সব মানুষের রক্ত যেমন লাল, তেমনি সবার জন্য এক দিনে বরাদ্দ থাকে ২৪ ঘণ্টা। অর্থ, বিত্ত, বর্ণ অথবা ভৌগোলিক অবস্থান যা-ই হোক না কেন, বরাদ্দ এ সময় কাটে কীভাবে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
কালজয়ী রাশিয়ান লেখক লিও তলস্তয়ের একটি গল্প বহুল পঠিত। মানবজীবনের গূঢ় চরিত্র উন্মোচনের প্রয়োজনে সেই গল্পের ব্যবহার চলছে যুগের পর যুগ। গল্পটি রাশিয়ার এক লোভী লোক ‘পাহম’কে নিয়ে। যার জমি কেনার নেশা। কম দামে জমি কেনার সুযোগ পেলেই তিনি অস্থির হয়ে যান। সেটা কিনতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। একবার মাত্র এক হাজার রুবলে যত ইচ্ছা তত জমি কেনার সুযোগ পেলেন তিনি। শর্ত ছিল সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে তাকে ফিরে আসতে হবে নির্দিষ্ট জায়গায়। তবে লোভী পাহম জমির লোভে সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সূর্যাস্তের আগে তার ফিরতে খুব কষ্ট হয়ে যায়। যেখানে ফেরার কথা, সেখানে ফেরে ঠিকই, তবে ততক্ষণে তার মৃত্যু হয়ে যায়।
পাহমের মতো অনেক মানুষ থাকেন যারা জীবনভর সম্পদ অর্জনের পেছনে সময় ব্যয় করেন। সময় মানে টাকা এ কথাও প্রচলিত হয়ে গেছে। তবে সম্পদের পরিমাণ যার যা-ই থাকুক, যে যত বছর বাঁচুক, সবার জন্য একদিনে বরাদ্দ থাকে ২৪ ঘণ্টা। বিশ্বজুড়ে মানুষ কীভাবে এই ২৪ ঘণ্টাকে ব্যবহার করে তা নিয়ে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’। যদিও গবেষণাটি প্রকাশিত হয় গত জুনে। ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকা’ তার কিছু অংশ তাদের অনলাইনে প্রকাশ করে কয়েকদিন আগে।
যেভাবে ব্যয় হয়
তাদের প্রতিবেদনে জানা যায়, মানুষ বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় করে ঘুমের পেছনে। বিশ্বের ৮০০ কোটি মানুষ দৈনিক ৯.৪ ঘণ্টা ব্যয় করে ঘুমিয়ে অথবা শুয়ে শুয়ে তন্দ্রা দিয়ে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৪০-এরও বেশি দেশের গবেষকরা ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ৫৮টি দেশের মানুষের ওপর জরিপ পরিচালনা করে বুঝতে চেয়েছে পৃথিবীর প্রায় আট বিলিয়ন মানুষ প্রতিদিন কীভাবে সময় কাটায়।
এর মধ্যে রয়েছে শরীর পরিচর্যায় বিশ্বের মানুষ ব্যয় করে ১.৬ ঘণ্টা। এর মধ্যে ১.১ ঘণ্টা যায় স্নান করা, শরীর পরিষ্কার করা, পোশাক পরা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, ব্যক্তিগত সেবায়। শিশুকে খাওয়াতে, যতœ নিতে, নিরাপত্তা দিতে যায় ০.৩ ঘণ্টা। পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা নিতে, রোগ নির্ণয় করাতে ০.২ ঘণ্টা সময় যায়।
নিজেদের জন্য বলতে তারা স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়, চারপাশের খবর রাখে এবং বিশ্বপরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চায়। এর প্রায় অর্ধেক (৪৮ শতাংশ) ‘সামাজিক কার্যকলাপে’ ব্যয় করা হয়। যার মধ্যে রয়েছে পড়া, মোবাইল-কম্পিউটার-ট্যাব-ল্যাপটপ-টিভি দেখা, গেম খেলা, হাঁটতে যাওয়া, সামাজিকীকরণ বা কিছু না করে বসে থাকা।
এ ছাড়া আরও কিছু সময় মানুষ ব্যয় করে, যেমন খাদ্য। এর পেছনে দৈনিক ৫২ মিনিট সময় ব্যয় হয়। এর মধ্যে ৪৪ মিনিট খাদ্য উৎপাদন ও সংগ্রহে, ৫ মিনিট যায় খাওয়ার জন্য খাদ্য প্রস্তুত করার কাজে এবং ৩ মিনিট ব্যয় হয় খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করার কাজে।
কিছু কিছু কাজ আছে যার পেছনে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ব্যক্তি অথবা সামষ্টিক মানুষের সময় ব্যয় প্রভাব ফেলে জলবায়ুতে। পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের আচরণ জলবায়ুকে বদলে দিচ্ছে প্রতিদিনই।
