মেজাজ পাল্টে ফেলা হেফাজতে সন্দেহ

প্রবল বিরোধী অবস্থা থেকে একসময় সরকারের সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু খোলস ছেড়ে স্বমূর্তিতে আসায় সরকারের চাপেই আবার দীর্ঘদিন ধরে কোণঠাসা অবস্থা। নির্বাচনের আগে এখন মেজাজ পাল্টাতে শুরু করেছে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। ফলে তাদের নিয়ে দেখা দিয়েছে সন্দেহ সংশয়।

সরকারের প্রতি নমনীয় থাকার পাশাপাশি নিজেদের অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার পর দীর্ঘদিনেও কারাবন্দি নেতাকর্মীদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি সুরাহা করতে পারেনি হেফাজত। এ ইস্যু নিয়েই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন পূর্ববর্তী টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শিগগিরই আন্দোলনের মাঠ গরম করতে চায় হেফাজত।

গতকাল বুধবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত ওলামা মাশায়েখ সম্মেলনে কারাবন্দি নেতা মামুনুল হকসহ আলেমদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারে সরকারকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত আলটিমেটাম দিয়েছে সংগঠনটি। দাবি আদায়ে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের একাধিক মন্ত্রীর সঙ্গে একাধিক বৈঠকে নেতাকর্মীদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের দাবিটি সামনে এনেছিলেন হেফাজতে ইসলাম নেতারা। এ সময় নিজেদের অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে কার্যক্রম চালানো, রাজনৈতিক দলের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সংগঠনের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকসহ অনেক নেতাকর্মী এখনো কারাগারে রয়েছেন। কারামুক্ত ও জামিনপ্রাপ্ত নেতাকর্মীদের প্রতিনিয়ত মামলায় হাজিরা দিতে হচ্ছে। এ নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। এ অবস্থায় সরকারের ওপর আর আস্থা রাখতে চান না সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরাট অংশ। এ অবস্থায় দাবি পূরণে রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে চাপে ফেলতে চায় তারা।

সূত্র জানায়, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিকেই আন্দোলনের উপযুক্ত সময় হিসেবে বেছে নিতে চান সরকারবিরোধী বলে পরিচিত হেফাজত নেতারা। হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের পর এদের অবস্থান এখন অনেকটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এ সময় সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থন পাওয়ার বিষয়টিও মাথায় রেখেছেন তারা। এ নিয়ে সংগঠনের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে বলে জানা যায়। এসব বৈঠক থেকেই কারাবন্দি নেতাকর্মীদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহার ইস্যুতে ৩০ অক্টোবরের আলটিমেটাম দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে ৩০ অক্টোবরের পরের কর্মসূচি কী ধরনের হবেÑ তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক যে রাজনৈতিক দলগুলো রয়েছে, তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

তবে এই মুহূর্তে কেউ হেফাজতকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ব্যবহার করতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দলের নেতারা। ১৪ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের সঙ্গে হেফাজতের যে সুসম্পর্ক ছিল তা এখনো আছে। এ নিয়ে হেফাজত নেতাদের সঙ্গে আমার নিয়মিত কথা হচ্ছে। তারা নিজেদের দাবি নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে পারে। সরকারও যতদূর সম্ভব তাদের দাবিদাওয়া পূরণের জন্য চেষ্টা করবে।’

হেফাজতের আলটিমেটাম প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম উত্তর জেলা সভাপতি এমএ সালাম বলেন, হেফাজতে ইসলাম কোনো রাজনৈতিক দল নয়। তাই তাদের দাবিও রাজনৈতিক নয়। ইতিপূর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে হেফাজত নেতারা নেতাকর্মীদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি তুলেছিলেন। তিনি বিষয়টি বিচার বিবেচনা করে দেখবেন বলেছেন।

তিনি বলেন, ‘হেফাজতের সঙ্গে এখনো আমাদের ভালো সম্পর্ক ও যোগাযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় কেউ বাইরে থেকে উসকানি দিতে চাইলেও তাদের ব্যবহার করতে পারবে বলে আমরা মনে করি না।’

