শুভশক্তির বিজয়প্রতীক মহামায়া দুর্গা

শাস্ত্রে ‘দুর্গা’ শব্দটিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই দুর্গা। অন্যদিকে শব্দকল্পদ্রুম বলছে, যিনি দুর্গম নামে অসুরকে বধ করেছিলেন, তিনি সব সময় দুর্গা নামে পরিচিত। অর্থাৎ নামের প্রতিটি কোণে দেবীর মহিমা। মূর্তিতত্ত্বেও সেই গভীর তত্ত্ব, দৈনন্দিন জীবনযাপনে মুক্তির সুর। জটাধারী চন্দ্রশেখর শিব যেন আমাদের সংযত-নির্লোভী-সংযমী হতে শিক্ষা দেয়। দেবী লক্ষ্মী শুধু টাকাকড়িতেই নয় ঐশ্বর্য-শ্রী, সমৃদ্ধি, বিকাশ যা বৈশ্যদের দ্বারা সম্পাদিত কৃষিকাজ ও ব্যবসার মাধ্যমে পূর্ণ হয়। যারা দিবান্ধ অর্থাৎ তত্ত্ববিষয়ে অজ্ঞ, তাদের জন্য রয়েছে পেঁচক। জ্ঞানস্বরূপা হংস সহিত সরস্বতী দেবী সর্ববিদ্যাময়ীরূপে অজ্ঞানতা থেকে মুক্ত হয়ে গতিময় জ্ঞানার্জনের শিক্ষা দিচ্ছেন। হংস যেমন জল ও দুগ্ধ মিশ্রিত থাকলে শুধু সারবস্তু দুগ্ধ বা ক্ষীরটুকুই গ্রহণ করে, পড়ে থাকে শুধু জল তেমনি সব অজ্ঞানতা থেকে শুধু শুদ্ধ জ্ঞানটুকুই আহরণ করতে বলা হয়েছে।

সৌন্দর্য ও শৌর্য কার্তিকের বৈশিষ্ট্য।  তার বাহন ময়ূরের মধ্যেও যা বিদ্যমান। সেই সঙ্গে ময়ূরের সাপের মতো বিপজ্জনক প্রাণী শিকারের চাতুর্যও উল্লেখ করার মতো। এদিকে কার্তিক ও ময়ূর ক্ষত্রিয়ের ইঙ্গিতবাহী বলা যায়। অপরদিকে সিদ্ধিদাতা গণেশ মানেই সাফল্যের আরাধনা। কারণ তিনি বিঘ্ন নাশ করেন। যা শ্রমের ইঙ্গিতও দেয়। অর্থাৎ শূদ্রের জীবনধারণা। সঙ্গে ইঁদুর মায়া ও অষ্টপাশ ছেদনের প্রতীক।  

আর সবার মধ্যমণি, শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারিণী দশভুজা দেবী দুর্গা। এক হাতে তার শঙ্খ, যা সৃষ্টির প্রতীক। অন্য হাতে চক্র। যার অর্থ সমস্ত সৃষ্টির কেন্দ্রে রয়েছেন তিনি। আরেক হাতে দণ্ড বা গদা। যা আনুগত্য, ভালোবাসা এবং ভক্তির প্রতীক। আর অন্য হাতে পদ্ম। পাকের মধ্যে জন্মায় পদ্ম। কিন্তু তবু সে কত সুন্দর। তেমনই মায়ের আশীর্বাদে যেন অসুরকুলও তার ভেতরের অন্ধকার থেকে যে মুক্ত হয়, এই বার্তাই দেয় পদ্ম ফুল। মানুষ তিনটি গুণ বা ত্রিগুণের সমন্বয়ে তৈরি। সত্ত্বঃ- তমঃ- রজোঃ। সত্ত্বঃ হচ্ছে ধর্মীয় জ্ঞানের প্রকাশ। তমঃ হচ্ছে অন্ধকার। আর রজোঃ হচ্ছে অহঙ্কার বা গর্ব। ত্রিশূলের তিনটি ফলা এই তিনটি গুণকেই নির্দেশ করে। বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে, এর মাহাত্ম্য উপলব্ধি করা যাবে।

