গফরগাঁওয়ে অনাবাদি জমিতে তুলা চাষ জাগাচ্ছে নতুন সম্ভাবনা

ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চলের নিষ্ফলা জমিতে তুলা চাষ করে লাভবান হয়েছেন চাষি। এতে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে তুলা চাষ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গাছে ব্যাপক ফলনে খরচের তুলনায় কৃষকরা কয়েকগুণ বেশি লাভ পাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে তুলা চাষে আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।

জানা যায়, তুলা গ্রীষ্মকালীন ফসল। মে মাসের শেষ ভাগ থেকে শুরু করে জুনের প্রথমার্ধ পর্যন্ত জমিতে তুলা বীজ বপন করতে হয়। তুলার ভালো ফলনের জন্য গড়ে ২৩.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং বাৎসরিক গড় বৃষ্টিপাত ৬৩৫ থেকে ১০১৬ মিলিমিটার হওয়া উত্তম। জমি প্রস্তুতের পর জাত ভেদে বীজ বুনতে হয় ৭.৫ থেকে ১৮ কেজি। বীজ বপনের ৬ মাস পর তুলা সংগ্রহ করা যায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে তুলা চাষ ছড়িয়ে দিতে তুলা উন্নয়ন বোর্ড ও বিভিন্ন প্রকল্প কৃষকদের প্রশিক্ষণসহ সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। সরকারি সহযোগিতায় ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে তুলা চাষ সম্প্রসারণ কার্যক্রম শুরু করা হয় গফরগাঁও উপজেলায়। প্রদর্শনী চাষিদের ৮০ ভাগ সেচ,সার ও বীজ খরচ দেওয়া হয়। এছাড়াও সাধারণ কৃষকদের সহযোগিতা করা হয় পরামর্শ দিয়ে উৎসাহিত করা হয়। অনুর্বর জমিতে সরকারি সহযোগিতা পাওয়ায় লাভবান হচ্ছেন উপজেলার চরআলগী ইউনিয়নের চাষি। তুলা চাষে সংসারে সচ্ছলতা আসায় অন্য ইউনিয়নের চাষিরাও আগ্রহী হচ্ছেন। উপজেলায় তুলা চাষের পরিমাণ ও চাষির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। তাদের উৎপাদিত তুলা সরাসরি তুলা উন্নয়ন বোর্ড ন্যায্য দামে কিনে নেয়। ফলে কৃষকরা অন্য ফসলের তুলনায় তুলাতে অধিক লাভবান হচ্ছেন। উপজেলায় ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকের আগ্রহ বেড়ে যায়।

সাব কটন ইউনিট অফিস সূত্রে জানা গেছে,চলতি ২০২৩-২৪ মৌসুমে তুলা উন্নয়ন বোর্ড ময়মনসিংহ জোনে গফরগাঁও উপজেলায় ৭০ হেক্টর জমিতে ১৮০ জন কৃষকের মাধ্যমে তুলা চাষ সম্প্রসারণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। উপজেলায় চলতি বছর গফরগাঁও ইউনিটে ৬৭ হেক্টর জমিতে তুলার আবাদ করা হয়েছে। প্রতি একরে তুলা উৎপাদন হয় ৪০ মণ থেকে ৪৫ মণ। মণ প্রতি তুলার মূল্য ৩ হাজার ৮ শত টাকা। অনুর্বর জমিতে তুলা চাষ করে লাখপতি হয়েছে কৃষক। আবার একই জমিতে সাথী ফসল হিসেবে বিভিন্ন শাক-সবজি ও মসলা জাতীয় ফসল চাষ করেও বাড়তি আয় করছে কৃষকরা। তুলার আবাদ থেকে আঁশ ছাড়াও ভোজ্য তেল, খইল, জ্বালানি উপজাত হিসেবে পাওয়া যায়। নিষ্ফলা জমিতে তুলা চাষ করায় একদিকে যেমন জমির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষকরা বেশ টাকা পাচ্ছেন, তাদের পরিবারে আসছে সচ্ছলতা।

চরমছলন্দ পশ্চিম পাড়া গ্রামের তুলা চাষি রবিউল ইসলাম বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অনুর্বর, নিষ্ফলা বা অনাবাদি জমিতে তুলা চাষ করে আমার মত আরও অনেকের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। তুলা বিক্রয়ের টাকা ঘরে বসে পাই। কোন ঝামেলা নেই।
সফল তুলা চাষিদের মধ্যে চরআলগী ইউনিয়নের জয়ার চরের জালাল উদ্দিন বলেন, সরকারি সহায়তায় গত ৩ বছর ধরে তুলা চাষ করেছি। আমার অনাবাদি জমি আবাদি হয়েছে। তুলার সাথে বাদাম, লাউ, শাক-সবজি সাথী ফসল হিসেবে চাষ করি। তুলা চাষ করে আমি লাভবান। অনেকে বিভিন্ন আবাদ ছেড়ে তুলা চাষে আগ্রহী হচ্ছে।

তুলা উন্নয়ন বোর্ডের মাইজহাটি কটন ইউনিট কর্মকর্তা সরকার নাজমুল ইসলাম জানান, বিশ্বব্যাপী ‌‘সাদা সোনা’ হিসেবে পরিচিত তুলা উৎপাদনে আমরা পিছিয়ে আছি। বাংলাদেশে বছরে চাহিদার প্রায় ৫ শতাংশ দেশে উৎপাদন হচ্ছে। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ তুলা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তুলা এ দেশে উৎপাদন করতে পারলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব। জলবায়ু সহনশীল এ তুলা চাষে বেশি লাভ পাওয়ায় উপজেলার বড় ও মাঝারি শ্রেণীর কৃষকরা তুলা চাষে ঝুঁকছেন।