যিনি হর্ন বাজান আর যিনি শোনেন শব্দদূষণে ভুক্তভোগী দুজনেই। তারপরও কেন এ উৎপাত থেকে রেহাই মিলছে না, তা নিয়ে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
ঢাকায় থাকি...
সায়েন্স ফিকশন এখন খুব জনপ্রিয় বিশ্বজুড়ে। কারণ প্রযুক্তির উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশের বিপর্যয়ের মুখে টিকে থাকতে গেলে মানুষের নিজেকে আরও পরিবর্তন করতে হবে। কৃত্রিম ফুসফুস, কৃত্রিম চোখ, রূপান্তরিত মস্তিষ্কের ব্যবহার শুরু হয়ে যাবে খুব দ্রুতই। সায়েন্স ফিকশনে লেখকরা এসব কল্পকাহিনি ফুটিয়ে তোলেন। পাঠকও মজা পান পড়ে। বন্ধুদের সঙ্গে এসব নিয়ে কথা হচ্ছিল সেদিন। তখনই এক বন্ধু বলল, ঢাকা শহর তো এখনই আগামীর পৃথিবী হয়ে আছে। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণে নাকাল পরিস্থিতি। কোনো বিজ্ঞানীর উচিত কৃত্রিম কান আবিষ্কার করা, যা দিয়ে কোনো যান্ত্রিক শব্দ প্রবেশ করবে না। শুধু প্রাকৃতিক শব্দ শুনতে পাবে মানুষ।
অনেকটা মরিয়া হয়ে বন্ধুটি এসব বলছিল। তার কথায় আমরা হেসে উঠলেও বাস্তবতাকে অস্বীকারের উপায় নেই। ওই বন্ধুই বলল, সত্যি ঢাকা এখন দূষণের শহরে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো এ শব্দদূষণ। এমন বিকট বেজে ওঠে বা শব্দ হতে থাকে যে, যার কানে যাবে সে বধির ও চিন্তাশূন্য হয়ে পড়বে। এর চেয়ে বড় বিপদ হলো যখন-তখন উচ্চশব্দে হর্ন দেওয়া বা শব্দ করাকে কেউ অপরাধ মনে করে না। এটা ভাবে না যে, সে নিজের এবং অন্যের ক্ষতি করছে।
শব্দদূষণ যেন শহরের ঘাড়ে ভূত হয়ে ভর করেছে। কারণ তাকে দেখা যায় না কোথাও। তবে তার নেতিবাচক প্রভাব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এত ক্ষতিকর একটি উৎপাতের দায় নিতে চায় না কেউ। তাকে তাড়ানো যাবে কীভাবে তাও অজানা।
এ ভূতের খোঁজে
আরেক বন্ধু শোনাল তার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার কথা। সে ছুটি নিয়ে গিয়েছিল নিজ গ্রামে। সেখানে তার খুব ভালো ঘুম হলো কারণ কোনো শব্দ নেই। ঘুম থেকে উঠে শুনতে পেল পাখির ডাক। পাশের বাসার কোনো বাচ্চা যেন গলা সাধছে হারমোনিয়াম নিয়ে। বিষয়টা ওর ভালো লাগল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর খেয়াল হলো হঠাৎ মাথাটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। মনে হলো গাড়ির হর্ন, ড্রিল মেশিন, রাস্তা কাটার যান্তব শব্দ সে পাচ্ছে না। কানে আসছে না নির্মাণকাজের ঠুকঠাক। তার অস্বস্তি শুরু হতে থাকল। যে কয়দিন গ্রামে ছিল তার কানটা কেমন যেন নিস্তেজ হয়েছিল। তারপর যখন ঢাকায় ফিরল, শহরের বিকট শব্দ কানে পেতে লাগল, তখন তার মনে হলো কান বুঝি প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
বন্ধুদের সঙ্গে এসব নিয়ে আলোচনা নিয়মিতই হয়। কিন্তু এর কারণ খোঁজার তাগাদাটা সব সময় আসে না। গত রবিবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ‘এক মিনিট’ হর্ন না বাজিয়ে থাকার কর্মসূচি হাতে নেয়। তবে তাতে সাড়া পাওয়া যায়নি। নির্বিচারে তখনো হর্ন বাজিয়ে গেছে চালকরা। গবেষণায় জানা গেছে, অন্যান্য উৎসের তুলনায় গাড়ির হর্ন ঢাকা শহরে শব্দদূষণের জন্য অধিক দায়ী।
এর আগেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। সেগুলোও ব্যর্থ হয়। যেমন ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর সচিবালয় এলাকাকে ‘নীবর’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে প্রায় চার বছর হয়ে এলো, সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন হয়নি। কয়েকবার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেও লাভ হয়নি।
