নির্বাচন মধ্য জানুয়ারিতে!

আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এখন পর্যন্ত দুই মেরুতে অবস্থান করছে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। তবে তাতে থেমে নেই নির্বাচন কমিশনের ভোটের প্রস্তুতি। আগামী জানুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটি। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষ থেকে পর্যবেক্ষক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়ে পাঠানো চিঠিতে এমন আভাস পাওয়া গেছে।

ইসির রোডম্যাপ অনুযায়ী, চলতি বছর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ কিংবা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইসির এ চিঠি অনুযায়ী ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে কিংবা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ভোট হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। সে ক্ষেত্রে জানুয়ারির প্রথমার্ধে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে।

ইসির একটি সূত্রও বলছে, নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনায় জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন করার কোনো সম্ভাবনা নেই। জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে ভোটের তারিখ নির্ধারণ করা হবে।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, ৩০ অক্টোবর ও আগামী ১ নভেম্বর সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছে কাজী হাবিবুল আউয়াল নেতৃত্বাধীন কমিশন। এই দুদিনের বৈঠক জুড়েই থাকবে নির্বাচন সফল করার বার্তা।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, নভেম্বরের প্রথমার্ধে তফসিল ঘোষণার লক্ষ্য নিয়ে আগামী ১ নভেম্বর ওই বৈঠকটি করবে ইসি। এতে ভোটের দিনক্ষণ নিয়েও আলোচনা হবে।

নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ও গণমাধ্যমকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ইসি সচিব জাহাংগীর আলম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘জানুয়ারির প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। স্বচ্ছতার স্বার্থে আপনারা (পর্যবেক্ষক) এই নির্বাচনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনে পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো বাধা নেই।’

দেশে অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন দায়বদ্ধ উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশন বলেছে, ‘আমরা চাই, দেশি সংস্থার পাশাপাশি বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে পর্যবেক্ষকরা আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন পরিদর্শনে আসুন। আমরা বিদেশি পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমকে আমাদের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। এ ক্ষেত্রে আগ্রহীদের ২১ নভেম্বর প্রকাশিতব্য “গাইডলাইনস ফর ইন্টারন্যাশনাল ইলেকশন অবজারভার্স অ্যান্ড ফরেন মিডিয়া” অনুসরণ করে আবেদনের আহ্বান জানাচ্ছি।’

চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘আগ্রহীদের অনুগ্রহ করে এ গাইডলাইনের ২.৩, ২.৪, ২.৫, ২.৬ ও ৩.১ অনুসরণ করার জন্য বলা হলো। এ গাইডলাইন পাওয়া যাবে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে।’

চিঠিতে এ বিষয়ে ইসি কর্মকর্তা বলেন, ‘বহির্বিশ্বে জানানোর জন্য আমরা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে আমাদের দূতাবাস ও মিশনগুলোতে পাঠিয়েছিল। যাতে বহির্বিশ্ব এ বিষয়ে আরও ভালোভাবে অবগত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে যাতে নিয়ম মেনে আগ্রহীরা আবেদন করতে পারে।’

গত বছর ২৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণের মাধ্যমে দায়িত্বভার গ্রহণ করে বর্তমান কমিশন। দায়িত্ব গ্রহণের পর নির্বাচনী রোডম্যাপ প্রণয়নসহ একগুচ্ছ কর্মসূচি গ্রহণ করে।

ইসির তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনী কেনাকাটা ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর ব্যালট পেপারের কাগজ সংগ্রহ করা হবে ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়ের পর মুদ্রণের কাজ হবে। রোডম্যাপ অনুযায়ী নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। তফসিল ঘোষণার পর কখন কোন কাজ করা হবে, তার রূপরেখাও চূড়ান্ত করা হয়েছে।

এদিকে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে আসছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। যদিও দায়িত্ব নেওয়ার চার মাস পরই নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে ডাকে কমিশন। কিন্তু বিএনপি ও সমমনা দলগুলো তা বর্জন করে। আবার সংলাপের উদ্যোগ নিয়েও বিএনপি ও সমমনাদের সাড়া পায়নি আউয়াল কমিশন। পরে সংলাপে না আসা দলগুলোকে চিঠি দিয়েও জবাব পায়নি সাংবিধানিক সংস্থাটি।

সম্প্রতি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি, সাবেক নির্বাচন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে আসছে আউয়াল কমিশন। যা এখনো চলমান। এ পর্যন্ত হওয়া আলোচনায় অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের তাগিদ এসেছে। এসব আলোচনায় সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনকালীন সংকট রাজনৈতিকভাবে ফয়সালা করতে হবে। কমিশন চায়, রাজনৈতিক দলগুলো এক টেবিলে বসুক। এখানে নির্বাচন কমিশনের কিছু করার নেই। আইন ও সংবিধানের অধীনে থেকেই কাজ করবে নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী জানুয়ারির ২৯ তারিখের মধ্যে নির্বাচন হতে হবে। না হলে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হবে।

এদিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিলের আগেই বড় আন্দোলনে যেতে চাইছে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো। তফসিল ঘোষণার আগেই সরকারের ওপর একটি বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে চায়। একই ঘোষণা দিয়েছে বাম দলগুলো। নির্বাচন কমিশন ঘেরাও কর্মসূচিতে বাম দলের নেতারা বলেছেন, তফসিল ঘোষণা করা হলে তা প্রতিহত করা হবে।

একইভাবে সরকারের মিত্র এবং সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও বলছে, দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলও বাংলাদেশে নির্বাচন সহায়ক পরিবেশ নেই জানিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অর্থবহ আলোচনার সুপারিশ করেছে।

তবে বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমের সম্পাদকদের বরাবর পাঠানো এক ধারণাপত্রে নির্বাচন কমিশন বলেছে অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক এবং উৎসবমুখর নির্বাচনের যে অনুকূল পরিবেশের প্রত্যাশা করা হয়েছিল, সেটি এখনো হয়ে ওঠেনি। ধারণাপত্রে ইসি আরও বলেছে, প্রত্যাশিত সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে মতভেদ নিরসন হয়নি। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধানতম দলগুলো নিজ নিজ সিদ্ধান্ত ও অবস্থানে অনড়। রাজপথে মিছিল, জনসমাবেশ ও শক্তি প্রদর্শন করে নিজ নিজ পক্ষে সমর্থন প্রদর্শনের চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু তাতে প্রত্যাশিত মীমাংসা বা সংকটের নিরসন হচ্ছে বলে কমিশন মনে করে না। বিষয়টি রাজনৈতিক। নির্বাচন কমিশনের এ ক্ষেত্রে করণীয় কিছু নেই।

চিঠিতে আরও বলা হয়, নির্বাচন আয়োজনে যদি সংকট নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত থাকে, তাহলে গণতন্ত্র বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।

এর আগে নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আনিছুর রহমান। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী হবে না হবে, আমরা কিছুই বলতে পারছি না। তবে আমরা আশা করি একটি ভালো পরিস্থিতি হবে। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ও নিরাপত্তার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতা করলে পরিবেশ একরকমের হবে, না করলে অন্যরকম হবে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন বারবার বলছে, কারও নির্বাচনে আসা না আসা একটি রাজনৈতিক সমস্যা। এর রাজনৈতিক সমাধান হতে হবে। তাহলে তারা বলুক আগে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধান করুন, তারপর নির্বাচন হবে। কিন্তু তারা তা না করে সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে।’