কাল পেরিয়ে দুর্গাপূজা

মহালয়ার ঢাক বেজে গেছে। আর কদিন পর মর্ত্যে নেমে আসবেন দেবী দুর্গা। তখন শারদীয় মহোৎসবে মেতে উঠবেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। এ উৎসবের অতীত ও বর্তমান নিয়ে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মহা উৎসব দুর্গাপূজা। একে বলা হয়ে থাকে সর্বজনীন পূজা। সর্বজনীন বলতে বুঝায় সবাই মিলে। ইতিহাসবিদ ও গবেষক শ্রী যোগেশচন্দ্র রায় বলেছেন, তাদের সময় শব্দটা ছিল বারোয়ারি। বার শব্দটি সংস্কৃত। এর অর্থ সমূহ, সমূহ মিলে যে পূজা তা বার-আরি বা বারোয়ারি পূজা। তিনি বলছেন, একসময় কালীপূজাও ছিল বারোয়ারি। গ্রামের সবাই মিলে মহামারী থেকে রক্ষা পেতে এ ধরনের পূজা করত।

‘প্রথম’

গবেষকদের বিভিন্ন লেখা পড়ে জানা যায়, বিভিন্ন পুরাণ ও সাহিত্যে উল্লিখিত পূজার নানা ধরন ও রকম একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে রূপ নিয়েছে বর্তমানের বিভিন্ন আচার-উৎসবে। দুর্গাপূজার ইতিহাসও তাই। পূজা করার রীতি সবসময়ই ছিল বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জীবনে। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, বাংলায় ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে এবং সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে প্রথম দুর্গাপূজা পালিত হয়। এই ‘প্রথম’ দুর্গাপূজার আয়োজক হিসেবে সাধারণত তিনজনের নাম পাওয়া যায়। তারা হলেন বর্তমানে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের তাহিরপুরের রাজা কংশনারায়ণ, পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ার রাজা ভবানন্দ মজুমদার এবং বিখ্যাত সাবর্ণ চৌধুরী পরিবারের লক্ষ্ম ীকান্ত মজুমদার।

আদি

যদিও তার আগে থেকেই বিভিন্ন পুরাণ ও লেখায় দুর্গাপূজার মতো পূজার উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন চীনা পর্যটক হিউয়েন সাঙ-এর একটি ঘটনা প্রচলিত আছে। তিনি ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে ভারত ভ্রমণ শুরু করেন। ওই ভ্রমণের সময় একদিন তিনি গঙ্গা নদীতে পাল তোলা নৌকায় কোথাও যাচ্ছিলেন। এ সময় দস্যুরা তাকে আক্রমণ করে ও বন্দি করে। ওই দস্যুরা ছিল দুর্গার অনুগামী। তারা দেবীর জন্য হিউয়ান সাঙকে বলি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। হিউয়েন সাঙকে তারা বেঁধেও ফেলে বলি দিতে। হিউয়েন সাঙ ছিলেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি অবস্থায় ধ্যান শুরু করেন। দ্রুতই তিনি ধ্যানে মগ্ন হয়ে যান। আর তখন শুরু হয় এক প্রচণ্ড ঝড়। ঝড়ে ভয় পেয়ে যায় দস্যুরা। তারা তখন হিউয়েন সাঙকে ছেড়ে দেয়।

এ ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত না হলেও দুর্গা যে অনেক আগে থেকে বাঙলা অঞ্চলের পরিচিত দেবী তা বুঝা যায়। যেমন যোগেশচন্দ্রের মতে, মহাভারতের বিরাট ও ভীষ্ম পর্বে দুর্গার স্তব আছে। তিনি বলছেন, স্থান ও গোষ্ঠী ভেদে দুর্গাপূজায় ব্যতিক্রম দেখা যায়। যেমন একসময় কোথাও কোথাও সপ্তমীতে পশুবলি দেওয়া হতো। বিষ্ণুপুরের ময়রাজাদের বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাবে সেই পশুবলি উঠে যায়। তিনি জানাচ্ছেন, এক কায়স্থ জমিদারবাড়িতে অন্ন ও মাগুর মাছের ঝোল ভোগ দেওয়া হয়। এভাবে নানা স্থানে ভিন্ন ভিন্ন আচার পূজার অংশ হয়ে গেছে।