২০১৩ সালে বিভিন্ন দাবিতে মাঠে নামা হেফাজত দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। ওই বছর ৫ মে হাজার হাজার হেফাজত নেতাকর্মী শাপলা চত্বরে অবস্থান নিলে পুলিশকে ব্যাপক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের সরাতে হয়। এ সময় হেফাজত নেতাকর্মীদের ব্যাপক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। মারা যান বেশ কিছু হেফাজত নেতাকর্মী। গ্রেপ্তার করা হয় অনেককে। ওই সময় হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা আহমদ শফিকে পুলিশ নিরাপদে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেয়। পরে শফি ও সরকারের মধ্যে এক ধরনের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ সম্পর্কের সূত্র ধরে হেফাজতের বেশ কিছু দাবি মেনে নেয় সরকার। ২০১৭ সালের এপ্রিলে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আহমদ শফির নেতৃত্বে বৈঠক করেন কওমি মাদ্রাসার আলেমরা। ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস সনদকে মাস্টার্সের সমমানের ঘোষণা দেন। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে বিলও পাস করা হয়। অন্যদিকে এ স্বীকৃতির বিপরীতে ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর পক্ষ থেকে শোকরানা মাহফিলের আয়োজন করা হয়। আহমদ শফির সভাপতিত্বে ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে ‘কওমি জননী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর আহমদ শফির মৃত্যুতে হেফাজতের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। নতুন আমির নির্বাচিত করা হয় জুনায়েদ বাবুনগরীকে। ২০২১ সালে মার্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচি দেয় হেফাজত। এ সময় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হেফাজত নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশ ও সরকারি দলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা কেন্দ্র করে সারা দেশে দুই শতাধিক মামলা হয়েছে হেফাজত নেতাকর্মীদের বিরূদ্ধে। গ্রেপ্তার হয় অনেক নেতাকর্মী। মামলা ও পুলিশের অভিযানের মুখে অনেকটা চাপের মুখে পড়ে হেফাজত। এ অবস্থায় ২০২১ সালের ২৫ এপ্রিল হেফাজতের কমিটি বিলুপ্ত করে পাঁচ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয় তৎকালীন আমির জুনায়েদ বাবুনগরী। পরবর্তীকালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নেতাদের বাদ দিয়ে ৩৫ সদস্যের একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এরপর থেকে সরকারের সঙ্গে দূরত্ব গোছানোর চেষ্টা করে হেফাজত। এ ক্ষেত্রে সরকারের কয়েকজন নেতা সেতুবন্ধ হিসেবেও কাজ করেন। ২০২২ সালের ১৭ ডিসেম্বর গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করে হেফাজতের একটি প্রতিনিধিদল। ওই বৈঠকে নিজেদের অরাজনৈতিক সংগঠন উল্লেখ করে ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হওয়ার অঙ্গীকার করেন নেতারা। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সংগঠনের নেতাকর্মীদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারসহ বেশ কিছু দাবি তুলে ধরেন তারা। এরপর থেকে সরকারের সঙ্গে হেফাজতের দূরত্ব কমে এলেও সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতা মাওলানা মামুনুল হকসহ বেশ কিছু নেতাকর্মীর কারামুক্তির বিষয়টি সুরাহা হয়নি। পূরণ হয়নি মামলা প্রত্যাহারের দাবিও।

গত ৩১ আগস্ট বাদ পড়া নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করে ২০২ সদস্যের নতুন কমিটি ঘোষণা করে হেফাজত। এরপর থেকে কমিটিতে সরকারবিরোধীদের অবস্থান অনেকটা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বুধবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত ওলামা মাশায়েখ সম্মেলনে অধিকাংশ বক্তার বক্তব্যেই এসেছে সরকারের প্রতি ক্ষোভ ও বিষোদগার। হেফাজত নেতাদের মুক্তি না দিলে প্রধানমন্ত্রীর গদি থাকবে না বলেও মন্তব্য করেছেন কোনো কোনো নেতা।