চেন্নাইয়ের এম. চিদাম্বরাম স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানের সঙ্গে খেলতে নামার আগে পাকিস্তানের সবাই চাইবে স্মৃতির মণিকোঠায় ফিরে যেতে। সেই ১৯৯৭ সালে। এখনকার পাকিস্তান দলের ওপেনার ইমামের বয়স তখন দুই বছর। আবদুল্লাহ শফিক তো তখন জন্মই নেননি। সেই সময় এই মাঠেই সাঈদ আনোয়ার গড়েছিলেন এক অমর কীর্তি। পাকিস্তানের সর্বসেরা উদ্বোধনী ব্যাটার সাঈদ আনোয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপে খেলেন ১৯৪ রানের অতিমানবীয় ইনিংস। তাও আবার ভারতের বিপক্ষে। ওয়ানডে ইতিহাসে তখনকার সর্বোচ্চ রানের ওই ইনিংসের প্রসঙ্গ টেনে আনার কারণ আছে। সবশেষ দুই ম্যাচে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার কাছে শোচনীয় হারের পেছনে পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানদের দুর্দশাই যে দায়ী।
পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার এবং ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান রমিজ রাজা রাখঢাক না করেই বলে বসেছেন, ‘পরের ম্যাচে আফগানিস্তানই বেশি ফেভারিট।’ কারণ হিসেবে তিনিও ‘ব্যাট হাতে ব্যর্থতা’কে দায়ী করেছেন। ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে গতকাল পাকিস্তানের প্রতিনিধি ছিলেন ইমাম-উল-হক। অগ্রজের দেওয়া দায় মাথা পেতে নিয়ে অকপটে স্বীকার করেছেন, ‘ভালো খেলতে পারিনি বলেই ম্যাচের ফল আমাদের পক্ষে আসেনি। ভালো শুরুর পরেও আমাদের ধস নেমেছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারিনি আমরা।’
অবশ্য পাকিস্তান আসরটা শুরু করেছিল ঠিক মনের মতো। প্রথম দুই ম্যাচেই তারা জয় তুলে নেয় নেদারল্যান্ডস ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। লঙ্কানদের সঙ্গে বিশ্বকাপে রান তাড়া করার রেকর্ডও গড়ে বসে। ৩৪৫ রানের লক্ষ্যে পৌঁছায় ৬ উইকেট হাতে রেখে। পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে একমাত্র মোহাম্মদ রিজওয়ানের ব্যাটই রয়েছে হাসিমুখে। ৯৮ গড় আর ৯৬ স্ট্রাইকরেটে বিশ্বকাপের চার ম্যাচে তার রান ২৯৪। তার ব্যাট থেকে আসা ইনিংসগুলোর চেহারা ৬৮, ১৩১*, ৪৯ ও ৪৬। শেষ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ব্যাটিং ধসের আগে রিজওয়ানের ব্যাটে সওয়ার হয়েই জয়ের দিকে এগোচ্ছিল পাকিস্তান। অন্য সবার ব্যর্থতায় যা আর হয়ে ওঠেনি। আর একেবারেই বাজে সময় পার করছেন দলের সেরা ব্যাটসম্যান ও অধিনায়ক বাবর আজম। ভারতের বিপক্ষে ফিফটি বাদ দিলে বাকি তিন ম্যাচে তার ব্যাট থেকে এসেছে ৫, ১০ ও ১৮ রানের ইনিংস।