প্যানসিলভিনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক কুমকুম চট্টোপাধ্যায়ও বলছেন, ভারতীয় উপমহাদেশে দেবী পূজার ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। যা বৈদিক-ব্রাহ্মণ্য যুগেরও আগে থেকে প্রচলিত ছিল। সাধারণত এসব পূজা অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতো। এসব পূজায় দেখা যেত দেবী একজন যোদ্ধা। তিনি মহাশক্তিধর এবং কোনো দানবকে বধ করছেন। দেবীর উপাসক হিসেবে পাওয়া যায় তখনকার সমাজের প্রান্তে বসবাসকারী সম্প্রদায়কে।

দেবী দুর্গা

যোগেশচন্দ্রের মতে, দুর্গার ভাবনার মূল পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০-২৫০০ অব্দে। ঋগে¦দে যা বর্ণিত আছে। যাতে উল্লেখ আছে, দেবী দুর্গা বিশ্বচরাচরে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছেন পরমাণু থেকে বিশাল ব্রহ্মাণ্ডে। তার আদি ও অন্ত নেই। যার মধ্য নাই, যিনি চিন্তার অতীত, যেখানে দিক নেই, কাল নেই, তিনি যে শক্তির প্রকাশ, তাকেই দুর্গা বলে।

এই দেবী যে ‘মহিষমর্দিনী’ তা উল্লেখ আছে মার্কণ্ডেয় পুরাণে। সেখানে আছে, ইন্দ্র দেবতাদের রাজা। কিন্তু তাদেরসহ তিনি মহিষাসুরকে বধ করতে পারেননি। এরপর ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর ও ইন্দ্রসহ দেবতাদের শরীর থেকে এক এক তেজ নিঃসৃত হয়। সব তেজ মিলিত হয়ে পর্বতের মতো রূপ পায়। পরে সেই তেজ এক নারীর রূপ ধারণ করে। যিনি মহিষাসুরকে বধ করেন। সব দেবতার মিলিত রূপ ধারণ করে তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বশক্তি।

আচার্য যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির মতে, দুর্গাপূজা বৈদিক রুদ্রযজ্ঞের পরিবর্তিত রূপ। রুদ্রযজ্ঞের অগ্নিই দুর্গা। অন্যমতে বৈদিক যুগে শরৎকালে নতুন বছর গণনা আরম্ভ হতো। অনুমান করা হয়, এ নতুন বছরে রুদ্রযজ্ঞ সম্পন্ন হতো। তাই রুদ্রযজ্ঞের বিবর্তিত রূপ দেবীপূজা শরৎকালে অনুষ্ঠিত হয়। আবার কেউ কেউ বলেন, দুর্গাপূজা প্রাচীন শারদোৎসব। অম্বিকা দেবীর নাম দুর্গা। অম্বিকা বলতে শরৎ ঋতুও বোঝায়।

গবেষকরা বলছেন, দুর্গা বাঙালি হিন্দুর কাছে মাতৃরূপিনী এবং কন্যারূপিণী। দুর্গাকে ভাবা হতো ঘরেরই একজন সদস্য হিসেবে। অনেক দূরের কেউ নন তিনি। তবে তাকে ও তার সন্তানদের নিয়ে নানা কাহিনি চালু রয়েছে জনপরিসরে। এ অঞ্চলে দুর্গার আরেক নাম মৃন্ময়ী। মাটি থেকে তার রূপ তৈরি হয়। তাই তিনি মৃন্ময়ী।

পুরাণ মতে, বিষুবরেখা থেকে সূর্যের ক্রমশ উত্তরে যেতে সময় লাগে ছয় মাস। এই ছয় মাস দেবতাদের একদিনের সমান। দিনের বেলায় জাগ্রত থাকেন দেবতারা। শাস্ত্রের বিধান মতে, দিনেই দেবতাদের পূজা করতে হয়। আবার বিষুবরেখা থেকে সূর্যের দক্ষিণে যেতেও লাগে ছয় মাস।

