সব দল রাজপথে জাতীয় পার্টি বনানীতে

বর্তমানে দেশে দুইটি বিরোধী দল। যার একটি রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি এবং অপরটি সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে রাজপথে সরব থাকলেও বনানীর কার্যালয়ে বন্দি জাতীয় পার্টি। দলটিকে রাজপথে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

২৮ অক্টোবর শনিবারকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে বইছে গরম হাওয়া। কথার লড়াইয়ে কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে কর্মসূচী ঘোষণা করেছে এবং বড় জমায়েতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সমাবেশে লাখ লাখ লোকের জমায়েত ঘটাতে চায় বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।

দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা ভেঙে একই দিন শাপলা চত্বরে সমাবেশ কর্মসূচী নিয়ে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে জামায়েতে ইসলামও। যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে এদিন বিএনপির মহাসমাবেশে থাকবে গণতন্ত্র মঞ্চসহ বিরোধী দলগুলো। এদিকে রাজপথে সরব হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন।

তবে এসবের একদম বিপরীত অবস্থানে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। দলটি কার্যত বন্দি হয়ে আছে চেয়ারম্যানের বনানী কার্যালয়ে। মাঠ দখল কিংবা শক্তি প্রদর্শন থেকে নিরাপদ দূরত্বে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে চায় জাপা। তারা রাজপথের কর্মসূচির চেয়ে সভা সেমিনারে বক্তব্য, বিদেশি বন্ধুদের সাথে মতবিনিময় আর প্রধান দুই দলের সাথে লিয়াজো করে চলতে চায়।

জাতীয় পার্টির একাধিক নেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজপথে সক্রিয় হওয়ার জন্য জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে চাপ দিচ্ছেন দলটির অনেক সিনিয়র নেতারা। গত ৫ অক্টোবর বনানীতে চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে দলের প্রেসিডিয়াম ও সংসদ সদস্যদের বেশ কয়েকজন নেতা বলেন, এটা রাজনীতির উত্তাল সময়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নিয়মিত দলীয় কর্মসূচী দিয়ে যাচ্ছে আবার বিএনপিকে প্রতিহত করতেও মাঠে নামছে। অপরদিকে বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল নিয়মিত রাজপথনির্ভর কর্মসূচি দিয়ে জনগণকে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। কিন্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সভা কেন্দ্রিক বক্তব্য দিলেও রাজপথে অনুপস্থিত জাতীয় পার্টি। ফলে জনগণের সামনে জাতীয় পার্টির আবেদন দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। যার মূল্য আগামী নির্বাচনে দিতে হবে বলে সতর্ক করেন এই নেতারা।

যদিও সেই বৈঠক কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয় এবং বৈঠকে সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

২৮শে অক্টোবর ঢাকার নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে মহাসমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। সারাদেশ থেকে ওই দিন দলটির লাখ লাখ নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ঢাকার এই সমাবেশে অংশ নেবে বলে দলটি জানিয়েছে। একই দিনে বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেইটে অনুষ্ঠিত হবে আওয়ামী লীগের শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশ। দলটি বলছে, জনগণের অংশগ্রহণে ওই দিন তাদের সমাবেশ 'জনসমুদ্রে' পরিণত হবে।

এদিন জাতীয় পার্টি কোন কর্মসূচী নেবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও এমপি ফখরুল ইমাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, জাতীয় পার্টি মনে করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যে পদ্ধতিতে গণতন্ত্র অর্জন করতে চায় তাতে করে আগামী ১০০ বছরেও দেশে গণতন্ত্র আসবে না। তাদের রাজনীতির মধ্যে আমরা নেই। জাপা শান্তিপূর্ণ উপায়ে গণতন্ত্র অর্জনের পক্ষে। আমরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছি। আমরা চাই একটি শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণ মূলক নির্বাচন। আমি মনে করি জাতীয় পার্টি এই ডামাডোলে যাবে না। যদিও এ বিষয়ে আমাদের চেয়ারম্যন একক সিদ্ধান্ত নেবেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাতীয় পার্টি গত কয়েক বছরে একাধিকবার রাজপথে সক্রিয় হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এমনকি স্বয়ং দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বিভিন্ন সময় সভা সেমিনারে ঘোষণা দিয়েছিলেন, জাতীয় পার্টি আর কারও তাবেদারি করবে না। জনগণ চায় আওয়ামী লীগ বিএনপির বাইরে জাপা একক নেতৃত্ব দেবে। কিন্ত দিন শেষে তা বক্তৃতায় ই সীমাবদ্ধ থেকেছে। রাজপথে দেখা যায়নি।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাপার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, আগামী নির্বাচন পর্যন্ত পুরো সময় জাতীয় সংসদে এবং সংসদের বাইরে রাজপথে জন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সক্রিয় ও সরব থেকে জনসমর্থন আদায়ে সক্রিয় ও সরব হবেন দলটির নেতা-কর্মীরা। বৈঠকে নেতাদের তাগিদ দেওয়া হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য মূল্যের সীমাহীন ঊর্ধ্বগতি এবং গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের মূল্য ইস্যুতে সংসদ ও সংসদের বাইরে কথা বলা, এবং কর্মসূচী গ্রহণে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। কিন্ত বাস্তবে তা দেখা যায়নি।

এদিকে চলতি বছরের ৬ আগস্ট ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, সুশাসন প্রতিষ্ঠাসহ ১০ দফা দাবি নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছিল জাতীয় পার্টি। কিন্ত তা ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এরপর থেকে তাদের আর রাজপথে দেখা যায়নি।

জানতে চাইলে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও গাইবান্ধা-১ আসনের এমপি শামীম হায়দার পাটোয়ারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, জাতীয় পার্টি অহিংস রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। যেখানে সংঘাত হতে পারে, জানমালের ক্ষতি হতে পারে সে ধরনের কর্মসূচী সাধারণত জাতীয় পার্টি নিতে চায় না। তবে আমরা অবশ্যই জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে অনেক মিটিং মিছিল করছি, সভা সেমিনার এবং টকশোতে কথা বলছি- এগুলোও এক ধরণের রাজপথে থাকা। এর বাইরে জনগণের কোন ইস্যু নিয়ে যদি রাজপথে থাকতে হয় জাতীয় পার্টি অবশ্যই থাকবে, যদিও এ বিষয়ে এখনও কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।