শীত আসার আগেই নারায়ণগঞ্জে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২০ ঘণ্টাই গ্যাস থাকছে না। দিনের বেলায় না থাকলেও গভীর রাতে গ্যাসের চাপ বাড়ছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন গৃহিণীরা। গ্যাস-সংকটের কারণে শিল্প-কারখানার স্বাভাবিক উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জের কলেজ রোড এলাকার বাসিন্দা ডা. রাসেল আহমেদ জানান, গ্যাস না থাকায় তাদের রান্নার কাজে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। রাত ১২টার পর গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লেও সকাল ৬টার আগেই চাপ কমে যাচ্ছে।
মাসদাইর এলাকার আফরোজা বেগম বলেন, চুলায় নিভু নিভু গ্যাস দিয়ে কোনো কিছুই করা যাচ্ছে না। ইসদাইর এলাকার ডালিম চৌধুরী বলেন, গ্যাস-সংকটের কারণে তাদের বাড়িতে মাসে দুটি করে তরল গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে বাড়িতে মাসিক রান্নার খরচ তিন-চার গুণ বেড়ে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের বাবুরাইল, পাইকপাড়া, নয়াপাড়া, জল্লারপাড়, শীতলক্ষ্যা, তামাকপট্টি, নলুয়া, দেওভোগ, নিমতলা, সুতারপাড়া, মণ্ডলপাড়া, টানবাজার, কালীর বাজার, পালপাড়া, কাশিপুর, গলাচিপা, নন্দীপাড়া, গোয়ালপাড়া, কলেজ রোড, জামতলা, ইসদাইর, মাসদাইর, গাবতলী, উত্তর চাষাঢ়া, চাঁদমারী, মিশনপাড়া, আমলাপাড়া, ডন চেম্বার, ব্যাংক কলোনি, খানপুর, তল্লা, পাঠানতলী, হাজীগঞ্জ ছাড়াও গোদনাইল, জালকুড়ি, সস্তাপুর, দক্ষিণ সস্তাপুর, কাঠেরপুল, কোতালেরবাগ, লালখাঁ, সেহাচর, পাগলা, পঞ্চবটী, ভোলাইলসহ বন্দর থানার সব কটি এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে।
তিতাস গ্যাস অফিসের হিসাব মতে, শুধু নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় প্রায় ৬৭ হাজার বৈধ গ্যাস সংযোগধারী গ্রাহক রয়েছে। অবৈধ সংযোগ রয়েছে লক্ষাধিক।
এদিকে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের শিকার বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী এরই মধ্যে প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে কয়েক দফা। এ ছাড়া তিতাস অফিস ঘেরাওসহ নানা কর্মসূচি দিয়েও কোনো সুফল আসছে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জে পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানির সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কারখানা। এর মধ্যে কলকারখানা অধিদপ্তরে নিবন্ধিত রয়েছে ২ হাজার ২০০টি। প্রায় ৩০ লাখ মানুষ তাদের আয়-রোজগারে এসব কারখানার ওপর নির্ভরশীল। ছোট-বড় সব প্রতিষ্ঠান কয়েক মাস ধরে টানা বাড়তি খরচের মুখে পড়েছে। এর পেছনে রয়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং, গ্যাসের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকা এবং জ্বালানির বাড়তি খরচ। পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী এত দিন কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ না থাকা নিয়ে অভিযোগ ছিল। বিদ্যুৎ-বিভ্রাট শুরু হয়ে যাওয়ার পর এলএনজি ব্যবহার করে নিজেদের রক্ষা করতে চাইছিলেন কারখানা মালিকরা। কারণ ডিজেলের চেয়ে এর খরচ তুলনামূলক কম। তবে বাজারে পর্যাপ্ত এলএনজি না থাকায় ডিজেল কিনে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হচ্ছে। উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত খরচ এতটাই বেড়ে যাচ্ছে, যা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ছোট ও মাঝারি অনেক কারখানা বসে যাবে।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে জানান, গ্যাস সংকটের কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাতের বেলা গ্যাসের প্রেশার পাওয়া গেলেও দিনের বেলায় তেমন একটা প্রেশার পাওয়া যায় না। প্রেশার ওঠানামা করার কারণে গার্মেন্টসের ফেব্রিকস ডাইং করাতে গিয়ে নষ্ট হচ্ছে। ঠিকমতো কালার হচ্ছে না। এতে করে সময়ের অপচয় হচ্ছে। পাশাপাশি কাটিং, সুইং করাতে গিয়ে হচ্ছে দেরি। ফলে শিপমেন্ট ব্যাহত হয়ে সরবরাহ করা মাল স্টক লটে পরিণত হচ্ছে। লোকসান গুনতে হচ্ছে গার্মেন্টস মালিকদের।
তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন অ্যান্ড ট্রান্সমিউশন কোম্পানি লিমিটেড নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের ডিজিএম মামুনুর রশীদ বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট। সেখানে আমরা পাচ্ছি ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ না থাকায় গ্যাসের সংকট রয়েছে। বর্তমানে শিল্প-কারখানা ও আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে সমন্বয় করে গ্যাস সরবরাহ চালু রাখা হয়েছে।’