একে দক্ষিণায়ন বলে। যা দেবতাদের একরাতের সমান। এ সময় দেবতারা ঘুমান। যে কারণে রাতে পূজা করার বিধান নেই শাস্ত্রে।

শরৎকাল হলো দক্ষিণায়ণের সময়। তাই শরৎকাল পূজার জন্য ‘অকাল’। অকালে দেবতার পূজা করতে হলে তাকে জাগাতে হবে। জাগানোর এ প্রক্রিয়াকে বলে ‘বোধন’। যে কারণে দুর্গাপূজার আরেক নাম ‘অকাল বোধন’।

বাংলাদেশে

বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার উথলী গ্রামে দুর্গাপূজার প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া যায়। বিভিন্ন তথ্যে জানা যায়, প্রাচীনকালে এক উন্নত সভ্যতা গড়ে উঠেছিল কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী উথলীতে। যদিও তখন ওই এলাকার নাম ছিল বুড়ন দ্বীপ। এ গ্রামে ১০৮টি কোঠাবাড়ির সমন্বয়ে একটি বসতি গড়ে ওঠে। সাড়ে তিনশ বছর আগে যেখানে শুরু হয় দুর্গাপূজা। একটি তালপাতায় ১১৭৬ বঙ্গাব্দের বাৎসরিক দুর্গাপূজার হিসাব আবিষ্কৃত হয়। সেখানে দেখা যায়, চার দিনের পূজায় মোট আট আনা খরচের কথা লিপিবদ্ধ রয়েছে। তবে উথলীর দুর্গাপূজার শুরু হয়েছিল তারও বহু আগে। প্রাচীন ভারতে ইতিহাসে মহাসামন্ত শশাঙ্ক বা তার আগেও এখানে দুর্গাপূজা হয়েছিল বলে মনে করছেন ইতিহাসবিদরা।

আধুনিক পূজা

সময়ের পরিবর্তনে দুর্গাপূজায় যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন অনুষঙ্গ। শুধু মণ্ডপ নির্মাণে নয়, দেবীর আকার এবং সাজসজ্জায়ও যুক্ত হয়েছে নতুন অনেক কিছু। যেমন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ডানকুনিতে মিলন সংঘ এবারের মণ্ড সাজিয়েছে নারী অধিকারকে মূর্ত করে।

দেখা যাচ্ছে, রাজধানীর খামারবাড়িতে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ, লাভ ফর নেচার’ এ স্লোগানকে উপজীব্য করে দুর্গাপূজার মণ্ডপ সাজানো হয়েছে। মণ্ডপ নির্মাণ ও সাজসজ্জায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে হারাতে বসা বাংলার লোকশিল্প। তেমনি বর্তমান সময়কে ধরতে দুর্গা প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে ‘রোবোটিক’ রূপে। মহিষাসুর বধের সচল চিত্র তুলে ধরা হবে এ প্রতিমার মধ্য দিয়ে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, জন্মের পর থেকে অনেক সময় পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার নাগপাশে বন্দি থাকে নারীরা। তাই মিলন সংঘ ডানকুনির ২০২৩-এর দুর্গোৎসবে বিষয়টিকে ফুটিয়ে তোলা হবে। কোনো বিশেষ শ্রেণি, বর্ণ, জাতি বা ধর্ম নয় সমাজের সব নারী যে পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার শেকলে বন্দি, সেটি তুলে ধরা হবে তাদের পূজার আয়োজনে।

খবরে জানা যায়, গোটা মণ্ডপটি ১২০০ বর্গফুট জায়গা জুড়ে নির্মিত হচ্ছে। মণ্ডপটি দুটি অংশে বিভক্ত। সামনের অংশে রয়েছে ৩০ ফুট উচ্চতার দেবী দুর্গার মুখাবয়ব এবং পেছনের অংশে রয়েছে ৯০ ফুট উচ্চতার দেবী দুর্গার মুকুট সজ্জা। সেই মুকুট সজ্জার গায়ে রয়েছে ছোট-বড় বিভিন্ন