পাকিস্তান সংশয়ে আছে তাদের স্পিন বিভাগ নিয়েও। আফ্রিদি-রউফরা কোনোমতে সামলে নিলেও শাদাব, নাওয়াজ কিংবা উসামা নিজেদের মেলে ধরতে পারছেন না একেবারেই। চার ম্যাচে তাদের স্পিনারদের সাকুল্যে উইকেট শিকারের সংখ্যা মাত্র ৬টি। চিপকের ঐতিহাসিক স্পিন সহায়ক পিচে যে পরিসংখ্যানটি আশঙ্কার উদ্রেক ঘটানোর জন্য যথেষ্ট। আর বিপরীত পাশে যখন রশিদ-মুজিব-নবিদের মতো বাহারি স্পিনারদের মেলা, তখন শঙ্কা ভয়ে পরিণত হওয়াটাই স্বাভাবিক।
পাকিস্তানের আরেকজন সাবেক ক্রিকেটার আমির সোহেল নিজের দেশের বিশ্বকাপ পারফরম্যান্স নিয়ে চটুলতা করার সুযোগ ছাড়েননি। তিনি বলে বসেছেন, ‘বিশ্বকাপে ফর্মে না থাকা দলগুলোকে ফর্মে ফেরার সুযোগ করে দিচ্ছে পাকিস্তান।’ আমির সোহেলের এই বক্তব্য থেকে বুক ভরে প্রেরণা নিতে পারেন আফগান ক্রিকেটাররা।
প্রথম দুই ম্যাচে বাংলাদেশ ও ভারতের কাছে হার দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করে তারা। তৃতীয় ম্যাচেই আসে আফগান ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে সুখের মুহূর্ত। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডকে হারিয়ে এই বিশ্বকাপের প্রথম অঘটন ঘটিয়ে ফেলে হাসমতউল্লাহ শাহিদির দল। কিন্তু তার পরের ম্যাচেই পরাক্রমশালী নিউজিল্যান্ডের সামনে ব্যাট-বলের সেই ধার দেখাতে পারেনি আফগানরা। তাই চার ম্যাচের তিনটিতে হেরে পয়েন্ট টেবিলের সবার নিচে জায়গা পেয়েছে রশিদ খানরা। এবার তাদের সামনে সুযোগ ঘুরে দাঁড়ানোর।
এক্ষেত্রে আফগানদের সবচেয়ে বড় বাধা মনের ভয়। পাকিস্তানকে আগে কখনোই হারাতে পারেনি কাবুলিওয়ালারা। ৭ দেখায় ৭ বার পরাজয়ের একটি গত বিশ্বকাপে। তবুও হেডিংলির ওই ম্যাচে ২৩০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত লড়তে হয়েছিল পাকিস্তানকে। ম্যাচের দুই বল বাকি থাকতে ৩ উইকেটে ম্যাচ জিতেছিল পাকিস্তান।
আফগান গুরু জোনাথন ট্রট কেবলমাত্র স্পিনারদের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে বসে থাকতে নারাজ। তিনি বিশ্বাস করেন জিততে হলে ‘এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে।’ নিজেদের শেষ ম্যাচটা চেন্নাইতেই খেলে আফগানরা। এই মাঠে শেষ ১০ ম্যাচে প্রথম ইনিংসের গড় রান ২৬৪। কিউইরা শেষ ম্যাচে করেছিল ২৮৮। আফগান কোচের ইচ্ছা শুরুতে ব্যাটিং পেলে ইংল্যান্ড ম্যাচের মতো একটা সংগ্রহ দাঁড় করিয়ে পাকিস্তানকে চাপে ফেলার। সেক্ষেত্রে চার ম্যাচে ১৫৯ রান করা রহমানউল্লাহ গুরবাজকে নিতে হবে দায়িত্ব।
পাকিস্তানের বোলিংয়ের কাছে মাথা তুলে দাঁড়ানোটা সহজ নয়। তবুও আসরটা যেহেতু বিশ্বকাপ, ব্রেন্ডন ম্যাককালামের ভাষায় আরও একটা ‘অঘটনের আশা করতেই পারেন ক্রিকেটপ্রেমীরা’। আর যদি ফের অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারে কাবুলিওয়ালারা, তবে তাদের জায়গাটা একটু হলেও মজবুত হবে। বিশ্বকাপটাও হয়ে উঠবে আরেকটু রঙিন। তবে ফল যাই হোক ডুরান্ড লাইনের দুই পাশের দুই প্রতিবেশী উত্তেজনা ছড়াক চেন্নাইতেÑ সেটাই প্রত্যাশা।