সম্প্রতি আরেক জরিপে দেখা যায়, সোশ্যাল মিডিয়াতে ব্যয় করা সময়ের পরিমাণও প্রতিদিন দুই মিনিট বেড়ে ২ ঘণ্টা ২৬ মিনিট হয়েছে।
বিবর্তন
সময় ব্যয়ের এ হিসাব আধুনিককালের। এ সময়ে মানুষ যেমন অনেক বেশি সময় ব্যয় করে থাকে প্রযুক্তির সঙ্গে। আগের সময়ে সেটা ছিল প্রকৃতির সঙ্গে। অনেক বেশি ধার্মিক, সাংস্কৃতিক জীবনযাপন করত মানুষ। তবে আধুনিক যুগে এসে যন্ত্র ও প্রযুক্তির সঙ্গেই সময় বেশি কাটাতে হয়। এ ছাড়া বিশ্বের ভূ-রাজনীতিও অনেক মানুষের জীবনযাপনকে প্রভাবিত করে।
যেমন আদিম যুগে মানুষ তার ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে নিজের বাইরের জগৎ থেকে তথ্য পেত। তখন মানুষের ইন্দ্রিয় স্থানীয় পরিবেশ, পরিস্থিতি অনুভব করতে পারত। আধুনিক যুগে ইন্দ্রিয় দিয়ে আবহাওয়া, সময় বোঝার প্রয়োজন হয় না। যে কারণে এখনকার যুগ অনেক দ্রুত। অনেক ঘটনা ঘটে। অনেক কিছু নিয়ে মানুষ ব্যস্ত থাকতে পারে।
কৃষিনির্ভর দেশের নাগরিকদের বেশি সময় ব্যয় হয় কৃষিকাজের পেছনে। শস্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিপণন, পশুপালনে তাদের অনেক সময় দিতে হয়। আধুনিক ও উন্নত বিশ্বের নাগরিকদের জীবন অনেক ভিন্ন। তারা করপোরেট সংস্কৃতি, সেখানকার ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী সময় অতিবাহিত করে।
অনাধুনিক ও প্রাচীন সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তি এ চব্বিশ ঘণ্টায় কম কাজে নিজেকে যুক্ত রাখতে পারে। আবার প্রযুক্তির দিক দিয়ে উন্নত এমন দেশে বা শহরে ব্যক্তিমানুষ অল্প সময়ে অনেক কাজে নিজেকে যুক্ত রাখে।
সংস্কৃতি অনুযায়ী ব্যয় হতে পারে সময়। যেমন সময়ের সমীক্ষায় দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ানরা বৈশ্বিক গড় হিসাবে বিছানায় যত সময় ব্যয় করে তবে তারচেয়ে বেশি সময় সামাজিক ও আনন্দদায়ী কাজে ব্যয় করে। যার পরিমাণ প্রতিদিন ৫ ঘণ্টা, অন্যদের ক্ষেত্রে যা ৪.৬ ঘণ্টা। এ ছাড়া দেখা যায় যে অস্ট্রেলিয়ানরা প্রতিদিন প্রায় ০.৯ ঘণ্টা নিজেকে সাজানোর জন্য ব্যয় করে। যার বিশ্বব্যাপী গড় ১.১ ঘণ্টা।
দর্শন
মরমি সাধক লালন গেয়েছিলেন, ‘সময় গেলে সাধন হবে না’। সময়ের কাজ সময়ে করতে না পারলে বড় বিপদ দেখা দিতে পারে। সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন যে কোনো মানুষই এটা জানে। তারপরও সময়ের হিসাব মেলানো যায় না। ঘুম থেকে উঠে আরেক ঘুমে চলে যাওয়ার চক্রে তার দিন অতিবাহিত হয়ে যায়। বাকি থেকে যায় অনেক কাজ, অনেক কিছু করার প্রয়োজন দেখা দেয়। শুধু কাজের কথাই বলি কেন, মানুষের শখ, আহ্লাদ, ইচ্ছা, অনুভূতির অনেক কিছুও অপূরণীয় থেকে যায়। একদিনে ২৪ ঘণ্টা তাই অনেকের কাছে কম হয়ে যায়। মনে হয় দিনটা যদি আরও কয়েক ঘণ্টা বাড়ানো যেত, তাহলে আরও কিছু কাজ সেরে নিতে পারতেন।
মানুষের এ মনের অবস্থা বুঝেই বিশ্বজুড়ে গড়ে উঠেছে অনেক সংগঠন, সংস্থা বা কমিউনিটি যারা সময় ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করেন। মানুষকে তারা বুদ্ধি দেন কীভাবে দিনের এই চব্বিশ ঘণ্টাকে সর্বোচ্চ ব্যবহার উপযোগীভাবে কাজে লাগানো যায়।
চব্বিশ ঘণ্টার এই ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইংরেজ ঔপন্যাসিক এনোক আর্নল্ড বেনেট একটি বই লিখেছেন। পশ্চিমা বিশ্বে বইটি বেশ আলোচিত। এর নাম ‘হাউ টু লিক অন টুয়েন্টি ফোর আওয়ার্স এ ডে’। তিনি বলেছিলেন, প্রতিদিনের এই চব্বিশ ঘণ্টা নিয়েই আপনাকে বাঁচতে হবে। এ সময়ের ভেতরে থেকেই আপনাকে স্বাস্থ্য, আনন্দ, অর্থ, সম্মান এবং আপনার অমর আত্মার পরিচর্যা করতে হবে। তিনি বলেছেন, অর্থ হলো সামান্য বিষয় সময়ের তুলনায়।
