‘এই রূপালি গিটার ফেলে, একদিন চলে যাবো দূরে বহুদূরে’- গিটারের ছয় তার ও উদাত্ত কণ্ঠে এ গান গেয়েছিলেন রকস্টার আইয়ুব বাচ্চু। গানের কথাগুলোকে সত্য করে পাঁচ বছর আগে ২০১৮ সালের এই দিনে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি। ওপারে চলে গেলেও এপারে রেখে গেছেন এক বর্ণাঢ্য সংগীত জীবন। যেখানে রয়েছে অসংখ্য কালজয়ী গান, জাদুকরি গিটারের সুর, আর তারুণ্যের জন্য সীমাহীন ভালোবাসা।
বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে যে ক'জন আজন্ম ভূমিকা রাখবে তার মধ্যে অন্যতম এবি। আজ তার পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। তাকে ঘিরে পরিবারের পক্ষ থেকে দিনটিতে থাকছে বিশেষ আয়োজন।
১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আইয়ুব বাচ্চু। ১৯৭৭ সালে কলেজে পড়ার সময় কুমার বিশ্বজিৎকে নিয়ে ‘আগলি বয়েজ’-এ লিড গিটারিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। সে সময়েই এক চায়ের দোকানে বসে গিটার বাজাচ্ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। তার গিটারের সুর ধরা দেয় ‘নগর বাউল’ জেমসের কাছে। জেমস তাকে নিজের ব্যান্ড ‘ফিলিংস’ (বর্তমানে নগর বাউল) এ লিড গিটারিস্ট হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দেন। তিনি সে প্রস্তাবে রাজী হন এবং পরবর্তী দুই বছর নগর বাউলের সাথে কাজ করেন।
এরপর ১৯৮০ সালে নগর বাউলের এক শোতে ‘সোলস’ ব্যান্ডের নকিব খানের নজরে পড়েন আইয়ুব বাচ্চু। ‘সোলস’ এর সাথে তার দীর্ঘ যাত্রার শুরু তখন থেকেই। পরবর্তী দশ বছর তিনি সোলসের লিড গিটারিস্ট ও ভোকালিস্ট ছিলেন। সেসময়ে ১৯৮৭ সালে ‘হারানো বিকেলের গল্প’ শিরোনামে ‘মানুষ মাটির কাছাকাছি’ অ্যালবামে প্রথম গাওয়া গান প্রকাশ করা হয়। এরপর আরও দুটি অ্যালবাম
‘রক্ত গোলাপ’ ও ‘ময়না’ প্রকাশিত হয় ব্যান্ডটি থেকে। মিউজিক পছন্দ না হওয়ায় এরপর ব্যান্ডটি ছেড়ে দেন এবি, গঠন করেন এলআরবি (লাভ রানস ব্লাইন্ড)। সেবছরই ব্যান্ডটি প্রথম কনসার্ট করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৯২ সালে এলআরবি ১ ও এলআরবি ২ নামে দুটি অ্যালবাম প্রকাশ করে। এটাই দেশের প্রথম ডাবল অ্যালবাম। তাদের তৃতীয় অ্যালবাম ‘সুখ’- এ ছিল তার জীবনের সবচেয়ে জনপ্রিয় গান- ‘চলো বদলে যাই’।
এলআরবির অন্য অ্যালবামগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘সুখ’ (১৯৯৩), ‘তবুও’ (১৯৯৪), ‘ঘুমন্ত শহরে’ (১৯৯৫), ‘ফেরারি মন’ (১৯৯৬), ‘আমাদের’ (১৯৯৮), ‘বিস্ময়’ (১৯৯৮), ‘মন চাইলে মন পাবে’ (২০০১), ‘অচেনা জীবন’ (২০০৩), ‘মনে আছে নাকি নাই’ (২০০৫), ‘স্পর্শ’ (২০০৮), ‘যুদ্ধ’ (২০১২), ‘রাখে আল্লাহ মারে কে’ (২০১৬)।
আইয়ুব বাচ্চুর গাওয়া গানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘চলো বদলে যাই’। এর কথা ও সুর তারই। শ্রোতাপ্রিয় গানের তালিকায় আরও রয়েছে ‘শেষ চিঠি কেমন এমন চিঠি’, ‘ঘুম ভাঙা শহরে’, ‘হকার’, ‘সুখ’, ‘রুপালি গিটার’, ‘গতকাল রাতে’, ‘তারা ভরা রাতে’, ‘এখন অনেক রাত’ ইত্যাদি।
রক ঘরানার গানের এই শিল্পী আধুনিক আর লোকগীতিতেও শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন। বেশ কিছু চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেছেন তিনি। চলচ্চিত্রে তার গাওয়া প্রথম গান ‘লুটতরাজ’ ছবির ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’। এছাড়া ‘আম্মাজান’ ছবির শিরোনাম গানও জনপ্রিয়।
দীর্ঘ কয়েক দশকে অসংখ্য কালজয়ী, জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন আইয়ুব বাচ্চু। ‘চলো বদলে যাই,’ ‘হাসতে দেখো,’ ‘এখন অনেক রাত,’ ‘রুপালি গিটার’, ‘মেয়ে’ ‘আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি,’ ‘সুখের এ পৃথিবী,’ ‘ফেরারি মন,’ ‘উড়াল দেবো আকাশে,’ ‘বাংলাদেশ,’ ‘আমি বারো মাস তোমায় ভালোবাসি,’ ‘এক আকাশের তারা,’ ‘সেই তারা ভরা রাতে,’ ‘কবিতা,’ ‘আমি তো প্রেমে পড়িনি,’ ‘তিন পুরুষ,’ ‘যেওনা চলে বন্ধু,’ ‘বেলা শেষে ফিরে এসে,’ ‘আমি তো প্রেমে পড়িনি,’ ‘তিন পুরুষ’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা তিনি।