দেবীর নবপত্রিকার মাঝেও রয়েছে এক শস্যদায়িনীরূপী ধরিত্রী মাতার রূপ। নবপত্রিকা অর্থাৎ নয়টি গাছের পাতা। তবে বাস্তবে নবপত্রিকা নয়টি পাতা নয়, নয়টি উদ্ভিদ। যেমন, কদলী বা রম্ভা (কলা), কচু, হরিদ্রা (হলুদ), জয়ন্তী, বিল্ব (বেল), দাড়িম্ব (ডালিম), অশোক, মানকচু ও ধান। বৃক্ষরূপে দেবীপূজাও প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত ছিল। ভারতবর পূজিতা হন, তার মধ্যেও বৃক্ষরূপিণী একটি সপত্র কলাগাছের সঙ্গে বাকি আটটি সমূল সপত্র উদ্ভিদ অথবা সপত্র শাখা একত্র করে একজোড়া বেলসহ বেঁধে, শে^ত অপরাজিতা লতার দ্বারা বেষ্টন করে লালপাড় সাদা শাড়ি জড়িয়ে ঘোমটা দেওয়া বধূর আকার দিয়ে সিঁদুর মাখিয়ে এই নবপত্রিকা প্রস্তুত করা হয়। তবে নবপত্রিকা নবদুর্গা নামে পূজিতা হন উদ্ভিদগুলো দেবীর প্রতিরূপ হিসেবে গণ্য হয়। নয় দেবী একত্রে ‘নবপত্রিকাবাসিনী নবদুর্গা’ নামে পূজিতা হন।

সপ্তমীতে নবপত্রিকা প্রবেশের পরই মহাস্নানে লাগছে বিভিন্ন স্থানের জল। তৈল, মাটি, পঞ্চরত্ন, পঞ্চকষায়, পঞ্চশস্য, হলুদ প্রভৃতি প্রয়োজন হচ্ছে। এ ছাড়াও মহাস্নানে গজদন্ত মৃত্তিকা, বরাহদন্ত মৃত্তিকা, বৃষশৃঙ্গ মৃত্তিকা, সাগর মৃত্তিকা, গোষ্ঠ মৃত্তিকা, নদ মৃত্তিকা, নদী মৃত্তিকা, বেশ্যাদ্বারের মৃত্তিকা প্রভৃতি প্রয়োজন হচ্ছে। মা দুর্গা ধরণীকে শস্যপূর্ণা করে জীবকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, এ জন্য দেবীকে পঞ্চশস্যের জলে স্নান করানো হয়। আবার বকুল, কুল, জাম, শিমুল ও বেড়েলা এই পঞ্চকষায় উদ্ভিদকুলে দুর্গার অধিষ্ঠানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। স্বর্ণ, হীরক, মুক্তা, প্রবাল ও পদ্মরাগ এই পঞ্চরত্নের জলে স্নানের মাধ্যমে দেবীর যেমন ঐশ্বর্যময়ী রূপটি ফুটে ওঠে তেমনি স্নানের সময় শাস্ত্রোক্ত বিভিন্ন গীত-বাদ্য পরিবেশনের রীতি রয়েছে। এ যেন জগতের অধিষ্ঠাত্রী হিসেবে সমগ্র সংসারকে নিজের মাঝে আঁকড়ে ধরার প্রতিভূ। এখানেই চলে আসে উপনিষদের সেই বাণী- ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ (The whole world is one single family). দুর্গাপূজার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য এর বাইরের কিছু নয়।

