‘কান্ডারি! বলো, ডুবিছে মানুষ’

প্রচলিত চালু কথা হচ্ছে যুদ্ধ বা সংঘাতে প্রথম বলি হয় ‘সত্য’। যুগের পর যুগ বিশ্ববাসীর চোখের সামনেই চলা এক অসম লড়াইয়ে একদিকে ফিলিস্তিনিরা হচ্ছেন ভূমিহীন, রাষ্ট্রহীন; অন্যদিকে দখলদার ইসরায়েল হচ্ছে পরাক্রমশালী। বিষয়টি  ধারাবাহিকভাবে এলেও এবারের মতো এতটা প্রকটভাবে আর কখনো অনুভূত হয়েছে বলে মনে হয় না। অথচ, বিশে^র পরাশক্তিগুলো শান্তির চেয়ে, ইনসাফের চেয়ে, সহাবস্থানের চেয়ে, এমনকি নিরীহ মানুষের জীবন বাঁচানোর চেয়ে ভূ-রাজনীতির হিসাব, নিজেদের স্বার্থ ও কৃতকর্মের দায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপিয়ে দিতে যেন মরিয়া। এর অকাট্য প্রমাণ চলতি মাসের ৭ তারিখে সাম্প্রতিক সংঘাত শুরু হওয়া মাত্র যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সমর্থনে রণতরী পাঠাতে দেরি করেনি। অথচ, অবরুদ্ধ গাজার অগণিত আতঙ্কিত নরনারী, নিহত শিশুদের মুখ তাদের বিবেচনাতেই আসেনি। ইতিমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সব ধরনের জরুরি পণ্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পানি সরবরাহ।

দেশে মূল্যস্ফীতি, রাজনৈতিক সংকটসহ বিবিধ অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থাকলেও উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সুদূর মধ্যপ্রাচ্যে রাষ্ট্রহীন ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে দখলদার ইসরায়েলিদের প্রাণঘাতী সংঘাতকে উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। সামগ্রিকভাবে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা সর্বাধিক। ধারণা করা হচ্ছে, প্রতি তিনজনে একজনই শিশু। আহত মানুষের সংখ্যাও অস্বাভাবিক রকম বেশি। গাজার হাসপাতালও রেহাই পায়নি ইসরায়েলি হামলা থেকে। বুধবার দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে বিবিসি ও আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার চালানো ‘বর্বর’ ওই হামলায় নিহতদের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মধ্য গাজার আল আহলি আরব হাসপাতালের রোগীদের বেশিরভাগই ছিল ইসরায়েলি হামলায় আহত। জ্বালানি, বিদ্যুৎ আর পানির সংকটে হাসপাতালটির ৮০ শতাংশ অকার্যকর হয়ে পড়ে। সেখান থেকে কিছু রোগী সরিয়ে নেওয়া হয়। রোগী সরানো অংশে আশ্রয় নেয় ঘরবাড়ি ছেড়ে পালানো হাজারো মানুষ। কিন্তু হাসপাতালে থাকা রোগী, রোগীর স্বজন ও আশ্রয় নেওয়া অসংখ্য মানুষের সব স্বপ্ন থমকে গেছে ইসরায়েলের বিমান হামলায়।

পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তাতে গাজায় মানবিক বিপর্যয় চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। অবশ্য গাজায় কোনো ধরনের মানবিক সংকট নেই বলে দাবি করেছেন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লে. কর্নেল রিচার্ড হেচ। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত ও অন্য রোগীদের ওষুধ যেমন শেষ হয়ে এসেছে, তেমনি খাবার পানিও তাদের দেওয়া যাচ্ছে না। জাতিসংঘের যে ত্রাণ সংস্থা ফিলিস্তিনিদের জন্য কাজ করে, সেই ইউএনআরএডব্লিউর ভাষায়, গাজার পরিস্থিতি মানবিক বিপর্যয়ের সীমা ছাড়িয়েছে। এদিকে ইসরায়েল সফর করছেন পশ্চিমা দেশগুলোর নেতারা। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা নেতাদের এসব সফর এক ধরনের উসকানি। এতে ইসরায়েল আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে।

এ কথা সত্য যে, হামাস ইসরায়েলের ভেতরে ঢুকে নির্মমতা চালিয়েছে। প্রশ্ন হামাস কেন ইসরায়েলে আক্রমণ করল? কারণ হতে পারে দুটি। প্রথমত, যেসব দেশের অবস্থান ফিলিস্তিনিদের পক্ষে ও ইসরায়েলের বিপক্ষে ছিল, তারাও ক্রমান্বয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে। বিশেষ করে আরব বিশ্ব। ফিলিস্তিনিরা বা হামাস মনে করছে, তাদের স্বার্থ এখন আর কেউ দেখছে না। হামাস ইসরায়েলে হামলা করে বুঝিয়ে দিল যে, ফিলিস্তিনিদের বাদ দিয়ে কোনো শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া সম্ভব না। দ্বিতীয়ত, ইসরায়েল প্রতিদিনই একটু একটু করে ফিলিস্তিনিদের জায়গা দখল করে ইহুদি বসতি স্থাপন করছে। নিপীড়ন করছে, হত্যা করছে। ইসরায়েল সরকার তার নাগরিকদের নিশ্চয়তা দিয়েছিল, যা কিছুই ঘটুক না কেন, তারা নিরাপদ। হামাস আক্রমণ করে বোঝাতে চাইল ইসরায়েলি জনগণও নিরাপদ নয়।

জরুরি ভিত্তিতে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ এবং একই সঙ্গে হামাস কর্তৃক বন্দিদের নিরাপত্তা ও মুক্তির বিষয়ে তৎপর হওয়া জরুরি। অবরুদ্ধ গাজায় মানবিক সহায়তা, ত্রাণ পৌঁছানোর জন্য করিডরের ব্যবস্থা করতে হবে। যুদ্ধে নিহত ‘সত্য’র লাশ উদ্ধার ও তার সুরতহালের মীমাংসার চেয়ে সাধারণের প্রাণ এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কবি বলেছেন ‘কান্ডারি! বলো, ডুবিছে মানুষ/ সন্তান মোর মার’। বিশ্বনেতাদের আবেগ নয়, বিবেক জাগ্রত হোক, শুভবুদ্ধি শান্তি নিয়ে আসুক।