ডিম সভ্যতার অপরিহার্য অংশ। নামে আর দামে প্রতি মুহূর্তে উচ্চারিত নাম এই ডিম। তথ্যবহুল লেখাটি তৈরি করেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
মানবজীবনের অত্যাবশ্যকীয় খাবার হলো ডিম। ডিম ছাড়া সকাল শুরু হয় না পৃথিবীর কোনো এলাকায়। কিন্তু ডিম নিয়ে অতীত ও বর্তমানে নানা কথা চালু আছে। ডিম নিয়ে রয়েছে অস্বস্তিও। বিশেষ করে দেশের বাজারে ডিমের দাম নিয়ে অনেকদিন ধরেই কথা হচ্ছে। আর সুরাহার বিষয়টিও বলতে গেলে অজানা।
বেশিরভাগ বিজ্ঞানী মনে করেন যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লাল ‘বনমোরগ’ মুরগির পূর্বপুরুষ। বিভিন্ন বনমোরগের মিশ্রণের ক্রমপরিবর্তনে মুরগির আধুনিক চেহারাটি তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ওসেনিয়া সম্ভবত দশ হাজার বছর আগে থেকে মুরগি পালন শুরু হয়।
মানুষের খাদ্য মাংস এবং ডিম সরবরাহ করার ক্ষমতার কারণে মুরগি পালন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে ব্যাপকহারে। তবে এটাও বিশ্বাস করা হয় যে, মোরগের লড়াই এ পোষা প্রাণীর ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ।
ডিএনএ গবেষণায় দেখা যায়, লাল বনমোরগের ত্বকে হলুদ রঙের জিনের অভাব ছিল। এরপর কোনোভাবে ভারতের ধূসর বনমোরগের সঙ্গে তাদের সংকরায়ন ঘটে। এভাবে বিভিন্ন বনমোরগ-মুরগির মিশ্রণের ফলে পাখিজাতীয় এ প্রাণীর শরীরে অনেক রঙ দেখা যায়।
ডিম আগে না মুরগি
আর পৃথিবীর অন্যতম তর্কের বিষয় হলো ডিম আগে না মুরগি আগে। অনেক প্রাচীন এ ধাঁধা।
গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই এ বিষয়ে গবেষণা করছিলেন। তাদের একটি দলের উত্তর হলো, মুরগি আগে, তার পরে ডিম।
তারা বলছেন, মুরগির ডিমের খোসায় এক বিশেষ ধরনের প্রোটিন থাকে। এই প্রোটিনটির নাম ‘ওভোক্লেইডিন’। এটি ছাড়া ডিমের খোসা তৈরি হবে না। আর এই প্রোটিনটি শুধু মুরগির জরায়ুতেই তৈরি হয়। এখন মুরগি যদি আগে না আসত, তাহলে এ বিশেষ প্রোটিনও তৈরি হতো না। ফলে আসত না ডিমও।
তবে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছেন, যদি প্রথম কোনো মানুষ থেকে থাকে তবে সে অবশ্যই বাবা বা মা ছাড়াই জন্মগ্রহণ করেছেÑ যা প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন মুরগি এসে ডিম পেড়েছে।
ধারণা করা হয় যে, বর্তমান মুরগির আগে ‘প্রোটো-চিকেন’ নামে এক পাখি ছিল যেটা প্রোটো এগ নামক ডিম পারত। এটা থেকে মিউটেশন হয়ে একদিন এর প্রোটো এগ ফেটে মুরগি বের হলো যে মুরগি ডিম পাড়তে লাগল। অর্থাৎ, প্রাগৌতিহাসিক মুরগি-সদৃশ এক পাখি ভিন্নধর্মী এক ডিম পাড়ার ফলে উদ্ভব ঘটে আদিতম মুরগির। তাই মুরগির আগেই ডিম এসেছে।
গবেষকরা আরও বলছেন, প্রাচীনতম ডিমটি ১৯ কোটি বছর আগের বলে ধারণা করা হয়। আর এটি ছিল উড্ডয়ন অক্ষম প্রাচীনতম পাখি আর্কিওপটেরিক্সেরও আগের। যার অর্থ পাখির কোনো জাতি আসার আগেই অন্য সরীসৃপ প্রজাতিরা ডিম পাড়ত। এরপর এমন কোনো ডিমের ভেতর ডিএনএতে মিউটেশন হয়েছিল, যার ফলে সরীসৃপ প্রজাতিতে ভিন্নতা আসে। যা ধীরে ধীরে পাখিতে রূপান্তরিত হয়। এতে কোটি বছরও সময় লাগতে পারে।
যার ধারাবাহিকতায় আসে মুরগি।
যা দিয়ে তৈরি