পূজার সময় আমরা দেবীর কাছে মন্ত্র প্রার্থনা জানাচ্ছি, অর্থাৎ মায়ের চিরাচরিত সেই বিপদহন্তারূপ। যিনি উপবাসী তিনি শুধু একা নিজের জন্যই নয়, সারা দেশ তথা বিশে^র জন্য প্রার্থনা জানাচ্ছেন নমঃ সর্বমঙ্গলা মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থ সাধিকে/ শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়ণী নমোহস্তুতে। এর বাংলা অর্থ হচ্ছে হে দেবী শিবের পত্নি সব মঙ্গলে তুমি মঙ্গলস্বরূপা, কল্যাণদাত্রী, সর্বসিদ্ধি প্রদায়িনী, আশ্রয়দাত্রী, ত্রিনয়না, গৌরবর্ণা, নারায়ণী তোমাকে প্রণাম জানাই। এসব মন্ত্রোচ্চারণে কোনো জাতি-বর্ণ নেই। বরং এখানে ধর্ম-চ্ছুত-অচ্ছুত ভাবনাকে বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে এক অমোঘ শরণাগতির আশ্বাসে, ভগবানকে স্মরণে নিলেও মনের যত অশুচিতা-সংকীর্ণতা কেটে যায়। এভাবেই আবহমানকাল ধরে দেবতাগণ- ভগবান শ্রীকৃষ্ণ থেকে রাজা সুরথ রাজা-জমিদার-স্বামীজি-বিপ্লবীদের অনুসৃত পথ ধরেই বর্তমানে দেবী বন্দনা চলে আসছে। দুর্গা আরাধনা যেন ঠিক সেই উপদেশ মেনেই চলে আসছে বাংলার প্রতিটি প্রান্তে। এমনকি সমাজের বিভিন্ন পটপরিবর্তনেও দুর্গার প্রভাব রয়েছে।

বাঙালির বিশাল ত্যাগের বছর ১৯৭১। ১৯৪৭-এর ভারত বিভক্তির পর এ দেশীয় বাঙালিদের জীবনে সবচেয়ে বিভীষিকাময় একটি বছর। ভিটেমাটি হারা হয়ে সীমান্তের এপারে ওপারে কোনো রকমে দিনাতিপাত করে অসহায় মানুষগুলো। চোখের সামনে নিজের আপনজনের মৃত্যু, লাশের স্তূপ, অত্যাচার-নির্যাতনে কোণঠাসা হয়ে পড়া এই মানুষগুলো দুটি ঈদ আর দুর্গাপূজা পালন করে শুধু চলমান বিভীষিকার হাত থেকে একটু স্বস্তির আশায়। হাতেগোনা কিছু স্থানে নামমাত্র দুর্গাপূজা করেছিল অসহায় মানুষগুলো। ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের জন্য আয়োজনটা ছিল একটু অন্য রকম।

একাত্তরে সেই সত্যিটিই বড় বেশি দাম দিয়ে উপলব্ধি করতে হয়েছে বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমানকে।  ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ ছিল ‘বিজয়া দশমী’। অবরুদ্ধ বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত কোনো পত্রিকায় কিংবা ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশে দুর্গাপূজার কোনো সংবাদ পাওয়া যায় না। তবে পূর্ব পাকিস্তানের গর্ভনর ডা. মালিক রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি দুর্গাপূজা আয়োজনের কথা কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক যুগান্তর থেকে জানা যায়। কিছুদিন পরেই ছিল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন। পাকিস্তান বুঝতে পেরেছিল, তাকে শক্ত কূটনৈতিক চাপে পড়তে হবে। দুর্গাপূজার আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে অন্য বার্তা দিতে এই আয়োজন। কিন্তু সমস্যা হলো, এই আয়োজনের জন্য হিন্দু নেই। পাকিস্তানের সামরিক আগ্রাসনের মুখে দেশ প্রায় হিন্দুশূন্য। মুসলমানদের হিন্দু সাজিয়ে পূজা করাবে সেই রিস্কে গেলেন না গভর্নর সাহেব। কারাগার থেকে পূজার আয়োজনের জন্য কিছু হিন্দুকে মুক্তি দেওয়া হলো। এবং তাদের বাধ্য করা হলো পূজা আয়োজনে। প্রতিমা তৈরি করতে গিয়ে মুখোমুখি আরেক সংকটের। অবশেষে ছবি দেখে সরকারের কারিগররাই তৈরি করল প্রতিমা। অন্যদিকে ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর শরণার্থীদের জীবনে আসে অন্যরকম দুর্গাপূজা। আগের বছর যারা মহাধুমধামের সঙ্গে পাড়ায় পাড়ায় পূজার আয়োজন করেছিল এবার তাদের উদ্বাস্তু জীবন। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরার কয়েকটি শরণার্থী ক্যাম্পে স্থানীয়দের উদ্যোগে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। কলকাতার সল্টলেক শরণার্থী শিবিরের ২টি ক্যাম্পের বাসিন্দারা চার আনা, ছয় আনা চাঁদা দিয়ে গড়ে তোলেন একটি তহবিল। রেশনের টাকা বাঁচিয়ে প্রায় তিনশ টাকা সংগ্রহ করে আয়োজন করেন দেবী দুর্গার আরাধনা।

