বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ বিরুপক্ষ পাল। এছাড়া গরীবের উপর ট্যাক্স চাপিয়ে বড়দের ছাড় না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, প্রতিবছর আমরা শুনি ট্যাক্স নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি করা হবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দেশের জিডিপি রাজস্বের হার কমছে। তাই রাজস্ব বাড়াতে প্রকৃত গ্রাহকদের ট্যাক্স এর আওতায় আনতে হবে।
মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলামোটরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানটিতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান।
বিরুপক্ষ পাল আরও বলেন, মাত্র দুইটি ভুল সিদ্ধান্তের জন্য মাশুল দিচ্ছে বাংলাদেশ। প্রথমটি ডলারের দাম ধরে রাখা এবং দ্বিতীয়টি এক অংকে ঋণের সুদ হারের সীমাবদ্ধতা। দুটি জিনিসই বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে হয়। ডলার এবং ব্যাংকের ঋণের সুধার নির্ধারণ করবে বাজার। ডলারের দাম ধরে রাখার কারণেই দেশে রেমিটেন্স প্রবণতা কমে গেছে। বেড়েছে হুন্ডি ব্যবসা। যার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে। অর্থনীতির স্বার্থেই ব্যাংকগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
ডলারের রেট এবং সুধার বাজারের উপর ছেড়ে দিলে কীভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ হবে এমন প্রশ্নের উত্তরে বিরুপাক্ষ পাল বলেন, সবকিছু বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে প্রথমে ঊর্ধ্বমুখী হবে ঠিকই কিন্তু একটা সময় পর আবার নিচে নেমে আসবে। উদাহরণস্বরূপ শ্রীলংঙ্কা দিকে লক্ষ্য করা যেতে পারে। কারণ শ্রীলঙ্কাতে মূল্যস্ফীতি ৬৮% থেকে এখন আবার নিচে নেমে এসেছে। এটি একটি বলের মত। ওপরে চললে একটা সময় আবার নিচে নেমে আসবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মশিউর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি কমানোর অন্যতম পথ চাহিদা কমানো। চাহিদা না কমালে মূল্যস্ফীতি বাড়তেই থাকবে। যেহেতু আমরা আমদানি নির্ভর দেশ তাই অলরেডি আমদানি সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমদানি কমলে অর্থনীতিতে একটা গর্ত তৈরি হয়। যার সমাধান হয় রপ্তানি আয়ের মাধ্যমে। অর্থনৈতিক প্রয়োজনে বেশ কিছু নীতির পরিবর্তন এসেছে এবং আরো কিছু প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
সবশেষ তথ্য অনুযায়ী গত ২৭ সেপ্টেম্বর, ডলারের দর আরেক দফা বাড়িয়েছে দেশের ব্যাংকগুলো। এবার সব ক্ষেত্রেই ৫০ পয়সা করে বাড়ানো হয়েছে ডলারের দর। এর ফলে এখন থেকে রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে ডলারের দর ৫০ পয়সা বেড়ে হয়েছে ১১০ টাকা, আর আমদানিতে ১১০ টাকা ৫০ পয়সা।
বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) ও অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) বৈঠকে ডলারের এই নতুন দর নির্ধারিত হয়। এই দর ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। এর আগে গত ৩১ আগস্ট ডলারের দর বাড়ানো হয়। সেবার পণ্য বা সেবা রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স কেনায় ডলারের দাম নির্ধারণ করা হয় ১০৯ টাকা ৫০ পয়সা, আমদানির জন্য নির্ধারণ করা হয় ১১০ টাকা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর গত বছরের মার্চ থেকে দেশে ডলার-সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। এ সংকট মোকাবিলায় শুরুতে ডলারের দাম বেঁধে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে সংকট আরও বেড়ে যায়। পরে গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ায়। এ দায়িত্ব দেওয়া হয় এবিবি ও বাফেদার ওপর। এর পর থেকেই সংগঠন দুটি মিলে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় এবং আমদানি দায় পরিশোধের ক্ষেত্রে ডলারের দাম নির্ধারণ করে আসছে। মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত কার্যকর করছে এই দুই সংগঠন।
বাংলাদেশে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায়, ১২ দশমিক ৭ শতাংশ (১৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার) কমে, ১৩৪ কোটি ডলার রেমিটেন্স এসেছে। এই অংক গত সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, সেপ্টেম্বরে রেমিটেন্স প্রবাহ, আগের মাস আগস্টের তুলনায় ২২ কোটি ৫৭ লাখ ৯০ হাজার ডলার কমেছে।
প্রবাসীরা আগস্ট মাসে প্রায় ১৬০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে। সর্বশেষ ২০২০ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ ১০৯ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছিলো। এর পর, কোভিড-১৯ মহামারীর সময়, অভ্যন্তরীণ রেমিট্যান্সের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশি প্রবাসীরা চলতি বছরের জুনে ২১৯ কোটি ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছে এবং জুলাই মাসে তা ছিলো ১৯৭ কোটি ডলার।