আকৃতির নারীমূর্তি। মূল মণ্ডপের অন্দরমহলটি নির্মিত হচ্ছে মাতৃগর্ভের আদলে। মাতৃগর্ভের যে শক্তি, যে মাহাত্ম্য সেটিও তুলে ধরা হচ্ছে। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে ৪৫ জন কারিগর টানা কাজ করে মণ্ডপটি নির্মাণ করেছেন।

উদাহরণ হিসেবে আরও বলা যায়, তিনশ বছরের পুরনো রীতি মেনে হুগলিতে রুদ্ররূপে দুর্গাপূজা হয়। জানা যায়, হুগলির হরিপালে সিংহরায় পরিবার আজও তাদের ঐতিহ্য বজায় রেখেছে। আজও সেখানে ছাগবলির প্রথা চালু আছে। নিয়ম মেনে ষষ্ঠীর দিন পূজা শুরু হলেও তারা অষ্টমীর দিন দুই মণ আতপ চাল নৈবেদ্য হিসেবে দেয়।

বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আরও নানাভাবে তাদের দুর্গাপূজার উৎসব সাজিয়ে থাকেন।

দুর্গাকে মনে করা হয় শাকাহারী। যে কারণে এ পূজায় সাধারণত উদ্ভিজ্জ খাবারের আধিক্য থাকে বেশি। এর সঙ্গে মাছ যোগ করা হয়। যার মধ্যে ইলিশ মাছ সবচেয়ে বেশি পছন্দ। পূজায় ইলিশ সরবরাহ নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কও আমরা দেখে থাকি।

শাস্ত্রমতে, এ বছর দেবী দুর্গা মর্ত্যে আসবেন ঘোড়ায় চড়ে, কৈলাসে ফিরবেনও ঘোড়ায় চড়ে।

নিয়ম অনুযায়ী, দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আসার আহ্বান জানাতে হয় শুরুতে।  মণ্ডপে-মণ্ডপে চণ্ডীপাঠ, মঙ্গলঘট স্থাপন, ঢাক-কাঁসা ও শঙ্খ বাজিয়ে দেবীকে আহ্বান জানান ভক্তরা। এ সময় মঙ্গলঘট স্থাপন করে তাতে ফুল, তুলসী ও বেলপাতা দিয়ে করা হয় পূজা।

মহালয়া, বোধন আর সন্ধিপূজা এই তিন পর্বে হয় দুর্গোৎসব। সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন হয় দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। আশ্বিন মাসের এই শুক্লপক্ষকে বলা হয় দেবীপক্ষ।

গবেষকরা বলছেন, একটি বহুল প্রচলিত ধারণা যে দুর্গাপূজা শুধু বাঙালির পূজা। তবে সারা ভারতে ভিন্ন ভিন্ন রূপে ও ঢঙে দুর্গাপূজা পালিত হয়। যেমন, কাশ্মীরে ও দাক্ষিণাত্যে ‘অম্বা’ ও ‘অম্বিকা’, গুজরাটে ‘হিঙ্গুলা’ ও ‘রুদ্রাণী’, মিথিলায় ‘উমা’,  কান্যকুব্জে ‘কল্যাণী’ এবং কুমারিকা প্রদেশে ‘কন্যাকুমারী’ নামে একই ধরনের পূজা পালিত হয়ে আসছে।

কিছু স্থানে যা নবরাত্র নামে পূজিত হচ্ছে। দাক্ষিণাত্যের অধিবাসীরা পালন করে এ নবরাত্রি উৎসব। যাতে সরস্বতী, লক্ষ্মী ও দুর্গাকে একসঙ্গে আরাধনা করা হয়। পাশাপাশি উত্তর ভারতে হয়ে থাকে ‘দশেরা’ উৎসব। দশমীর দিন দশমুণ্ড রাবণের বিশাল মূর্তি তৈরি করে রাবণবধ করা হয়। দুর্গাপূজা-নবরাত্রি-দশেরা মিলিয়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে হয়ে থাকে শারদোৎসব।