এ লেখক ২৪ ঘণ্টাকে সবচেয়ে উপযুক্তভাবে কাজে লাগানোর জন্য সহজ একটি উপায় বাতলে দিয়েছেন। আর সেটি হলো সকালে এক, দেড় বা দুই ঘণ্টা আগে ওঠা। তিনি বলছেন, ‘সকালের এক ঘণ্টায় ততটা কাজ এগিয়ে নিতে পারবেন, যতটা করতে প্রায় দুই সন্ধ্যা চলে যাবে।’ তার আরও পরামর্শ, সকালে এক কাপ চা বানিয়ে শুরু করতে। তার ভাষ্য, মূর্খদের কাছে এসব পরামর্শ তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু চিন্তাশীলদের কাছে এগুলো তুচ্ছ মনে হবে না।
তিনি বলেন, অনেকে আছেন যাদের বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহল রয়েছে। তারা পড়তে চান। যেমন ব্রিটিশরা সাহিত্যপাঠে সময় ব্যয় করে।
বাংলাদেশে
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এ ধরনের একটি জরিপ করেছিল। সেখানে আট বিভাগের ১৫ বছরের বেশি বয়সী আট হাজার মানুষের সময় ব্যবহারের তথ্য জানানো হয়।
ওই জরিপের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, এই বয়সী নারী ও পুরুষ সংসারে ও সমাজে দৈনিক কোন কাজে কত সময় ব্যয় করেন, সেই তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা।
জরিপে দেখা গেছে, মজুরিহীন গৃহকাজে দৈনিক নারী ৪.৬ ঘণ্টা এবং পুরুষ ০.৬ ঘণ্টা ব্যয় করেন। অন্যদিকে চাকরি ও চাকরি-সম্পর্কিত কাজে দৈনিক নারী ১.২ ঘণ্টা এবং পুরুষ ৬.১ ঘণ্টা ব্যয় করে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর ওই জরিপে জানা যায়, দেশে নারী-পুরুষ দিনের একটি বড় অংশ নিজের যতœ ও পরিচর্যায় ব্যয় করে। তাদের হিসাবে, ২৪ ঘণ্টার ১১ ঘণ্টা ৬ মিনিটই দেশের মানুষ ব্যয় করে এসব কাজে। যার মধ্যে পুরুষ দিনে ১১ ঘণ্টা ১৮ মিনিট ব্যয় করেন নিজের যতœ ও পরিচর্যায়। নারীর ক্ষেত্রে এ সময় ১০ ঘণ্টা ৫৪ মিনিট। তবে পরিচর্যার ভেতর রয়েছে ঘুমও।
‘সময় ব্যবহার বা টাইম ইউজ জরিপ-২০২১’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে। জরিপের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, নারী গৃহস্থালি ও পরিবারের লোকজনের দেখাশোনা মিলিয়ে পারিবারিক কাজে দিনে ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট সময় ব্যয় করে। বিবাহিত পুরুষরা দিনে ৬ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ব্যয় করে চাকরির পেছনে, যেখানে অবিবাহিত পুরুষরা ব্যয় করেন ৩ ঘণ্টা ৫৪ মিনিট।
নারী ও পুরুষ দিনে তৃতীয় সর্বোচ্চ সময় ব্যয় করেন সংস্কৃতি, অবসর ও পত্রপত্রিকা পড়া এবং খেলাধুলার পেছনে।
জরিপে আরও জানা যায়, দেশের নাগরিকরা সবচেয়ে কম সময় ব্যয় করেন স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে। ২৪ ঘণ্টায় এ কাজে তারা ব্যয় করে মাত্র ছয় মিনিট। এরপর সবচেয়ে কম সময় ব্যয় হয় জ্ঞানার্জনে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ১৮ মিনিট এ কাজে ব্যয় করা হয়।
বাংলাদেশের রাজধানী শহরে যেমন যানজটেই প্রচুর সময় ব্যয় করতে হয় নগরবাসীকে। এ ছাড়া অন্যান্য অনেক সংকটেও প্রচুর সময় ব্যয় করতে হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশে যা হয়তো দেখা যায় না।
ফলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যক্তি তার নিজের, পরিবারের অথবা সমষ্টির প্রয়োজনে যে সময় ব্যয় করে থাকে তাতে মিল এবং অমিল দুটোই আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, শিশুর মতো প্রাচীন আর কিছু হয় না। যুগে যুগে একই ধরনের শিশু জন্ম নেয়। ঠিক তেমনি বলতে হয়, ২৪ ঘণ্টার মতো প্রাচীন আর কিছু হয় না। যে যেভাবে, যে অবস্থানেই থাকুক না কেন সবার জন্য ২৪ ঘণ্টা সমান।