ফ্রিজের দিকে একমনে তাকিয়ে আছে সে। মা তাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইলেন, কিন্তু পারলেন না।
আম্মু আইসক্রিম খাবো। দুধমালাই আইসক্রিম।
বুকটা আচমকা কেঁপে উঠল মায়ের বুক। একটা দুধমালাই আইসক্রিমের দাম অনেক। পঞ্চাশ টাকার নিশ্চয় কম হবে না। ত্রিশ আর পঞ্চাশ মিলে আশি টাকা। সারাদিন পড়ে আছে সামনে। কিছুর সঙ্গে কিছুই মেলাতে পারেন না মা।
যা ভেবেছিলেন তাই। মালাই আইসক্রিমের গায়ে দাম লেখা আছে। মাত্র পঞ্চাশ টাকা। তারপরও মনের কষ্ট সামলে মা একটা দুধমালাই আইসক্রিম কিনে সায়নের হাতে দিলেন। আইসক্রিম পেয়ে সায়ন আনন্দে লাফাতে থাকল।
রাতে সায়নের বাবাকে সবকিছু খুলে বললেন মা। তাদের সামনে বিরাট একটা খরচ বটগাছের মতো দাঁড়িয়ে গেছে। মাকে অভয় দেন বাবা। সাহস দেন নতুন কিছুর। জীবনটা হলো হাতের এপিঠ-ওপিঠের মতো। আকাশের কালো মেঘও একসময় সরে যায়। আকাশে রোদ ওঠে। ঝলমলে ফকফকা হয়। আকাশও হাসে।
সকালে সায়ন কখন ঘুম থেকে উঠে পড়েছে মা-বাবা কেউ বলতে পারে না। ও ইশকুলের ড্রেস পরে রেডি হয়ে গেছে। বই-খাতা-কলম ঠিকঠাক মতো আছে কিনা ব্যাগ খুলে দেখলও যতœ করে। নাহ্, সব ঠিক আছে। মা বোধহয় রাতেই সবকিছু গুছিয়ে রেখেছে।
তুমি কখন উঠলে সায়ন? লাফ দিয়ে উঠে মা জিজ্ঞেস করল।
এই তো একটু আগে, সায়ন বলল।
দাঁড়াও দাঁড়াও। আমি রেডি হয়ে নিচ্ছি। আমিও তোমার সঙ্গে যাবো।
আমি একা যেতে পারবো আম্মু।
একা যাবে? কীভাবে যাবে?
আমি পারবো। কাল যেভাবে গিয়েছি সেভাবেই যাবো। মোড় থেকে সোজা ডানে। একদম ভুল হবে না আম্মু।
নাশতা খাবে না?
জ্যাম লাগিয়ে দুই পিস রুটি নিয়েছি। খিদে লাগলে খাবো।
মা ব্যাগ থেকে কিছু টাকা বের করে বললেন, টাকাগুলো রাখো, খিদে লাগলে খাবে।
টাকা লাগবে না আম্মু। আমি তো দশটায় ফিরে আসব। তুমি এত টেনশন করছ কেন?
সায়ন দ্রুত পা ফেলে বড় রাস্তায় উঠে গেল। কাল রাতে বাবা-মা যখন ফিসফিস করে কথা বলছিল সব কথাই শুনতে পেয়েছিল সে। আইসক্রিমের আশি টাকার জন্য মা কতই-না বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলছিল। আর কোনো দিন আইসক্রিম খাবে না সায়ন। আর কোনো দিন বাবা-মাকে কষ্ট দেবে না সে।
ওই যে সায়নের ইশকুল দেখা যাচ্ছে। একটু পরেই সে ইশকুলে পৌঁছে যাবে।