অপ্রিয় বচনের আভিধানিক অর্থ যাই হোক না কেন, মাঝে মাঝে সেটা অনাকাক্সিক্ষত সত্য প্রকাশ করে বলে সেটা ভুক্তভোগীদের স্বস্তির কারণ হয়। বিশেষ করে সেটা যদি অচলাবস্থা বা নিয়তি হিসেবে মেনে নেওয়া দুর্ভোগের কথা প্রকাশ করে দেয়। সে কথায় পড়ে আসছি। কথায় বলে যে, ‘ওপরে ফিটফাট তল দিয়ে সদরঘাট।’ অর্থাৎ যতই উন্নত, ভালো, সুন্দর দেখা যাক না কেন, আসলে তা মোটেও তেমন নয়।
এ কথা ঢাকাবাসী সবাই মানবেন যে সব মিলিয়ে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থা নগরবাসীর কাছে দুঃস্বপ্নের মতো। উড়াল সড়ক, মেট্রোরেল, ইউলুপ, এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে একের পর এক বৃহৎ ও আধুনিক কাঠামো করার পরও স্বস্তি মিলছে না, ভোগান্তি বাড়ছে। এতসব অবকাঠামো নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে কম গতির শহরের অন্যতম হচ্ছে আমাদের ঢাকা। শুরুতে যে অপ্রিয় বচনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, রাজধানীর পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে তেমনই এক মন্তব্য করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সোমবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মন্ত্রী বলেছেন, ‘আমাদের গাড়িগুলোর দিকে তাকালে মনে হয় এত গরিব চেহারা! এগুলো তো বাংলাদেশের নয়। ওপরে ইউরোপ আর নিচে গরিব বাংলাদেশ। ঢাকা শহরে মুড়ির টিন (বাস) চলছে। গাড়ির গায়ে লেখা আল্লাহর নামে চলিলাম। যেতে যেতে খাদে অথবা পাশের আইল্যান্ডে। এ হলো অবস্থা।’
রাজধানীবাসীর মনের কথাটাই বলেছেন মন্ত্রী। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯৫ শতাংশ যাত্রী প্রতিদিন যাতায়াতে দুর্ভোগের শিকার হন। গণপরিবহন ব্যবস্থার প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ৯০ শতাংশ যাত্রী। প্রশ্ন হলো, এ নৈরাজ্য কি চলতেই থাকবে?
রাজধানীতে আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে গণপরিবহনের শৃঙ্খলাই সবার আগে জরুরি। সমীক্ষা বলছে, গণপরিবহন হিসাবে রাজধানীতে চলাচলরত ৯৫ শতাংশ বাস-মিনিবাসই মেয়াদোর্ত্তীর্ণ। এ বাসগুলো চলাচলের অনুপযুক্ত, নোংরা এবং বসার অনুপযুক্ত। বেশিরভাগ বাস-মিনিবাস ফিটনেসবিহীন শুধু নয়, এতটাই জরাজীর্ণ যে সেগুলোর দিকে তাকানো যায় না। দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের লক্কড়ঝক্কড় ও মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহনগুলো রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এই লক্ষ্যে যখনই অভিযান শুরু হয়, তখনই দেখা যায় হয় বাসগুলো আত্মগোপনে চলে যায়, ঘোষিত অথবা অঘোষিত ধর্মঘট ডেকে জনগণকে জিম্মি করে ফেলেন প্রভাবশালী মালিক-শ্রমিক নেতারা। কিছুদিন পর গায়ে রংচং মেখে আবার নগর তোলপাড় করতে শুরু করে লক্কড়ঝক্কড় বাসগুলো। অন্যদিকে, গণপরিবহনে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ তো আছেই। একই সড়কে রিকশা, বাস, কারের মতো বিভিন্ন গতির যান চলাচলও আসলে গতি কমিয়ে দেয়।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি, অঙ্গহানির ঘটনাও বাড়ছে। সড়ক দুর্ঘটনার পর রাগ ক্ষোভ গিয়ে পড়ে পরিবহন শ্রমিকদের ওপর। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতায় গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা ও নানা সংকটের পেছনে আসলে শ্রমিকদের দায় কতটা সে বিবেচনা যেমন জরুরি, তেমনি পরিবহন শ্রমিকরা কতটা মানবেতর জীবনযাপন করেন এবং কতভাবে অধিকারবঞ্চিত হন সেই আলোচনাও জরুরি। মন্ত্রীর কথায়ও বিষয়টি যুক্তিসংগতভাবে উঠে এসেছে। সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের অনির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও অসুস্থতা হলেও বিষয়টি বরাবর উপেক্ষিত।
রাজধানীর বাস সার্ভিসগুলোতে নৈরাজ্য কাটিয়ে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় পরিবহন মালিক, যাত্রী, শ্রমিক ও সরকারের ঐকমত্য জরুরি। অবশ্য সড়ক পরিবহনমন্ত্রীর কথায় সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং জনপ্রতিনিধিদের ভোটের রাজনীতির হিসাবের বিষয়টিও উঠে এসেছে। মনে রাখতে হবে, এই নৈরাজ্য বজায় রেখে একটি নিরাপদ ও সুষ্ঠু গণপরিবহন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তাই এখনই গণপরিবহন ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো কোনো কাজেই আসবে না