‘খেলা হবে’ কিন্তু ‘ফেয়ার প্লে’ নাকি ‘ম্যাচ ফিক্সিং’

এক

নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ হবে কিনা মানুষের মধ্যে এ নিয়ে সংশয়, শঙ্কা ও উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। জনজীবনের অন্যান্য সংকট বাড়লেও সবকিছু ছাপিয়ে নির্বাচনের আলোচনা সামনে চলে আসছে। আওয়ামী লীগ চায় শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন, আর বিএনপি ও অন্যান্য দলের দাবি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। বিএনপি ১৯৯৪-৯৬ সালে ক্ষমতায় ছিল। আওয়ামী লীগ তখন ক্ষমতাসীন দলের ওপর ভরসা করা যায় না এই যুক্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানায়। সেই সময়ে বিএনপির যুক্তি ছিল, তারা ‘সংবিধানের বাইরে’ যেতে পারবে না। মজার ব্যাপার হলো ২৭ বছর পরেও আমরা ঠিক একই সমস্যায় আটকে আছি, কিন্তু দল দুটির অবস্থান পুরোপুরি উল্টে গেছে। এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশে মারাত্মক রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে আমাদের গত ৩২ বছরের সব অর্জনকে ব্যর্থ করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

দুই

২০১৪ ও ২০১৮, ওই দুই বছরে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা ভোটারদের জন্য সুখকর নয়। সবই ছিল শুভঙ্করের ফাঁকি। কাজেই এ দুটি অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং সামগ্রিকভাবে দেশের গণতন্ত্র পরিসর সংকুচিত হওয়ায় বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে এখন ‘হাইব্রিড গণতন্ত্র’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এরকম নির্বাচন হলে বাংলাদেশ আর গণতান্ত্রিক দেশগুলোর শামিলে থাকবে কিনা, সেটা বড় প্রশ্ন।

আওয়ামী লীগ ও তাদের জোট এবং পরোক্ষ মিত্ররা ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক দলকেই নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার মতো অবস্থা দেখা যাচ্ছে না। বিএনপি, বিএনপির জোট, এবং বিএনপির সঙ্গে অন্য বেশ কিছু ছোট ছোট দল মিলে সরকার উৎখাতের আন্দোলনে আছে। সিপিবি, বাসদ এবং তাদের সমর্থিত বাম গণতান্ত্রিক জোট সীমিত সামর্থ্য নিয়ে ভোটাধিকারের আন্দোলনে ময়দানে আছে।

দেশের মানুষের ভোটাধিকার ও নির্বাচন নিয়ে এই সংকট নতুন কিছু নয়। ১৯৯০-এর ৬ ডিসেম্বর এরশাদ স্বৈরাচারের পতনের পর মানুষের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার হলেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দলীয় সরকারের আওতায় মানুষ নিজের ভোট নিজে দিতে পারেনি। তাদের ক্ষমতায় থাকা ও যাওয়ার লড়াইয়ের কারণে মানুষের ভোটাধিকার বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই দলের এই ক্ষমতার লড়াইয়ের সুযোগ নিয়ে আগেও হস্তক্ষেপ করেছে বিদেশিরা, এইবারও আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে। যা আমাদের দেশ-জাতির জন্য অপমানজনক, একই সঙ্গে ব্যর্থতাও।

