টেকসই উন্নয়নে ইসলামি অর্থনীতির বিকল্প নেই

ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের (আইএফআইএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন। ব্যাংকিং ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং বিষয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হন দেশ রূপান্তরের। কথা বলেন শরিয়াহ নির্দেশিত মুদারাবা পদ্ধতিতে সঞ্চয়কারীদের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ এবং ব্যবসায় ধরন বুঝে শরিয়াহ অনুমোদিত বিভিন্ন পদ্ধতিতে বিনিয়োগ প্রসঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহদেশ রূপান্তর : ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড (আইএফআইএল) সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু জানতে চাই।

মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন : ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড (আইএফআইএল) বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনক্রমে ১৯ এপ্রিল, ২০০১ সালে মহান আল্লাহর অপার অনুগ্রহে এর কার্যক্রম শুরু করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি প্রথম শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এর প্রতিষ্ঠার পেছনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন কিছু সফল ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং ইসলাম ও দেশের সেবায় নিবেদিতপ্রাণ উদ্যোক্তা। প্রতিষ্ঠাতা এমডি ছিলেন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের প্রাণপুরুষ এম আযীযুল হক। এ ছাড়া জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের ভূতপূর্ব খতিব মাওলানা উবায়দুল হক (রহ.) ও বহুল প্রচারিত মাসিক মদীনার সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের (রহ.) মতো প্রখ্যাত ও বিশেষজ্ঞ আলেমরা ছিলেন শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটির অন্যতম সদস্য। আইএফআইএল শরিয়াহ নির্দেশিত মুদারাবা পদ্ধতিতে সঞ্চয়কারীদের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ করে এবং ব্যবসায়ের ধরন অনুযায়ী শরিয়াহ অনুমোদিত বিভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করে থাকে।

দেশ রূপান্তর : ইসলাম ঋণের (লোন) বিনিময়ে বাড়তি কিছু নেওয়ার অনুমতি দেয় না, তাহলে আপনার প্রতিষ্ঠান লোন না দিয়ে কীভাবে মুনাফা করে?

মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন : ঋণ বা লোন বলতে আক্ষরিক অর্থে যা বোঝায়, ইসলামি শরিয়তে তাকে করজে হাসানা বলা হয়। এর বিনিময়ে অতিরিক্ত কিছু নেওয়ার সুযোগ নেই। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী আমরা অর্থায়ন করে থাকি। যেমন গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, স্থাপনা, বিভিন্ন মেশিনারিজ বা বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যে। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী আইএফআইএল হালাল পণ্য ক্রয়পূর্বক মুনাফা যোগ করে বিনিয়োগ গ্রাহককে হস্তান্তর করে থাকে। তারপর তা এককালীন বা কিস্তিতে আদায় করা হয়। বিনিয়োগ গ্রাহককে পণ্য বিনিময় ছাড়া সরাসরি টাকা দেওয়া হয় না। বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফার একটা অংশ চুক্তি অনুযায়ী সঞ্চয়কারী ও শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বণ্টিত হয়।

দেশ রূপান্তর : আপনার প্রতিষ্ঠান আইএফআইএলে গ্রাহকরা কেন আসবেন?

মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন : মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বাংলাদেশ। মানুষ ধর্মীয় অনুশাসন কমবেশি যতটুকুই পালন করুন না কেন, অধিকাংশই অবশেষে হালাল উপার্জনে বিশ্বাসী। পরিবারের খরচটা যাতে হালাল আয় থেকে হয়, সে চেষ্টা প্রায় সব মুসলমানই করে থাকেন। হালালের এ উপলব্ধি থেকেই মানুষ ইসলামিক ফাইন্যান্সে আসেন। কারণ, অনেকেই জানেন, ইসলামিক ফাইন্যান্সে শুধু হালাল লেনদেনই হয় না, এখানে বিনিয়োগ করলে বা এখান থেকে বিনিয়োগ নিলে বড় ধরনের ইবাদতে শামিল থাকা যায়। তাছাড়া এখানে গ্রাহকসেবাকে সর্বাধিক প্রাধান্য দেওয়া হয়। গ্রাহকের আস্থাই প্রতিষ্ঠানের চালিকাশক্তি। আইএফআইএল আমানতের বিপরীতে বাজারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মুনাফা প্রদান করে থাকে।

দেশ রূপান্তর : আইএফআইএলের প্রতিটি কার্যক্রম কি সুদমুক্ত?

মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন : আইএফআইএল ব্যবসাসহ সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে শরিয়াহ মোতাবেক, শরিয়াহর নির্দেশনা মেনে। তাই বলতে পারি, আইএফআইএলের সব কার্যক্রম সুদবিহীনভাবে পরিচালিত হয়। কখনো যদি অনিচ্ছাকৃত ভুলভ্রান্তির কারণে কোনো আয় সন্দেহজনক বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে সেটা কখনই মূল আয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না, তা ‘আইএফআইএল ফাউন্ডেশনে’ চলে যায় এবং শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করা হয়।

দেশ রূপান্তর : সুদি ব্যাংক থেকে শরিয়াহভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে কেন এলেন?

মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন : একজন মুসলিম হিসেবে শরিয়াহভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার একটা তীব্র আকাক্সক্ষা ছিল। মহান আল্লাহ আমার প্রার্থনা শুনেছেন, এজন্য তার প্রতি অসংখ্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছি। এখানে কাজ করাটা ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা থাকলে যেকোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করে সফলতা অর্জন করা সম্ভব। তাছাড়া ইসলামিক ব্যাংকিং সেক্টরে মন্দ বিনিয়োগের সুযোগ অনেকাংশে কম। কারণ, এখানে শরিয়াহভিত্তিক যেসব পদ্ধতিতে বিনিয়োগ প্রদান করা হয়, গ্রাহক পর্যায়ে যদি এর পরিপালন থাকে তাহলে তাদের ঋণখেলাপি হওয়ার সম্ভাবনা খুব একটা থাকে না। বিনিয়োগের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে বিনিয়োগ মন্দ হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশেই কমে যায়।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশের সর্বত্র ইসলামি অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অন্তরায় কী কী এবং এ ক্ষেত্রে করণীয় কী?

মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন : এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো অনেকের মধ্যে ইসলামের সামগ্রিক বিষয় সম্পর্কে জানার ও মানার অনাগ্রহ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জানার আগ্রহ থাকলেও মানার আগ্রহ কম। ইসলামি অর্থনীতি সম্পর্কে মানুষ যত জানবে এর সৌন্দর্য ও গুরুত্ব যত বুঝবে এবং সুদি অর্থ ব্যবস্থার বিপরীতে যে ইসলামি অর্থ ব্যবস্থার মধ্যেই একমাত্র অর্থনৈতিক মুক্তির মন্ত্র রয়েছে; এ বাস্তবতা যত দ্রুত বুঝতে পারবে ততই ইসলামি অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার পথ মসৃণ হয়ে উঠবে। প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিক বা মিডিয়ার উচিত এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। বাংলাদেশের টেকসই অর্থনীতির জন্য এর কোনো বিকল্প নেই।

দেশ রূপান্তর : কেউ শরিয়াহ পরিপন্থী কোনো কিছু করলে প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে তখন আপনার করণীয় কী হয়?

মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন : আমাদের একটি শক্তিশালী শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি রয়েছে। এর অধীনে রয়েছে একটি কার্যকরী শরিয়াহ সেক্রেটারিয়েট। যেখানে সার্বক্ষণিক মুরাকিব বা শরিয়াহ পরিদর্শক আমাদের সার্বিক কার্যক্রমে শরিয়াহ পরিপালনের বিষয়টি নিশ্চিত করার ব্যাপারে কাজ করে যাচ্ছেন। যেকোনো ভুলভ্রান্তি তাদের চোখ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ খুবই কম। তারপরও যদি এ ধরনের কোনো অভিযোগ আসে সঙ্গে সঙ্গে সে ব্যাপারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কারণ, শরিয়াহ পরিপালনে আপসহীন নীতির কারণে আইএফআইএল গ্রাহকের বিপুল আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।