একাত্তরে শরণার্থী শিবিরগুলোতে পূজা এসেছিল অন্য এক আবহ নিয়ে, শপথ নিয়ে। একদিকে দেশহীন হওয়ার স্মৃতি, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় শারদ এসেছিল ক্ষণিকের স্বস্তি নিয়ে। আনন্দবাজারে প্রতিফলিত হয়েছে সেই সুর। ২৮ সেপ্টেম্বর আনন্দবাজার লিখছে, ‘উৎসবের আনন্দে হাত বাড়িয়ে দিন, পূর্ববঙ্গের দুর্গতদের পাশে দাঁড়ান, আপনার পাশাপাশি তাদেরও উৎসবে যোগ দেওয়ার সুযোগ করে দিন।’ শরণার্থী ছেলেমেয়েরা পুরনো কাপড় নিয়ে পূজায় সমবেত হয়।

কলকাতার অনেক মণ্ডপে ছিল একজন দেবতুল্য শেখ মুজিবের ছবি! বিস্মিত না হয়ে সত্যি উপায় ছিল না।

যুগে যুগে দেশে দেশে আজও এভাবেই দুর্গতি নাশের প্রার্থনায় বাঙালি হিন্দুরা আয়োজন করে দুর্গা আরাধনা। দুই বাংলার মতো বিহার, দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গোয়া, গুজরাট, পাঞ্জাব, কাশ্মীর, অন্ধ্র প্রদেশ, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, কেরালায় ঘটা করে এই উৎসব পালন করা হয়। নেপাল ও ভুটানের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, সিঙ্গাপুর, মরিশাস, ফিজি, টোবাকো, কুয়েত, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অভিবাসী হিন্দু বা বাঙালি হিন্দুদের নানা সংগঠন এই উৎসব পালন করে। প্রতি বছর বিশ্বের ৯৩টি রাষ্ট্রে কলকাতার পটুয়াপাড়া থেকে অসংখ্য প্রতিমা পাঠানো হয়। এতে শুধু পূজা সংখ্যায় বৃদ্ধি পাচ্ছে না, বাঙালি সংস্কৃতির বিশ্বায়ন ঘটছে সর্বজনীন এ পূজার মধ্য দিয়ে। সর্বভূতা দেবীর বিরাজ সর্বত্রই। যেখানে ধর্ম-বর্ণ কোনো মানদন্ড নয়। সকলে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি হে দেবী, তুমি প্রসন্ন হলেই আমাদের মুক্তিলাভ হবে... ‘ত্বং বৈ প্রসন্না ভুবি মুক্তিহেতুঃ’। মঙ্গলবার বিজয়া দশমীতে দেবি বিদায় নেবেন। আবারও বলি নমঃ সর্বমঙ্গল্য মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থ সাধিকে/ শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়ণী নমোহস্তুতে। এর বাংলা অর্থ হচ্ছে হে শিবের পত্নি, সকল মঙ্গলে তুমি মঙ্গলস্বরূপা, কল্যাণদাত্রী, সর্বসিদ্ধি প্রদায়িনী, আশ্রয়দাত্রী, ত্রিনয়না, গৌরবদনা নারায়ণী তোমাকে প্রণাম করি।

পৃথিবীর সব মানুষের যেন মঙ্গল হয়। হে কাত্যায়নী, দাক্ষায়ণী, অদ্রিজা, নগনন্দিনী, সিংহবাহিনী, শারদা, আনন্দময়ী, উমা, পার্বতী তোমার আগমন ও গমন যেন আমাদের পরম মানবপ্রেমে জড়িয়ে রাখে। তোমার আশীর্বাদে, সুজলা-সফলা-শস্য-শ্যামলায় পূর্ণতা পাক এ দেশ। আবারও বলি- ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’।  

লেখক: সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী

palashchow.news@gmail.com