এ বিষয়ে গবেষণা করেছে স্টামফোর্ড বিশ^বিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)। তারা অটোমেটিক সাউন্ড লেভেল মিটার দিয়ে গত জানুয়ারি মাসে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৮২ স্থানে শব্দের মাত্রা পরিমাপ করে।
শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ অনুযায়ী, ঢাকার জন্য দিনের বেলায় শব্দের আদর্শ মান (সর্বোচ্চ সীমা) ৬০ ডিসিবেল। তবে গবেষণায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন স্থানে সাধারণভাবে শব্দের গ্রহণযোগ্য মানমাত্রার চেয়ে প্রায় ১ দশমিক ৩ থেকে ২ গুণ বেশি শব্দ পাওয়া গেছে।
কেন এমন হয়
কেন আমাদের পরিস্থিতি এমন তা নিয়ে কথা হয় স্টামফোর্ড বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ক্যাপস পরিচালক অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদারের সঙ্গে। তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রাথমিকভাবে তিনি মনে করেন, শব্দূষণ যে দণ্ডনীয় এটা মানুষ জানে না। না জানার কারণে যেখানে হর্ন বাজানো নিষেধ, সেখানেও তারা হর্ন বাজান। ব্যাপক হারে মানুষকে শব্দদূষণের বিষয়ে সচেতন করার পর আইনের প্রয়োগ করা যেতে পারে। যেমন যে মাত্রায় শব্দদূষণ ঘটছে, যে হর্ন তিনি ব্যবহার করছেন তা যে নিষিদ্ধ সে বিষয়ে চালকরা সবাই অবগত নন। তারা এসব বিষয়ে অবহিত হলে শব্দদূষণ কমানো যাবে।
তবে তিনি মনে করেন, মানুষকে সচেতন করার আগে সড়কে যে বিশৃঙ্খলা, যানজট থাকে, সড়ক খারাপ থাকে, নানা কারণে দীর্ঘ সময় মানুষকে যানজটে আটকে থাকতে হয় সেগুলো কমিয়ে আনতে হবে। যানজটে পড়ে অস্থির হয়ে অনেকে হর্ন বাজাতে থাকেন। বিশেষ করে যখন যানজট ছাড়তে থাকে, তখন একসঙ্গে অনেকে হর্ন বাজিয়ে ওঠেন।
তাই তিনি মনে করেন যে, সচেতনতার আগে সড়ক মসৃণ করা, সড়কের অব্যবস্থাপনা দূর করা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। পর্যাপ্ত সড়ক থাকলে হর্ন বাজানোর প্রবণতা কমে আসবে। এর জন্য সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ করা দরকার। কারণ এর ফলে রাস্তা সংকুচিত হয়ে আসে।
যেভাবে পরিত্রাণ
তার সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, ঢাকার সড়কে খোঁড়াখুঁড়ির ফলে চলাচলের রাস্তা ছোট হয়ে আসে। কোথাও কোথাও মানুষ এবং যানবাহন একই পথে চলতে থাকে। তখন দুর্ঘটনা এড়াতে হর্ন বাজান চালকরা। এসব বিষয় আগে সমাধান করা জরুরি। তারপর আইনের কঠোর প্রয়োগের বিষয়টি ভাবা যায়। রাস্তা বিশৃঙ্খল রেখে চালকদের সচেতন করা কঠিন হবে।
ঢাকার রাস্তায় নিয়মিত চলাচল করেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। সাধারণত গণপরিবহন থেকে কম হর্ন বাজানো হয়। কারণ গণপরিবহন সারাক্ষণ যাত্রী তুলতে ও নামাতে থাকে। তারা ধীরে ধীরে চলে এবং নিজেদের ইচ্ছামতো চলে। তারা খুব কমই হর্ন বাজায়। তবে তাদের কারণে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলে ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস চালকরা হর্ন বেশি বাজান।
উদাহরণ হিসেবে পার্শ¦বর্তী দেশ ভারতের প্রসঙ্গ উঠে এলো আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদারের সঙ্গে আলাপে। ওই দেশে হর্ন বাজানোর উৎপাত রয়েছে। তবে এ গবেষক জানান, ভারতে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়ানোর পর যে পাশ নীরব থাকবে তাদের আগে ছেড়ে দেওয়া হয়। আর যে পাশ হর্ন বাজাবে, তাদের আরও দু-তিন মিনিট অপেক্ষায় রাখা হয়। এর ফলে যেটা হয়, কেউ যদি অস্থির হয়ে হর্ন বাজায়ও তাহলে পাশের জন তাকে নিষেধ করবে। নাগরিকরাই তখন নিজ স্বার্থে আইনের বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ভূমিকা রাখতে হয় না।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও গবেষক সৌমিত্র দস্তিদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি অবশ্য বলেন, কলকাতায়ও শব্দদূষণ থেকে নিস্তার নেই। সেখানে ঢাকার মতোই গাড়ির হর্নের উৎপাতে টিকে থাকা দায়। অনেক বলেও কোনো সমাধান হয়নি। আগের চেয়ে গাড়িও বেড়েছে, শব্দদূষণও বেড়েছে।