তিন

ভোট মানুষের অধিকার। ভোট দিতে পারবেন এমন একটি নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছেন বাংলাদেশের মানুষ তথা যুবকরা। গত দুটি নির্বাচনে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ যুবক সে সুযোগ পাননি (নাগরিক প্ল্যাটফর্মের যুব জরিপ)। সেই যুবকরা ‘ভোট দিতে চাই’ এমন দাবি জোরালো করছে। ১৯৮৮ কিংবা ৮৯ সালের কথা। ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’ এ স্লোগান নিয়ে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন প্রথম পদযাত্রা করে। পরে শেখ হাসিনা এ স্লোগানকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেন। দেশে এখন যুব ভোটারের সংখ্যা আড়াই কোটির বেশি। তাদের বেশির ভাগেরই জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়নি। অথচ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পহেলা আলাপ হলো, নির্দিষ্ট সময় পরপর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোটাররা তাদের পছন্দের দল বা প্রার্থীকে বেছে নেওয়ার অধিকার পাবেন। প্রথম ভোট ঘিরে যুবকদের আবেগ যেমন থাকে তুঙ্গে, আবার ভোটের ফলাফল নির্ধারণে তাদের ভূমিকাও থাকে গুরুত্বপূর্ণ। যেটা আমরা ২০০৮ সালের নির্বাচনে দেখেছি।  যুবকদের বড় একটা অংশ ঐতিহ্য ভেঙে ভিন্ন দল কিংবা নতুন রাজনীতি বেছে নিতে পিছপা হন না। তারা অনেকটাই স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক মত বেছে নেন। সে কারণেই আমরা দেখি, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ছয় বছরের মাথায় মুসলিম লিগ পরিবারের সন্তানরা সেই দলের রাজনীতিকে নাকচ করে দিয়ে আওয়ামী লীগ ও বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন।

চার

যুবকদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে বৈশ্বিক রাজনীতি একটা জোরালো ভূমিকা রাখে। কখনো বামপন্থি জোয়ারে, আবার কখনো জাতীয়তাবাদী জোয়ারে, কখনো ধর্মীয় ও জাতিগত আত্মপরিচয়ের রাজনীতিতে গত কয়েক প্রজন্মের যুবকরা প্রভাবিত হয়েছেন। কিন্তু যুবকদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান শাসনের প্রতি অনাস্থাটা প্রবলভাবে কাজ করে। সে কারণেই সুষ্ঠু ও অবাধ পরিবেশে নির্বাচন হলে যুবকদের ভোট জয়-পরাজয় নির্ধারণে নির্ধারক ভূমিকা পালন করে।

নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত যুব জরিপ অনুযায়ী জনবিন্যাসে যুবকরাই দেশের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের গরিষ্ঠসংখ্যক। অথচ রাষ্ট্রের উন্নয়নদর্শন কিংবা গণতন্ত্র কোনোটাই যুবকদের আকাক্সক্ষা ধারণ করতে পারছে না। তাদের আশাহীনতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। এই জরিপে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ যুবক বলেছেন, সুযোগ পেলে তারা স্থায়ীভাবে বিদেশে চলে যাবেন। তাদের বেশির ভাগই উচ্চশিক্ষিত। আমাদের রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা কি কখনো জানতে চেয়েছেন, কেন তারা দেশ ছাড়তে চাচ্ছেন? জরিপের তথ্য অনুযায়ী, রাজনীতি ও ছাত্ররাজনীতিতে আগ্রহী মাত্র ১১.৬ শতাংশ যুব। অন্যদিকে রাজনীতি নিয়ে অনাগ্রহী যুবদের সংখ্যা তিনগুণ বেশি (৩৫.২ শতাংশ)। ৫৩.৮ শতাংশ যুবক জানিয়েছেন, তারা জাতীয় নির্বাচনে কখনো ভোট দেননি।

পাঁচ

আমাদের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের গৌরবজনক ইতিহাস অনেকের চেয়ে সমৃদ্ধ। অথচ, ভোটাধিকারের জন্য রাস্তায় নেমে যুবকদের দাবি তুলতে হচ্ছে। বাংলাদেশের বয়সও ৫২ বছর পেরিয়েছে। এতগুলো বছরেও ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলগুলো একটা নির্বাচনী ব্যবস্থা ও সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। অথচ রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে পা দেওয়া নেপাল এবং কয়েক লাখ মানুষের দ্বীপদেশ মালদ্বীপও একটা গ্রহণযোগ্য ও স্বস্তিদায়ক নির্বাচনী সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো দিল্লি বা ওয়াশিংটনের দিকে মুখ চেয়ে না থেকে কিংবা আমলাতন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল না হয়ে কবে গণতন্ত্রের চর্চা করতে শিখবে?

ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘তলে তলে আপস হয়ে গেছে। চিন্তার কিছু নেই।’ তাহলে কি আপসের ওপর ভর করে আওয়ামী লীগ আবারও একতরফা নির্বাচন করবে? নাকি বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা ভাগাভাগির আপস হয়েছে? কোনো শঙ্কাই এখন উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাহলে আমরা, ভোটাররা কোথায় আছি? এবার নির্বাচনের ‘ফল’ নিয়ে বহিঃশক্তির সঙ্গে ‘দর-কষাকষি’ চলছে। এভাবেই কি বাংলাদেশে গণতন্ত্র কাজ করছে? এটাই কি আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানের সেই ‘খেলা হবে’? মনে হচ্ছে আমাদের নির্বাচন ‘ফেয়ার প্লে’ নয়, বরং ‘ম্যাচ ফিক্সিং’য়ের উদাহরণ হতে যাচ্ছে।

ছয়

ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন কিংবা অন্যান্য ছাত্রসংগঠনে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী যুক্ত থাকলেও প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ যুবকরা রাজনীতিতে আগ্রহী নন। বাংলাদেশে যুবকদের নিয়ে খুব একটা জরিপ হয় না। ২০১৯ সালে ‘তরুণেরা কী ভাবছেন’ শিরোনামে একটি গণমাধ্যম যে জরিপ করেছিল, তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৫৭ শতাংশ যুবক রাজনীতির প্রতি অনাগ্রহী। এসব যুবকের অধিকাংশ রাজনীতির প্রতি বিক্ষোভ থেকে বিদেশে চলে যাচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে?  বড় দুটি রাজনৈতিক দল, যারা ক্ষমতা দখলের জন্য যতই পরস্পরের সঙ্গে বৈরিতা থাকুক, রাষ্ট্রীয় নীতি-আদর্শের প্রশ্নে ওদের মধ্যকার বিভেদ অনেকাংশেই কমে এসেছে। দুনিয়াব্যাপী নব্য উদারনীতিবাদের প্রতাপের ফলে দেশের অর্থনৈতিক নীতির প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। দুই দলই বাজার অর্থনীতির বাইরে যেতে রাজি না। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ছাড়াও, একসময় যাদের বামপন্থি বা সমাজতন্ত্রী দল হিসেবে চিহ্নিত করা যেত, ওরাও অর্থনৈতিক নীতির প্রশ্নে এখন আর মুখ ফুটে সমাজতন্ত্রের কথা কেউ বলে না। অন্যভাবে বললে, সিপিবি-বাসদ ও অন্য দুই একটি ছোট দল ছাড়া দেশের মধ্যে একরকম ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে দেশে বাজার অর্থনীতিই থাকবে। এমনকি ধর্মনিরপেক্ষতার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি, যেটা ছিল আমাদের স্বাধীনতার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি, প্রশ্নটিও যেন পেছনে পড়ে গেছে। এটার নানাপ্রকার প্রভাব পড়েছে আমাদের দেশের রাজনীতিতে। এখন যেহেতু নির্বাচন চলে আসছে, এখন সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো নির্বাচনে সমর্থন দেওয়ার লোভ দেখিয়ে সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে নিয়ে আসার চেষ্টা করবে। এমনকি আশঙ্কা করা যায় যে বাংলাদেশ তার উদারনৈতিক চরিত্রও হয়তো হারিয়ে ফেলবে অনেকখানি।

এবারও যদি ভোট না দিতে পারেন তবে সবচেয়ে চড়া মূল্য দেবেন যুব সমাজ, যেটা হয়তো অদূরে ভিত নাড়িয়ে দেবে। ভোটের অধিকার ছাড়া যে প্রজন্ম গড়ে উঠেছে, তাদের মনে যে ক্ষোভ, হতাশা ও হাহাকার তৈরি হচ্ছে, তা খেসারত অনেক দীর্ঘ হবে। যুবকদের একাংশ দেশত্যাগ করতে চাইছেন, আরেক অংশ রাজনীতির প্রতি অনাস্থা জানাচ্ছে। এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে দেশ ও জাতির জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে।

লেখক : রাজনৈতিক সংগঠক

emonn.habib@gmail.com