একদম তাজা একটি ডিম কিছুটা উষ্ণ থাকে এবং খোসার ভেতরটা সম্পূর্ণ ভরাট থাকে। এরপর ডিমটি ঠা-া হতে থাকে এবং এর ভেতরের বায়ু সংকুচিত হয়।
ডিমের কুসুম একটি ঝিল্লি দ্বারা বেষ্টিত থাকে যা বর্ণহীন হয়। কুসুমের বিপরীত দিকে দুটি, বাঁকানো, সাদা কর্ডের মতো বস্তু রয়েছে যা চ্যালেজে নামে পরিচিত। তাদের কাজ হলো অ্যালবুমিনের কেন্দ্রে কুসুমকে ধরে রাখা। চ্যালেজের আকার এবং ঘনত্ব পরিবর্তিত হতে পারে। তবে পুষ্টিমান একই থাকে। আর ডিমের খোসায় থাকে কয়েক হাজার ছিদ্র। যা দিয়ে ডিম ‘শ্বাস নিতে’ পারে।
ডিমের সাদা অংশে থাকে অ্যালবুমিন, যা শরীরের অন্যতম একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। একজন সুস্থ মানুষের রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৩.৪ থেকে ৫.৪ গ্রাম অ্যালবুমিন থাকা উচিত। শরীরে অ্যালবুমিনের পরিমাণ এর চেয়ে বেশি বা কম হওয়া ক্ষতিকর। অ্যালবুমিন শরীরে কোলয়েড অসমোটিক চাপ বজায় রাখে, যা অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। বিলিরুবিন, এনজাইম, হরমোন, ফ্যাটি অ্যাসিড, ওষুধ ইত্যাদির বিপাকে সাহায্য করে অ্যালবুমিন।
এক কথায়, এটি শরীরের নিজস্ব ডিটক্সিফিকেশন প্রক্রিয়ার অন্যতম উপাদান। শরীরে অ্যালবুমিনের মাত্রার হ্রাস-বৃদ্ধি, কিডনি ও যকৃতে নানা ধরনের রোগ বাসা বাঁধার সম্ভাবনাকেই নির্দেশ করে। অ্যালবুমিনের ভারসাম্যের অভাবে হাত-পা ফুলেও যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
গঠন
খোসা : ব্যাকটেরিয়া প্রবেশের বিরুদ্ধে ডিমের প্রতিরক্ষার প্রথম স্তর। মুরগির জাতের ওপর নির্ভর করে সাদা বা বাদামি হতে পারে খোসা। তবে এর পুষ্টিগুণ একই। আনুমানিক ১০ হাজার ছিদ্র রয়েছে এতে। যা আর্দ্রতা এবং গ্যাসকে ভেতরে এবং বাইরে যেতে দেয়।
বায়ু কোষ : ডিম পাড়ার পরে ঠা-া হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রান্তে গঠিত হয় বায়ু কোষ। ডিম যত টাটকা, বায়ু কোষ তত ছোট।
অ্যালবুমিন : অ্যালবুমিন হলো ডিমের সাদা অংশ এবং ডিমের ওজনের বড় অংশ। এর দুটি স্তর আছে। একটি পুরু এবং পাতলা অ্যালবুমিন। এই সাদা অংশ উচ্চমানের প্রোটিন এবং খনিজ দিয়ে তৈরি।
কুসুম ঝিল্লি : কুসুমকে ঘিরে রাখে এবং ধারণ করে। ডিম যত তাজা হবে, ঝিল্লি তত শক্তিশালী হবে।
কুসুম : ডিমের ভিটামিন এবং খনিজগুলোর প্রধান উৎস এবং ডিমের ওজনের তিনভাগের একভাগ প্রতিনিধিত্ব করে। মুরগির খাবারের ওপর নির্ভর করে রঙ হালকা হলুদ থেকে গভীর কমলা পর্যন্ত হয়ে থাকে। কুসুমের রঙ ডিমের পুষ্টিমানকে প্রভাবিত করে না।
চ্যালেজে : এক জোড়া সর্পিল ব্যান্ড যা পুরু অ্যালবুমিনের কেন্দ্রে কুসুমকে ধরে রাখে। ডিম যত বেশি সতেজ, চ্যালেজে তত বেশি বিশিষ্ট।
ডিমের খোসার অভ্যন্তরে দুটি ঝিল্লি রয়েছে। যার একটি খোসার সঙ্গে লেগে থাকে এবং অন্যটি অ্যালবুমিনকে ঘিরে থাকে।
রূপকথা
ডিম নিয়ে নানা মুখরোচক কল্পকাহিনি, রম্যলেখা, সাহিত্য, কবিতা, গল্প, উপন্যাস রয়েছে। আমাদের সংস্কৃতিতে পরীক্ষা খারাপ হলে ‘ডিম পাবে’, নেতিবাচক কোনো কিছু হলে ‘ঘোড়ার ডিম’, ক্ষুব্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে ‘পচা ডিম’ ইত্যাদি রয়েছে।