কামরুজ্জমান মজুমদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, সিঙ্গাপুর, দুবাইয়ে শব্দদূষণের সাজা খুব কঠিন। যদিও একটা বিষয় এখানে খেয়াল করা দরকার, তাদের দেশে অত যানজট নেই। তাদের রাস্তায় গাড়ি অবারিত ছুটতে পারে। গাড়িতে যত গতি থাকবে হর্ন তত কমবে, এটা হলো সূত্র।
এরপর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হর্ন নামক যন্ত্রটি। বাংলাদেশে এ যন্ত্রের ব্যবহার বিষয়ে আইন থাকলেও তা মানা হয় না। আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার জানান, বাংলাদেশের রাজধানী বা মফস্বল শহরে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার করা হয়, যা আদালতের রায় এবং আমদানি নীতিমালায় নিষিদ্ধ। উচ্চমাত্রার হর্ন চোরাই পথে এসে স্থানীয়ভাবে গাড়িতে সংযুক্ত হয়। ঢাকায় ৩০ ভাগ যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার হয়।
তিনি জানান, ‘হাইড্রোলিক হর্ন ছাড়াও অন্যান্য গাড়ি যেমন, বিশেষ করে মোটরসাইকেলে বিল্টইন যে হর্ন থাকে সেগুলোও দূষণের জন্য দায়ী। সাধারণ মানমাত্রায় দেড় ফিটের মধ্যে ১০০ ডেসিবেল শব্দ উৎপাদনের নিয়ম আছে। তবে যেকোনো মোটরসাইকেল ১১০ ডেসিবলের চেয়ে বেশি শব্দের হর্ন বাজানো হয়। তবে এ শব্দের মাত্রা পরিমাপের জন্য ট্রাফিক পুলিশের হাতে কোনো প্রযুক্তি নেই। তাদের অনেকে বিষয়টি জানেনও না।’
হর্ন দিলে লাভ কার
‘হর্ন হুদাই বাজায় ভুদাই’ ক্যাম্পেইনের প্রবক্তা মমিনুর রহমান রয়েলের সঙ্গে কথা বলে তাকে কিছুটা হতাশই মনে হলো। তিনি মনে করেন, চালক হর্ন আছে বলেই বাজাচ্ছেন। হর্ন বাজানোর পর কী হলো সেটা নিয়ে না ভেবেই হর্ন বাজাচ্ছেন।
তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি প্রতিদিন মোটরসাইকেল চালান, তবে কখনো হর্ন বাজাননি। এমনকি সরকারি গাড়ি থেকেও মুহুর্মুহু হর্নের শব্দ ভেসে আসছে।
তার মতে, হর্ন বাজিয়ে কোনো লাভ হয় না। কারণ হর্ন বাজালেই রাস্তার জ্যাম ছুটে যায় না বা কেউ সহজে সাইড দিয়ে দেয় না। যদি সাইড দেয়ও কেউ, তাহলে দেখা গেল তিনি তিন থেকে চার মিনিট আগে তার গন্তব্যে পৌঁছেছেন। এ সামান্য সময় আগে পৌঁছে তার কী ফায়দা হবে সেটা বোধগম্য নয়। তবে তিনি ঠিকই অন্যের বড় ক্ষতি করে গেলেন অনর্গল হর্ন বাজিয়ে।
চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, শব্দদূষণের ফলে বধিরতা, শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, কম ঘুম, হৃদরোগ, শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা বিঘ্ন হওয়াসহ নানা সমস্যা তৈরি হয়। স্বল্পমেয়াদি শব্দদূষণ মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি শব্দদূষণের প্রতিক্রিয়ায় বিরক্তি, নেতিবাচকতা, রাগ, ক্লান্তি, চাপা উত্তেজনা, মানসিক চাপ বাড়ায়। এর ফলে স্মৃতিশক্তিও হ্রাস পায়। অন্যদিকে উচ্চশব্দ শিশু, গর্ভবতী মা, হৃদরোগীর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। শিশুদের মানসিক বিকাশে বাধাগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি আকস্মিক উচ্চশব্দ মানবদেহের রক্তচাপ ও হৃৎকম্পন বাড়িয়ে দেয়, শিরা ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর প্রচণ্ড চাপ দেয়।