পৃথিবীর সব দেশেই ডিম নিয়ে রয়েছে রূপকথা। কোনো ডিম সোনার, কোনো ডিম কথা বলে। ডিম নিয়ে গল্প রয়েছে বাংলাদেশেও। যেমন, এক কৃষক অলৌকিকভাবে একদিন একটি সোনার ডিম পাড়া মুরগি পেল। সে তার বউকে এসে মুরগিটি দিয়ে বলল, এটার দিকে বিশেষ খেয়াল রেখো, ঠিকঠাক মতো খেতে দেবে। বিনিময়ে সে রোজ সকালে একটি সোনার ডিম পাড়বে। এভাবেই প্রতিদিন তার বউ সকালে উঠে একটি করে সোনার ডিম সংগ্রহ করত। এভাবে দিন কাটছিল তাদের। একদিন কৃষকের বউয়ের লোভ হলো। সে ভাবল, নিশ্চয় মুরগিটার পেট ভর্তি অনেক সোনার ডিম আছে। তাই সে ঠিক করল, একসঙ্গে সবকটা ডিম বের করে নেবে। তাই মুরগিটা জবাই করে পেট কাটল সে। কিন্তু অবাক হয়ে দেখল, অন্য যে কোনো মুরগির মতোই এর পেটে কোনো ডিম নেই। বোকা ও লোভী রাতারাতি বড়লোক হতে গিয়ে নিশ্চিন্তে রোজ যেটা পাচ্ছিল সেটাও হারিয়ে বসল। যে কারণে আমরা বলি লোভের পরিণতি সর্বনাশ। তাই লোভ কোরো না।
পুষ্টি
একটি ডিমে রয়েছে ৭৭ ক্যালরি, প্রায় ৬.৩ গ্রাম উচ্চমানের প্রোটিন, আয়রন, ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি, ভিটামিন ই, ভিটামিন বি-১২, ফলেট, সেলেনিয়াম। মেধাবী, সুস্থ-সবল, উন্নত জাতি গঠনে প্রতিদিন একটি করে ডিম খাওয়াকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে বছরে কমপক্ষে ১০৪টি ডিম খাওয়াকে বাধ্যবাধকতার মধ্য ফেলেছেন।
ব্রিটেনের চিকিৎসকরা বলছেন, ‘ডিমে যদিও কিছু কোলেস্টেরল আছে, কিন্তু আমরা অন্যান্য ক্ষতিকর চর্বিজাতীয় যেসব পদার্থ এর সঙ্গে খাই (যেগুলো স্যাচুরেটেড ফ্যাট নামে পরিচিত) সেগুলো রক্তে কোলেস্টেরলের যতটা ক্ষতি করে, ডিমের কোলেস্টেরল সে ক্ষতি করে না।’
এক কথায়, কোলেস্টেরলের সমস্যার কথা যদি ভাবেন, ডিম সেখানে কোনো ক্ষতির কারণ নয়। যে ক্ষতিকর চর্বি বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট দিয়ে ডিম রান্না করছেন সেটা সমস্যার কারণ হতে পারে। কাজেই কীভাবে ডিম রাঁধবেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ।
আশির দশকে ব্রিটেনের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডিমের সঙ্গে স্যালমোনেলা জীবাণুকে জড়িয়ে মন্তব্য করার পর ব্রিটেনে ডিম খাওয়া নিয়ে বিরাট ভীতি তৈরি হয়েছিল। তবে আশির দশকে ডিমে স্যালমোনেলা জীবাণুর সংক্রমণের একটা সমস্যা ছিল। পরে নব্বইয়ের দশকে ডিম খামারিরা টিকা কর্মসূচি চালু করার পর এই জীবাণুর সমস্যা এখন আর নেই বললেই চলে।
বেশিরভাগ পুষ্টিবিদ ডিম ভাজা করে না খাওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ ডিম যে তেলে বা মাখনজাতীয় চর্বিতে ভাজা হয়, তার মধ্যকার স্যাচুরেটেড ফ্যাট কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে।
সংরক্ষণ
বিবিসির খাদ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো ডিম ফ্রিজে রাখুন- ডিম রাখার বিশেষ যে বাক্স ফ্রিজে থাকে সেখানে ডিম সবচেয়ে ভালো থাকে।
একটা পাত্রে ঠাণ্ডা পানিতে গোটা ডিম রাখুন- যদি ডিম ডুবে পাত্রের তলায় চলে যায়, তাহলে বুঝবেন ডিম তাজা আছে। ডিম যদি ভেসে থাকে তাহলে বুঝতে হবে ডিমটা তাজা নেই।
তবে অনেক সময়ই ডিমের বাক্সের গায়ে লেখা থাকে কোন তারিখের মধ্যে ডিম ব্যবহার করে ফেলতে হবে- যা হয় সাধারণত ডিম পাড়ার পর ২৮ দিন পর্যন্ত।